অফিসার ও স্পেশাল ডিউটি

সত্য-মিথ্যা যাচাই করা হয়নি। প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন যখনই হোয়াইট হাউজে মনিকা লিউনস্কির সান্নিধ্য গ্রহণ করতেন সে সময় হঠাৎ তার স্ত্রী হিলারি ক্লিনটন যেন আবির্ভূত না হতে পারেন কিংবা আবির্ভূত হলেও তার আগে যেন প্লেবয় প্রেসিডেন্ট নিরাপদ স্থানে পৌঁছে যেতে পারেন তা নিশ্চিত করার দায়িত্বে ছিলেন হোয়াইট হাউজের একজন কর্মকর্তা। এটাই ছিল তার স্পেশাল ডিউটি। বাংলাদেশের একজন কবি রাষ্ট্রপ্রধান নিয়েও এমন গল্প চালু ছিল।

সাধারণভাবে বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানে (ভারতে নয়) আমলাতন্ত্রের বিভিন্ন সোপানের যেসব কর্মকর্তাকে পরিবর্তিত সরকারের কীর্তন গাওয়া কর্মকর্তারা তাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ মনে করেন রাষ্ট্র ও জনস্বার্থের দোহাই দিয়ে তাদের অফিসার অন স্পেশাল ডিউটি করানো হয়। চেয়ার-টেবিল নথিপত্র ইত্যাদি তাদের থাকে না। একটি বারোয়ারি হাজিরা খাতায় তাদের নিত্য হাজিরার কথা বলা হলেও সে খাতার দেখা পাওয়া দুর্লভ ব্যাপার। তবে মাসের শেষভাগে বেতন বিলে দু-তিনটি সই দিয়ে আসতে হয়। যারা মনে করেন পরবর্তী এক বছরেও ওএসডিশিপ প্রত্যাহারের সম্ভাবনা নেই তারা এক ডজন বেতন বিল একবারেই সই করে আসেন। কষ্ট করে এই সইটুকু করা ছাড়া ওএসডির আর কোনো কাজ নেই। তারা অল্পদিনের মধ্যেই বুঝে যান চেয়ার টেবিলসর্বস্ব তাদের ব্যাচমেটরা ‘স্যার ডেকেছেন’ এমন দোহাই দিয়ে তাদের এড়াতে চেষ্টা করেন, তখন পারতপক্ষে ওমুখী হন না। একালে ওএসডিকরণের বাড়াবাড়ি অনস্বীকার্য, কিন্তু সেকালেও তা ছিল।

১৯৫৬ সালের সিএসপি পরীক্ষায় প্রথম স্থানের অধিকারী কাজী ফজলুর রহমান মোটেও পাকিস্তানে আটকেপড়া অফিসার ছিলেন না, বাংলাদেশে থেকেই বাহাত্তর থেকে পঁচাত্তরের দুই-তৃতীয়াংশ সময় প্রধানমন্ত্রী চাওয়া সত্ত্বেও চেয়ার-টেবিলে বসতে পারেননি; কারণ তখনকার সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের সাইয়িদ হোসেন নামের একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির শুভদৃষ্টি তার ওপর পড়েনি, আর শুভদৃষ্টিতে পড়ার বাঞ্ছা নিয়ে এই কর্মকর্তা তার দরবারে হাজিরাও দেননি। সব আমলেই এমন দু-একজন বীরত্বপূর্ণ ব্যক্তির দেখা মেলে। এই লেখাটিতে একজন সিএসপি কর্মকর্তার তথ্য সচিব পদ থেকে দুবার ওএসডি হওয়ার বৃত্তান্ত তুলে ধরা হচ্ছে।

স্বাধীন বাংলাদেশের বয়স তখন আট মাস। যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পর্ব অসমাপ্ত রেখেই সিএসপি খোরশেদ আলম সার্কেল অফিসার থেকে বৃহৎ লাফ দিয়ে জয়েন্ট সেক্রেটারি হওয়া সেই সাইয়িদ হোসেনের হুমকিতেই দেশে ফিরে এসে তথ্য সচিব হলেন। ধাক্কা খেলেন ‘ভাই’বেষ্টিত মন্ত্রীদের কাছে পৌঁছা নিয়ে। রাজনৈতিক দলীয় কর্মীরা, মুজিবনগরের হলে তো কথাই নেই, সবাই মন্ত্রীদের সঙ্গে অত্যন্ত বন্ধুভাবাপন্ন। সব মন্ত্রী এমনকি প্রধানমন্ত্রীও সবার ভাই। এই ভ্রাতৃজাল অতিক্রম করে যখন মন্ত্রী মিজানুর রহমান চৌধুরীর সঙ্গে মিশতে পারলেন মন্ত্রীর ভালোত্বের জন্য আনন্দবোধ করলেন। কাজের স্বাধীনতা পেয়ে তিনি মন্ত্রণালয় পুনর্গঠনের কাজে লেগে গেলেন। এনামুল হককে প্রধান তথ্য কর্মকর্তা, মহিউদ্দিন আহমদকে চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা বিভাগের প্রধান করার প্রস্তাব দিলেন। রিসার্চ এবং রেফারেন্স বিভাগের প্রধানের দায়িত্বপ্রাপ্ত নূরুল ইসলাম পাটোয়ারীকে রাজনৈতিক ও দলীয় সম্পৃক্ততার কারণে সরানো যাবে না বলে তাকেও নিয়মিতকরণের প্রস্তাব দিলেন। তথ্যমন্ত্রী নিশ্চয়ই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেই প্রস্তাব অনুমোদন করলেন। তার আগেই প্রেসিডেন্সিয়াল অর্ডার ৯ জারি হয়েছে। কারণ না দর্শিয়েও এই আদেশে চাকরিচ্যুত করার বিধান থাকায় আইনটি তখন কর্মকর্তাদের মাথার ওপর খড়গের মতো ঝুলতে থাকে।

হঠাৎ করেই মন্ত্রী বদল ঘটল, মিজানুর রহমান চৌধুরী চলে গেলেন ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ে, তার জায়গাতে মন্ত্রী হলেন শেখ আবদুল আজিজ। তিনি হয়তো হোমওয়ার্ক করে এসেছিলেন। তিনি সচিবকে নির্দেশ দিলেন এনামুল হক, মহিউদ্দিন আহমদ ও নূরুল ইসলাম পাটোয়ারীকে পিও ৯-এর বিধানবলে চাকরিচ্যুত করতে হবে। তিনজনই সচিবের প্রস্তাবিত এবং পূর্ববর্তী মন্ত্রীর অনুমোদিত নিয়োগ।

সচিব মন্ত্রীকে জানান, তাদের বিরুদ্ধে তার কাছে কোনো অভিযোগ নেই, পিও ৯ প্রয়োগ করতে হলেও ন্যূনতম কারণ লাগবে। তাদের চাকরিচ্যুত করার কোনো কারণ যদি থেকে থাকে মন্ত্রী যেন তা জানান। শেখ আবদুল আজিজ সেদিকে না গিয়ে বললেন প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন।

সচিব বললেন, সে কথাটাই কাগজে লিখে দিন, যাতে চাকরিচ্যুতির কারণটা বলা থাকে। নতুবা নোট ইনিশিয়েট করা যাবে না। আইন মান্য করে এগোতে হবে। তিনি প্রধানমন্ত্রীর অফিসে এলে সচিব রফিকউল্লাহ চৌধুরী সাক্ষাতের ব্যবস্থা করলেন। তিনি লিখেছেন : ‘তিনজন সিনিয়র কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করাতে মন্ত্রীর নির্দেশের কথা জানালাম এবং তা প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা বলে তিনি আমাকে বলেছেন বলেও জানালাম। আমার বিবেচনায় তিনজন কর্মকর্তার সবাই অভিজ্ঞ ও দক্ষ, তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই।’

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ জানতে চাইলে তিনি স্পষ্টভাবে বললেন, ‘আমি বলতে যাব কেন? তোমাদের মন্ত্রণালয়ের ব্যাপার তোমরা সিদ্ধান্ত নেবে।’

মন্ত্রণালয়ে ফিরে এসে শুনলেন মন্ত্রী তার খোঁজ করছেন। তিনি মন্ত্রীর কাছে হাজির হওয়ার পর কোথায় ছিলেন জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার সাক্ষাতের পুরোটাই বললেন; প্রধানমন্ত্রী যে তিন কর্মকর্তার ব্যাপারে কোনো নির্দেশনা দেননি তাও জানালেন।

মন্ত্রী ক্ষুব্ধ হলেন তাকে ডিঙিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে যাওয়ার দুঃসাহস বেতনভুক্ত কর্মচারীর কেমন করে হয়। 

অকস্মাৎ শেখ আবদুল আজিজ টিঅ্যান্ডটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান এবং তথ্যে আসেন প্রতিমন্ত্রী তাহের উদ্দিন ঠাকুর।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা হলে তিনি সচিবকে বললেন, দেখেছো আমি মন্ত্রীকে বদলি করে দিয়েছি। নতুন প্রতিমন্ত্রী হচ্ছেন একজন সাংবাদিক এখন সব ঠিক চলবে, আর আমি তো থাকব মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে। আমি হাত জোড় করে বললাম, ‘স্যার, মন্ত্রী ও সচিবের মধ্যে বনিবনা না হলে আমলা-সচিবকে বদলি করাই যৌক্তিক হতো, মন্ত্রীকে নয়।’

সচিব খোরশেদ আলমের ওপর খড়গ নেমে আসতে সময় লাগেনি। তথ্য সচিবের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল ভারতে যায়। দলে ছিলেন কাজী জহির, ববিতা, রোজী সামাদ, রাজ্জাক, সাবিনা ইয়াসমিন ও আবুদস সামাদ। সচিব নিজ খরচে স্ত্রীকে নিয়ে গিয়েছিলেন। দিল্লি বোম্বের পর কলকাতা পৌঁছতেই হুকুম পেলেন পরের ফ্লাইটেই তাকে ঢাকা ফিরতে হবে। ঢাকা পৌঁছতেই তিনি ওএসডি হয়ে গেলেন।

যাওয়ার সময় এয়ারপোর্টে এলে প্রতিনিধিদলের ছবি তোলা হয়েছে। সচিবের সফরসঙ্গী স্ত্রীও ছবিতে আছেন, ছাপা হয়েছে চিত্রালীতে, কেউ একজন ছবিতে থাকা সচিবের স্ত্রীর ছবি প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরে ব্যঙ্গ করে বলেছেন, এই নায়িকাকে চিনলাম না!

প্রধানমন্ত্রী প্রতিমন্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলে তিনি জবাব দিলেন, সিনিয়র অফিসাররা আমাদের কথা শোনেন নাকি?

সচিব লিখেছেন, প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশ মেনেই স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়েছেন কিন্তু তিনি প্রধানমন্ত্রীর সামনে অসত্য ভাষণ দিয়েছেন।

‘এই নায়িকা কে’ একটি বিদ্রƒপাত্মক মন্তব্য আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছিল। খোরশেদ আলম লিখেছেন। ঘটনাটি ১৯৭৪ সালের এপ্রিল অথবা মে’র, বিনা মেঘে বজ্রপাতের কারণে এই আঘাত অসহনীয় ছিল। আমার স্ত্রী বিশেষভাবে মর্মপীড়িত হন। সরকারি গাড়ি প্রত্যাহার করে নেওয়া হলো।

আবার তথ্য সচিব, আবার ওএসডি ‘পাকিস্তানের নামজাদা তথ্য সচিব আলতাফ গওহর হওয়ার সাধ আমার ছিল না’ খোরশেদ আলম লিখেছেন। আলতাফ হওয়ার মতো মেধাবী আমলা বাস্তবিকই দুর্লভ। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের গোয়েবলস নামে খ্যাত আলতাফ গওহর ১৯৪৮ সালের সিএসপি। ফ্রেন্ডস নট মাস্টার্স নামের বইটিও অনেকের মতে তারই লেখা। আইয়ুব খানের পতনের পর চাকরিচ্যুত হয়ে তিনি হাপিত্যেস করেননি, ডন পত্রিকার সম্পাদক হয়েছেন। দ্বিতীয়বার তিনি তথ্য সচিব হলেন ১৯৭৮ সালে। ভালোই চালাচ্ছিলেন, এরশাদ ক্ষমতাসীন হলেন ১৯৮২ সালের মার্চে। মন্ত্রী এ আর এস দোহা, তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হতে চেয়েছিলেন, তথ্যে সন্তুষ্ট ছিলেন না। প্রেসিডেন্ট এরশাদ জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশন যোগদান করতে যাবেন, তার আগেই চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ড পুনর্গঠন করতে হবে। যৌথ দায়িত্ব দেওয়া হলো স্বরাষ্ট্র্র সচিব এমকে আনোয়ার এবং তথ্য সচিব খোরশেদ আলমকে। তারা নতুন বোর্ড গঠন করলেন এবং সংবাদটি প্রচারিত হলো। পুনর্গঠিত বোর্ড প্রেসিডেন্টের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার মেজর জেনারেল চিশতীর মনঃপূত না হওয়ায় তিনি সঙ্গে সঙ্গে বোর্ড বাতিলের নির্দেশ ছিলেন। তাকে জানানো হয় এটা তথ্য সচিবের একক কাজ নয়, স্বরাষ্ট্র সচিবও আছেন। তিনি ফাইল চেয়ে পাঠালে তা পাঠানো হলো। প্রেসিডেন্ট জাতিসংঘ অধিবেশন থেকে ফেরার পর পিএসও নিশ্চয়ই তাকে ব্রিফ করে থাকবেন। এরশাদ রাতেই লাল টেলিফোনে তথ্য সচিবকে বোর্ড গঠন নিয়ে প্রশ্ন করলেন। সচিবের মনে হলো জবাবে এরশাদ সন্তুষ্ট হয়েছেন। পরদিন তার সঙ্গে দেখা করার হুকুম দিলেন।

পরদিন সকালে অফিসে হাজির হলেও জেনারেল তাকে নিজের রুমে না বসিয়ে তার প্রাইভেট সেক্রেটারির কামরায় অপেক্ষা করতে বললেন। তিনি অস্বস্তি বোধ করছিলেন। দীর্ঘক্ষণ পর পিএসওর রুমে ডাকা হলো। পিএসও বুঝিয়ে দিলেন সিএমএলএর সঙ্গে দেখা করার প্রয়োজন নেই। তাকে ওএসডি করা হয়েছে। নিজ দায়িত্ব ছেড়ে অবিলম্বে যেন সেখানে যোগদান করেন এই হুকুম হয়েছে।

মন্ত্রণালয়ে ফিরে এসে দায়িত্ব হস্তান্তর করলেন, মন্ত্রী দোহা দুঃখ প্রকাশ করলেন। দ্বিতীয়বার তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে অপসারিত ও ওএসডি হলেন খোরশেদ আলম।

ঈদ এসে গেল। প্রথামাফিক তিনি যখন ঈদ মোলাকাত করতে গেলেন প্রেসিডেন্ট ইংরেজিতে যা বললেন তার মানে; উদ্বিগ্ন হবেন না, সব ঠিক হয়ে যাবে।

খোরশেদ আলম ভাগ্যবানও বটে। প্রেসিডেন্ট সত্যিই তার উদ্বেগ প্রশমিত করেছেন। যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন রিয়ার এডমিরাল এমএ খান। তিনি একই সঙ্গে ডেপুটি চিফ মার্শাল ল’ অ্যাডমিনিস্ট্রেটর তিনি তাকে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে সচিব হিসেবে পেতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। যোগাযোগ সচিব মুজিবুল হক (পরে মন্ত্রিপরিষদ সচিব) পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবে বদলি হয়েছেন। কিছুকাল ওএসডি থাকার পর তিনি যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে যোগ দিলেন। যোগ দিয়ে টার্মিনাল বিকেন্দ্রীকরণের মতো অপরিহার্য একটি কাজ করলেন। সে সময় (১৯৮২-৮৬) ফুলবাড়িয়ায় ছিল কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল। গুলিস্তান অঞ্চলের যানজট অসহনীয় হয়ে উঠেছিল। তার নেতৃত্বে একটি কমিটি তিনটি টার্মিনালের স্থান শনাক্ত করে। চট্টগ্রামসহ পূর্ব দিক থেকে আসা বাসের জন্য যাত্রাবাড়ী। পশ্চিম কি-আরিচা হয়ে আসা বাসের জন্য গাবতলী এবং উত্তর দিক ময়মনসিংহ হয়ে আসা বাসের জন্য মহাখালী টার্মিনাল। ৪০ বছর পর এগুলো এখনো বহাল আছে। লেখক

সরকারের সাবেক কর্মকর্তা ও কলামিস্ট

momen98765@gmail.com