একুশ শতকে এসে আমাদের দেশের নারীদের অগ্রযাত্রা হয়েছে নানাভাবে। গত এক দশক ধরে শহরাঞ্চলের নারী থেকে প্রান্তিক নারীরা নানাভাবে নানাকিছু করে নিজের উন্নয়নের পাশাপাশি দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রেখে চলেছেন। এদের মধ্যে কেউ কেউ কাজটি করেছেন সবাইকে জানিয়ে, কেউ বা নীরবে-নিভৃতে। যাদের কাজ ও চিন্তা সমাজের আর দশজন নারীর থেকে একেবারেই ব্যতিক্রম। এমন একজন স্বপ্নবাজ নারী হলেন কাজী ফারহানা। যিনি ওমেন অন হুইলের স্বপ্নদৃষ্টা। গুলশানে এক বৃষ্টিমুখর সকালে নিজের কর্মক্ষেত্রে বসে মোহসীনা লাইজুকে জানিয়েছেন ওমেন অন হুইলের শুরু, বর্তমান আর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার আদ্যোপান্ত ওমেন অন হুইল-এর শুরুটা কীভাবে।
কাজী ফারহানা : ২০২০ সালে যখন শুরু করি তখন আমার এই ভাবনার নাম কী হবে এটা ভেবে অনেকটা সময় কেটেছে। পছন্দমতো নাম পাচ্ছিলাম না। শুরুতে আমি যখন আমার পরিকল্পনার কথা আমার তিনজন বন্ধুর সঙ্গে ফেসবুকে একটা গ্রুপ খুলে শেয়ার করি, ওরাও খুব আগ্রহী হয়ে ওঠে। এই গ্রুপের মধ্যেই আমরা নানা আলোচনা করতে থাকি আমাদের এই সংগঠনের নাম কী হবে। অনেকগুলো নাম আসে তারমধ্য থেকে ওমেন অন হুইল, এই নামটি পছন্দ হয়। তারপর কাজ শুরু করি। শুরুতে আমি ও আমার বন্ধুবান্ধব মিলে চার-পাঁচজন ছিলাম। এখন আমাদের ৮০০ সদস্য। যদিও ২০২১ সালের অক্টোবরে শুরু করি কিন্তু ২০২২ সালের ৮ মার্চ নারী দিবসে আমাদের অফিশিয়াল যাত্রা শুরু হয়।
ওমেন অন হুইল-এর ভাবনার প্রেক্ষাপট।
কাজী ফারহানা : বলতে গেলে একটু পেছনে যেতে হবে। আমি মূলত ২০১৬ সালে গাড়ি চালানো শুরু করি। আমার বাড়িতে যেহেতু গাড়ি ছিল। আমি একদিন আমাদের ড্রাইভারকে বললাম আমাকে শেখাতে। এটা শুনে আমার বাবা বললেন, যদি শিখতে চাও তাহলে ট্রেনিং সেন্টারে গিয়ে ভালোভাবে শেখো। একপর্যায়ে বাবাই আমাকে ট্রেনিং সেন্টারে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করে দিলেন। খুব ভালোভাবে গাড়ি চালাতে শিখেছিলাম। কিন্তু তারপর ৪ থেকে ৫ বছর চালানোর প্রয়োজন হয়নি। সে সময়ে কনফিডেন্সেরও অভাব ছিল। একটু ভয়ও পেতাম। সেভাবে প্রয়োজনও হয়নি। এরপর কভিড এসে গেল। বাসায় বসে হোম অফিস করছি। বেশ ভালোই যাচ্ছিল। কিন্তু একটা পর্যায়ে অফিস থেকে জানাল অফিসে যেতে হবে। কভিডের কারণে ড্রাইভার ছিল না। রাস্তায় ব্যক্তিগত ট্রান্সপোর্ট ছাড়া অন্য কোনো যানবাহনও ছিল না। এমন অবস্থায় আমি গাড়ি চালিয়ে অফিসে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। কিন্তু বেশ ভয়ও পাচ্ছিলাম। বলা যায় কনফিডেন্সের অভাব ছিল। এরইমধ্যে রোজা শুরু হয়ে যায়। আমি একদিন ভাবলাম। আমার তো ভয় পেলে চলবে না। এই ভয়কে দূর করতে হবে। সেই ভাবনা থেকে মিরপুর ডিওএইচএস থেকে আস্তে আস্তে গাড়ি চালিয়ে টঙ্গী গেলাম। এভাবে বড় বড় কয়েকটা লং ড্রাইভ দিলাম। শুরু হলো আমার অন্যরকম যাত্রা। দেখলাম লাইফ কত ইজি। কারও ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে না। কিন্তু গাড়ি ড্রাইভ করতে গিয়ে যেটা ফিল করলাম তাহলোÑ গাড়ির ছোটখাটো সমস্যা বুঝতে পারছি না। কোনো কমনিটি নেই যেখানে শেয়ার করতে পারি। বাড়ির আশপাশে নারীবান্ধব কোনো গ্যারেজ নেই। যেসব ভালো পরিবেশের গ্যারেজ আছে তা অনেকটা ব্যয়বহুল। তখন ভাবলাম একটা গ্রুপ থাকলে ভালো হতো। যেখানে গাড়ির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আমরা আলোচনা করতে পারতাম। এই ভাবনার ৬ মাস পর ওমেন অন হুইল সংক্ষেপে ‘ওয়াও’-এর পথচলা। শুরুতে আমাদের ক্লোজ বন্ধুবান্ধবদের গ্রুপে যুক্ত করলাম। নিজেরাই গাড়ির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করে সমাধান করতাম।
ওমেন অন হুইল-এর সদস্য মূলত কারা আর কার্যক্রম কী কী।
কাজী ফারহানা : আসলে শুরুর দিকে ওমেন অন হুইলের অধিকাংশ সদস্যই কর্মজীবী নারী ছিলের। আস্তে আস্তে অনেক ছাত্রী ও গৃহিণীও যুক্ত হয়েছে। টেকনিক্যাল বিষয় জানার জন্য আমরা অনেকগুলো অটোমোবাইল ওয়ার্কশপ করেছি। গ্রুপ বিল্ডআপ করার জন্য অনেক ট্যুর করি। দুই একটা মোটরশপের সঙ্গে নতুন গাড়ির মিটআপে অংশগ্রহণ করছি। অনেকের ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করেছি। হাইওয়েতে র্যালিও হয়েছে। অনেক কিছুই করছি যদিও আমাদের গ্রুপের মধ্যেই এটা সীমাবদ্ধ রাখছি। ফেসবুক পেইজে খুব একটা দিচ্ছি না। এর কারণ বলতে পারেন খ্যাতির বিড়ম্বনা। একবার আমরা মোটর ড্রাইভ করে পূর্বাচলে গিয়েছিলাম। ওখানের একটা রেস্টুরেন্টে চেক ইন দেওয়ার পর বেশ কয়েকজন সদস্য নানা ধরনের ঝামেলায় পড়েন। দিয়াবাড়ীতে আমাদের বেশ কয়েকজন মেম্বার ড্রাইভিং শেখাচ্ছেন। এরমধ্যে ১০ থেকে ১২ জনের ইতিমধ্যে ড্রাইভিং শেখানো হয়ে গেছে। আমরা ভাবছি এখন এলাকাভিত্তিক ড্রাইভিং শেখাব। এরফলে কী হবে একজন মেম্বার তার পাশের বাড়ির একজনকে যেমন সহজেই শেখাতে পারছেন। সময় ও সুযোগ দুটোতেই সুবিধা হচ্ছে।
ওমেন অন হুইল-এর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা।
কাজী ফারহানা : আসলে আমাদের অটোমোবাইল সেক্টরটা দিন দিন ডেভেলপ হচ্ছে। যদি একজন নারীর গাড়ির খুঁটিনাটি ইঞ্জিন টায়ার, মবিল, ড্রাইভ এসব বিষয় যদি জানা থাকে, তাহলে ছোটখাটো বিষয়ের জন্য তাকে অটোমোবাইল গ্যারেজে ছুটতে হবে না। নিজেই অনেকটা সমস্যার সমাধান করতে পারবেন। অযথা পয়সা খরচ করতে হবে না। আমরা ওমেন অন হুইল-এর মেম্বাররা চাই এখানে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ুক। তাহলে পরিবেশ বদলাবে। অটোমোবাইল এডুকেশন ডেভেলপ হবে। অটোমোবাইল গ্যারেজের পরিবেশ উন্নত হবে। একজন মেয়ে যেন তার গাড়ির সমস্যা নিয়ে স্বচ্ছন্দে যেখানে-সেখানে যেতে পারেন। সব সেক্টরে মেয়েদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। তাহলে এখানে কেন পিছিয়ে থাকবে। সামনে মেয়েদের জন্যই একটা ড্রাইভিং স্কুল করতে চাই। ড্রাইভিং সেক্টরে মেয়েদের অংশগ্রহণে ভালো উপার্জনের ক্ষেত্র তৈরি করা সম্ভব। আমাদের পরিকল্পনা যদি সুবিধাবঞ্চিত মেয়েদের ড্রাইভিং শেখাতে পারি। তাহলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিগত গাড়ির ড্রাইভার হিসেবে মেয়েদের নিয়োগ দেবে। এই ভাবনা থেকেই আমাদের ব্র্যাক-এর সঙ্গে একটা কাজের পরিকল্পনা চলছে।
ওমেন অন হুইল-এর সদস্যরা কেমন ড্রাইভ করেন।
কাজী ফারহানা : ওমেন অন হুইল-এর সদস্যরা সবাই ভালো ড্রাইভ করেন। রাস্তায় যখন মেয়েদের দেখবেন তখন দেখবেন রাস্তায় মেয়েরা ট্রাফিক নিয়ম মেনে চলেন অন্যদের থেকে বেশি। আমাদের অনেক সদস্য আছেন যারা বাচ্চাকে স্কুলে আনা-নেওয়ার কাজটি নিজেরাই করেন। বাচ্চাকে ড্রাইভারের কাছে দিতে চান না। শুরুতে তিন-চারজন ছিলাম। আস্তে আস্তে সদস্য বাড়ছে। আমাদের কার্যক্রম বাড়ছে। ছুটির দিনগুলোতে চেষ্টা করি একত্র হওয়ার। ওমেন অন হুইল নিয়ে অনেক স্বপ্নই তো আছে। আস্তে আস্তে নিশ্চয়ই সব বাস্তবায়ন করব। আসলে স্বপ্ন তো সবাই দেখে না। কেউ না কেউ দেখে। আর সবাই মিলে বাস্তবায়ন করতে হয়। নিজেরা একত্র হলেই সব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।
কাজী ফারহানা
ছবি : আবুল কালাম আজাদ