এস আলম অর্থ পাচার করেছে কি না অনুসন্ধানের নির্দেশ

এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি ছাড়া বিদেশে বিনিয়োগ ও অর্থ স্থানান্তরের বিষয়ে ওঠা অভিযোগ অনুসন্ধানের নির্দেশ দিয়েছে উচ্চ আদালত। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিয়ে দেশের বাইরে অর্থ পাঠানো হয়েছিল কি না, অর্থ পাচার হয়েছে কি না, সে বিষয়ে জানতে চেয়েছে হাইকোর্ট।

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) ও সিআইডিকে দুই মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলেছে আদালত।

এ বিষয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন আমলে নিয়ে গতকাল রবিবার বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি খিজির হায়াতের হাইকোর্ট বেঞ্চ রুলসহ এ আদেশ দেয়। আগামী ৮ অক্টোবর এ বিষয়ে পরবর্তী শুনানি হবে।

গত ৪ আগস্ট ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টারে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, এস আলম গ্রুপ বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি ছাড়া সাইপ্রাস, সিঙ্গাপুর ও ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডে অর্থ স্থানান্তর করেছে। সেখানে এস আলম গ্রুপের কর্ণধার এস আলম ও তার স্ত্রী ফারজানা পারভীনের বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগের সন্ধান পাওয়া গেছে।

ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে বলা হয়, ভূমধ্য সাগরীয় ছোট দেশ সাইপ্রাস ২০০৭ সালে তাদের ‘গোল্ডেন পাসপোর্ট’ কর্মসূচি চালু করে। বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক পরামর্শদাতা সংস্থার মতে, এ প্রকল্পের আওতায় দেশটির আবাসন খাতে প্রায় ২ মিলিয়ন ইউরো (২ দশমিক ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) বিনিয়োগ এবং সাইপ্রাস সরকারের গবেষণা ও ভূমি উন্নয়ন তহবিলে আরও ২ লাখ ইউরো অনুদানের বিনিময়ে ধনী বিদেশিদের সাইপ্রাসের নাগরিকত্বের সুযোগ দেওয়া হয়।

সিঙ্গাপুরের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড করপোরেট রেগুলেটরি অথরিটি (এসিআরএ) থেকে পাওয়া প্রতিষ্ঠানের প্রোফাইলের তথ্য অনুযায়ী, এর দুই বছর পর ২০০৯ সালের ২৭ আগস্ট সাইফুল আলম ও ফারজানা পারভীন নিজেদের সাইপ্রাসের নাগরিক এবং সিঙ্গাপুরের বাসিন্দা দেখিয়ে সিঙ্গাপুরে ক্যানালি লজিস্টিকস প্রাইভেট লিমিটেড প্রতিষ্ঠা করেন। সে সময় কোম্পানিটির ইস্যু করা ও পরিশোধিত শেয়ার মূলধনের পরিমাণ ছিল ২২ দশমিক ৩৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (৩০ মিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার)। এস আলম ও তার স্ত্রী একমাত্র শেয়ারহোল্ডার ছিলেন। আলম ৩০ মিলিয়ন শেয়ারের ৭০ শতাংশ এবং তার স্ত্রী বাকি ৩০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করতেন।

সিঙ্গাপুরে বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশটিতে রেসিডেন্স পারমিট বা বিদেশিদের থাকার অনুমতি দেওয়া হয়। এ ছাড়া এস আলম ও তার স্ত্রী ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জের আরও একটি অফশোর শেল কোম্পানি পিকক প্রপার্টি লিমিটেডের সঙ্গেও যুক্ত। সিঙ্গাপুর থেকে ১৭ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি দূরের ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস এমন এক ট্যাক্স হ্যাভেন বা কর স্বর্গ, যেখানে আয়কর, করপোরেট কর বা মূলধনী কর নেই।

আরেক কর স্বর্গ সাইপ্রাসে ২০১৬ সালে এস আলম অ্যাকলেয়ার ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠান কেনেন। সাইপ্রাসের কোম্পানির রেজিস্ট্রার বিভাগ এবং অফিশিয়াল রিসিভারের নথি অনুসারে, পরবর্তীকালে কোম্পানিটির নাম পরিবর্তন করে অ্যাকলেয়ার ইন্টারন্যাশনাল রাখা হয়।

গতকাল হাইকোর্টের এ বেঞ্চে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করে এস আলমের অর্থ স্থানান্তরের বিষয়ে অনুসন্ধানের নির্দেশনা চান সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন। রুলে অভিযোগ ওঠা অর্থ পাচার রোধে বিবাদীদের নিষ্ক্রিয়তা কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত হবে না জানতে চেয়েছে হাইকোর্ট। একই সঙ্গে অভিযোগ অনুসন্ধানে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না রুলে তাও জানতে চেয়েছে আদালত। দুদক ও বাংলাদেশ ব্যাংককে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।

আদালতে দুদকের পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মো. খুরশীদ আলম খান। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সাইফুদ্দিন খালেদ।

অ্যাডভোকেট খুরশীদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠান বিএফআইইউ, দুদক ও সিআইডি প্রতিবেদন দেবে। আমাদের ওপর রুল হয়েছে।’

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী সাইফুদ্দিন খালেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হাইকোর্টের আদেশের অনুলিপি পেলে সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনুসন্ধানের বিষয়ে অবহিত করা হবে।’