মণিপুর রাজ্যের পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে সংসদে জবাবদিহিতে বাধ্য করতে বিরোধী জোট ইন্ডিয়া লোকসভায় সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব জমা দিয়েছে। গতকাল বুধবার সকাল সাড়ে ৯টা নাগাদ আসাম থেকে নির্বাচিত কংগ্রেস সদস্য গৌরব গাগৈ ইন্ডিয়া জোটের পক্ষে এ প্রস্তাব জমা দেন। অনাস্থা ভোটের সেই প্রস্তাব গ্রহণ করে স্পিকার ওম বিড়লা জানিয়েছেন, রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে কয়েক দিনের মধ্যেই ভোটের তারিখ ঘোষণা করবেন তিনি।
এনডিটিভি বলছে, ইন্ডিয়ার পক্ষে এই প্রস্তাবের পাশাপাশি দক্ষিণ ভারতের তেলেঙ্গানা রাজ্যের শাসক দল ভারত রাষ্ট্র সমিতির (বিআরএস) তরফ থেকে নম নাগেশ্বর রাও পৃথক আরেকটি অনাস্থা প্রস্তাব জমা দিয়েছেন। প্রস্তাব বিধিসম্মতভাবে পেশ করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখবেন স্পিকার ওম বিড়লা। তারপর সেটি গৃহীত হলে আলোচনার দিনক্ষণ ঠিক করবেন।
সংবাদমাধ্যমটির ভাষ্য, মূলত সরকারের পতন ঘটাতে এ ধরনের ভোট হয়ে থাকে। নিয়ম অনুযায়ী, সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব জমা দিতে লোকসভার অন্তত ৫০ সদস্যের স্বাক্ষর প্রয়োজন। সেই সংখ্যা ইন্ডিয়া জোটের আছে। কিন্তু প্রস্তাবটি পাস করানোর মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা লোকসভায় বিরোধীদের নেই। ৫৪৩ আসনের লোকসভায় ৩০০টির বেশি আসন বিজেপি জোট দল এনডিএ-এর। কাজেই মোদি সরকারের বিরুদ্ধে আনা এই দ্বিতীয় প্রস্তাব আলোচনার পর ভোটাভুটিতে খারিজ হয়ে যাবে।
বিরোধী জোটের নেতৃত্বে থাকা কংগ্রেসও জানিয়েছে, মোদিকে ক্ষমতাচ্যুত করতে এ অনাস্থা ভোট প্রস্তাব করেনি তারা। মূলত মণিপুর ইস্যু নিয়ে যেন মোদি বিস্তারিত আলোচনা করেন, সে জন্য এর ব্যবহার করছে তারা। এনডিটিভি বলছে, অনাস্থা ভোটের মুখে পড়ায় এখন মোদিকে নিজের সরকার নিয়ে বিস্তর আলোচনা করতে হবে। নিজের এবং সরকারের পক্ষে সাফাই গাইতে হবে। তা নিয়ে সংসদের বাইরেও আক্রমণ শানাবে বিরোধীরা।
গত মে মাসের প্রথম সপ্তাহে মণিপুরে জাতিগত সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। এতে এখন পর্যন্ত ১৩০ জনের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। কিন্তু এ সহিংসতা নিয়ে মুখ খোলেননি মোদি। যদিও গত সপ্তাহে দুই নারীকে বিবস্ত্র করে হাঁটানোর ঘটনা ভাইরাল হলে এ নিয়ে সংক্ষিপ্ত কথা বলতে বাধ্য হন তিনি।
তবে বিরোধীদের দাবি ছিল, মণিপুর নিয়ে সংসদে বিতর্ক করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীকে লোকসভা ও রাজ্যসভায় বিবৃতি দিতে হবে। সরকারের তরফ থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, মণিপুর নিয়ে তারা বিতর্কে রাজি। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বিবৃতি দেবেন না। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বিতর্কের জবাব দেবেন। তবে বিরোধীরা তা মানতে চাননি। তাই তারা তাদের শেষ অন্ত্র ব্যবহার করেছেন।
জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলে জানাচ্ছে, এত তড়িঘড়ি করে অনাস্থা প্রস্তাব আনাটা হলো তাদের রাজনৈতিক কৌশলের অংশ। পাশাপাশি মোদি-শাহের কৌশল ভেস্তে দেওয়ারও অংশ। আসলে বিরোধীরা সংসদ অচল করে রাখার পর মোদি-শাহ ঠিক করেছেন, এবার সরকার তাদের বিলগুলো হইচইয়ের মধ্যে পাস করিয়ে নেবে। এবার সংসদে ৩১টি বিল পাস করাতে চায় সরকার। এর মধ্যে দিল্লি নিয়ে বিতর্কিত অর্ডিন্যান্সকে আইনে পরিণত করা-সংক্রান্ত বিল আছে। যে অর্ডিন্যান্সে উচ্চপদস্থ আমলা নিয়োগের ক্ষমতা রাজ্য সরকারের হাত থেকে নিয়ে লেফটেন্যান্ট গভর্নর দেওয়া হয়েছে। আম আদমি পার্টির অনুরোধ মেনে ইন্ডিয়া জোটের সব বিরোধী দল ঠিক করেছে, এই অর্ডিন্যান্স-সংক্রান্ত বিলের বিরুদ্ধে তারা একজোট হয়ে ভোট দেবে। এই বিল তারা সর্বশক্তি দিয়ে রোখার চেষ্টা করবে। লোকসভায় তারা সংখ্যালঘু। কিন্তু রাজ্যসভায় তারা এর বিরুদ্ধে এককাট্টা হয়ে সরকারকে চাপে রাখতে চাইছে।
মনোজ কে ঝা নামের এক বিরোধীদলীয় নেতা বলেছেন, ‘আমরা সবাই জানি সংখ্যায় আমরা এগিয়ে নেই। কিন্তু বিষয়টি সংখ্যা নয়, প্রধানমন্ত্রীকে সংসদে অনাস্থা ভোট নিয়ে কথা বলতে হবে, এটিই আসল। আর কংগ্রেস নেতা মানিকাম ঠাকুর বলেছেন, বিরোধী দল অনাস্থা ভোট প্রস্তাব করতে বাধ্য হয়েছে। কারণ এটিই ছিল শেষ অস্ত্র।
এর আগে ২০১৪ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা মোদি এ নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো অনাস্থা ভোটের মুখে পড়লেন। ২০১৮ সালে তার সরকারের বিরুদ্ধে ভোটাভুটি হলেও সেটি বাতিল হয়ে যায়।