কবিদের জন্য পৃথিবীতে আলাদা কোনো শহর আছে? যে শহরে রোজ মেঘ জমে, বৃষ্টি নামে, আবার রোদ ওঠে; প্রতি সপ্তাহের শেষে শীতকাল আসে? তেমন একটা শহর কোথাও পাওয়া গেলে ভালোই হতো, কবিরা শুধু কবিতা লিখত, আকাশে তাকিয়ে ভেসে যাওয়া আশ্চর্য মেঘদল দেখত। লিখতে বসে এমন উল্টাপাল্টা একটা ভাবনার কথা কেন লিখলাম? গত সপ্তাহে বাংলাদেশের দুজন প্রয়াত কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ ও আবুল হাসানের জন্মদিন ছিল। কবিদের জন্মদিনে শহরজুড়ে যদি উৎসবের আয়োজন হতো তাহলে ভালোই হতো। কিন্তু তাই কী হয়! অথচ তিরিশ বছর আগে এই শহরের অতীত সময়ে কবিদের জন্মদিন পালন তরঙ্গ তৈরি করেছিল।
আশির দশকের মাঝামাঝি কবিতা লিখতে চাওয়া কয়েকজন তরুণ মিলে মনস্থির করলাম আবুল হাসানের জন্মদিন পালন করব। তখন আমরা সবাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। কবি তারিক সুজাত শিল্পী ইউসুফ হাসানকে দিয়ে আবুল হাসানের একটি চমৎকার পোস্টার তৈরি করে ফেললেন। ইউসুফ হাসান কবির প্রতিকৃতি আর একটি কবিতার লাইনজুড়ে দিয়ে তৈরি করে দিলেন দুই রঙা পোস্টার। লাইনটা ছিল ‘সে এক পাথর আছে কেবলই লাবণ্য ধরে।’
কবি ইস্তেকবাল হোসেন, শ্যামল জাকারিয়া, তারিক সুজাত আর আমি গোটা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় সেই পোস্টার লাগানোর ব্যবস্থা করলাম। এক আলোমাখা বিকেলে টিএসসির ক্যান্টিনে আবুল হাসান স্মরণে একটি ছোট্ট স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হলো। মনে পড়ে, সেই পোস্টারটি বিশ্ববিদ্যালয়ে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করেছিল। কবিতার লাইনটি অনেকের মুখে মুখে অনেকদিন ফিরেছিল। আবুল হাসানের সেই জন্মদিন উদযাপন অনুষ্ঠানে বেশ কিছু উৎসাহী কাব্য প্রেমিক ভিড় জমিয়েছিল সেদিন। প্রয়াত অধ্যাপক, কবি, কথাশিল্পী হুমায়ুন আজাদ এবং কবি নির্মলেন্দু গুণকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল স্মৃতিচারণ করার জন্য। তারা উপস্থিত হয়েছিলেন কি না বা এসে কী বলেছিলেন, আজ আর কিছুই মনে নেই। তবে মনে আছে, অনুষ্ঠান শেষে সবাইকে চা দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়েছিল।
সেই আশির দশকে একবার কবি হাবিবুল্লাহ সিরাজীর জন্মদিন উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, শাহবাগের আশপাশে চার রঙা পোস্টার দেখেছিলাম। তখন সিরাজী ভাইয়ের ‘আমার কোনো বন্ধু নেই’ নামে একটা কবিতার বই প্রকাশিত হয়। কবি সিকদার আমিনুল হক মজা করে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘যার কোনো বন্ধুই নেই তার জন্মদিন কারা পালন করবে?’ হাবিবুল্লাহ সিরাজীও বিদায় নিয়েছেন পৃথিবী থেকে। হয়তো আমার মতো আরও কারও মনে রয়ে গেছে সেই জন্মদিন পালনের স্মৃতি।
আব্দুল মান্নান সৈয়দ শান্ত স্বভাবের একজন মানুষ ছিলেন। নিরন্তর লেখালেখি আর ভাবনার মধ্য দিয়ে জীবন কাটিয়ে গেছেন। তার সঙ্গে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার অফিসে এক সান্ধ্যকালীন আড্ডায় উপস্থিত ছিলেন বেশ কয়েকজন কবি। হঠাৎ একজনের মনে পড়ল পরের দিন মান্নান সৈয়দের জন্মদিন। সময়টা নব্বইয়ের দশক। তখনই আশপাশের বেকারি থেকে একটা কেক আনার ব্যবস্থা হলো। তখন তো আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছিল না। তাই চটজলদি করে আমরা মান্নান ভাইয়ের জন্মদিনে আগাম কেক কেটে আনন্দ করলাম। মান্নান ভাই অবশ্য স্বভাবসুলভ মৃদু হেসে কেক কাটাকাটির বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন। তাকে দেখেছি সবসময় কোলাহল থেকে দূরে থাকতেন এবং নিভৃতে নিজের লেখার কাজ করতেন। তার এবারের জন্মদিনে মনে পড়েছে সেই দিনগুলোতে মান্নান ভাইয়ের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার স্মৃতি।
প্রয়াত কবি ফজল শাহাবুদ্দীন একদা মতিঝিলে একটি অফিসে নিয়মিত বসতেন। সেখান থেকেই ‘নান্দনিক’ নামে একটি পাক্ষিক পত্রিকা প্রকাশ করতেন তিনি। তার দপ্তরে আড্ডা দিতে বহু কবি এবং কথাশিল্পী আসতেন। মাঝে মাঝে কবি আল মাহমুদ সকালবেলা সেখানে আড্ডা দিতেন। আশির দশকের কোনো এক সময়ে ঘুরতে ঘুরতে নান্দনিক অফিসে ঢুকে দেখি অফিস আলো করে তীব্র লাল রঙের একটা শার্ট পরে বসে আছেন কবি ত্রিদিব দস্তিদার। ত্রিদিবদা সবসময় উজ্জ্বল রঙের জামা পরতেন। অদ্ভুত সব স্টাইল করতেন। ওই সময়ে তাকে দেখেছি ছোট হাতের টি-শার্ট পরে ঢাকার রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে। কিন্তু সেদিন কটকটে লাল শার্টটা চোখে লাগছিল। প্রশ্ন করতেই ফজল শাহাবুদ্দীন উত্তর দিলেন, আগামী ডিসেম্বর মাসে ত্রিদিবের জন্মদিন। সে উপলক্ষে এই শার্ট পরেছে। তখনো শহরে শীত তার আগমন বার্তা ঘোষণাই করেনি। ত্রিদিবদা মুচকি হেসে বলেছিলেন, জন্মদিনের একটা আবহ তৈরি করে ফেলতে চাচ্ছি। মাঠ গরম করা যাকে বলে। তারপর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে আঙুল নাচিয়ে হাসতে হাসতে স্বরচিত একটি কবিতার কয়েক লাইন শুনিয়ে দিলেন। সেই কবিতার প্রথম দুটি লাইন মনে আছে আজও ‘তুমি চলে গেছো মন্ট্রিল, সাথে নিয়ে গেছো স্বদেশের শোভা।’ সেই ডিসেম্বরে ত্রিদিবদার জন্মদিন খুব হৈ হল্লা করে পালিত হয়েছিল কি না মনে পড়ে না। কিন্তু গ্রীষ্মের সেই সকালে শীতে জন্ম নেওয়া কবির লাল শার্ট পতাকার মতো ওড়েছিল শহরের পথে পথে। আমি ত্রিদিবদার সঙ্গে রিকশায় ঘুরতে বের হয়েছিলাম।
কবিদের জন্য সত্যি যদি একটা শহর হতো? শহরের পথে পথে উজ্জ্বল পোশাক পরে পথের পাশে জলের ঝরোকার পাশে থাকত তারা!