টানা কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে পার্বত্য জেলা বান্দরবান ও রাঙ্গামাটির নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানিতে ডুবে গেছে বান্দরবান জেলা সদরের ইসলামপুর, আর্মিপাড়া, গর্জনিয়াপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকা। সড়ক ডুবে যাওয়ায় ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। অনেকে রাস্তা পার হচ্ছেন ভ্যানগাড়িতে করে। এ ছাড়া জেলার কিছু কিছু জায়গায় ছোটখাটো পাহাড় ধসে পড়লেও কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকাদের নিরাপদ আশ্রয়ে চলে আসার জন্য গত শনিবার থেকে মাইকিং করছে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন। জেলায় এরই মধ্যে ২০৭টি আশ্রয়কেন্দ্র খুলে দিয়েছে প্রশাসন। আশ্রয়ের জন্য অনেকেই ভিড় করছেন আশ্রয়কেন্দ্রে। গত শনিবার সকাল ৯টা থেকে গতকাল রবিবার সকাল ৯টা পর্যন্ত বান্দরবানে ১৯১ মিলিলিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস। ভোগান্তিতে পড়া জেলা সদরের বালাঘাটার বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘স্কুলের ছেলেমেয়েরা খুব কষ্ট পাচ্ছে। রিকশা, ভ্যান গাড়ি করে রাস্তা পারাপার হচ্ছে। বালাঘাটা সড়কের আধা কিলোমিটার পর্যন্ত হাঁটুপানি।’
ইসলামপুরের আরেক বাসিন্দা জাহানারা বেগম বলেন, ‘পানিতে ঘরবাড়ি সব ডুবে গেছে। কোথাও ঠাঁই নেই। এখন আশ্রয়কেন্দ্রে থাকছি।’
পাহাড়ের পাদদেশে থাকা বাসিন্দাদের সতর্ক করতে প্রচার ও প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন ফায়ার সার্ভিস ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা। পাড়ায় পাড়ায় যাচ্ছেন তারা।
দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রশাসনের পর্যাপ্ত প্রস্তুতি আছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক শাহ মোহিদ উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘আমাদের সার্বিক প্রস্তুতি আছে। আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। সেখানে খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সবাই যদি আশ্রয়কেন্দ্রে চলে আসে তাহলে আমরা বড় ধরনের দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পাব। উপজেলাগুলোতেও শুকনো খাবার এবং অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আশা করি খাবারের কোনো সংকট হবে না।’
গতকাল সারা দিন রাঙ্গামাটিতে টানা বর্ষণ অব্যাহত ছিল। পাহাড়ে ঝুঁকি নিয়ে বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে কয়েক দফায় করা হয় মাইকিং। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে চালানো হয় নানা প্রচেষ্টা। কিন্তু তাতে কর্ণপাত করেনি বসবাসকারীরা। টানা বর্ষণের কারণে দ্বিতীয় দিনের মতো কাপ্তাই হ্রদে নৌ-চলাচল বন্ধ ছিল।
প্রশাসনের শত চেষ্টার পরও অধিকাংশ মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে নিতে ব্যর্থ হয়ে শেষ পর্যন্ত নেওয়া হয় সেনাবাহিনীর সহায়তা। গত শনিবার রাত ৯টার পর জেলা প্রশাসনের সঙ্গে মাঠে নামে সেনাবাহিনী। বৃষ্টি উপেক্ষা করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষকে নিয়ে আসা হয় আশ্রয়কেন্দ্রগুলোয়। তাতেও নানা অজুহাত এসব মানুষের। রাঙ্গামাটিতে ২০১৭ সালে ১২০ এবং ২০১৮ সালে ১১ জনের মৃত্যু হয় পাহাড়ধসে।
শিমুলতলী এলাকার বাসিন্দা আবদুল মালেক বলেন, ‘বাড়ির সবাই আশ্রয়কেন্দ্রে চলে গেছে। বাসায় আমি একা। আমি যাব না। ঘরে অনেক দামি জিনিসপত্র আছে।’
আরেক বাসিন্দা মোশারফ মিয়া বলেন, ‘পুলিশ, সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের লোকজন বলেছে তাই আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাচ্ছি। ওনারা তো আমাদের ভালো চায়।’
রাঙ্গামাটি বেতার কার্যালয়, লোকনাথ মন্দিরসহ বেশ কিছু অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে রাতে অনেকে আশ্রয় নিয়েছে। রাঙ্গামাটি বেতার কার্যালয়ে আশ্রয় নেওয়া জ্যোৎ¯œা আক্তার বলেন, ‘আমাদের বাসার পাশে মাটি ভেঙে গেছে। তাই শনিবার বিকেলে আশ্রয়কেন্দ্রে আসছি।’
রাঙ্গামাটি ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক দিদারুল আলম বলেন, ‘আমরা জেলা প্রশাসনের নির্দেশে দুদিন ধরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে আশ্রয়কেন্দ্র নিতে প্রচেষ্টা চালাচ্ছি। আর যদি পাহাড়ধসের মতো কোনো ঘটনা ঘটে তা মোকাবিলায় টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে।’
রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোশারাফ হোসেন খান জানান, কোনো মানুষ যাতে ঝুঁকির মধ্যে পাহাড়ের পাদদেশে না থাকে তাই ঝুঁকিতে বসবাসকারীদের শতভাগ আশ্রয়কেন্দ্রে নিতে সেনাবাহিনী সহযোগিতা করছে। শহরে ১৯টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সবার জন্য খাবার, বিদ্যুৎব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
কাপ্তাই বিদ্যুৎকেন্দ্রের সব কটি ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদন : টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে কাপ্তাই হ্রদে পানির পরিমাণ অনেকটা বৃদ্ধি পেয়েছে। যার ফলে পানির ওপর নির্ভরশীল কাপ্তাই পানিবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সব কটি ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়েছে। গতকাল কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎকেন্দ্র সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে কেন্দ্রের ৫টি ইউনিট দিয়ে ১৩৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। অথচ পানি কম থাকায় এতোদিন এই কেন্দ্রে ৩৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ হত। বিষয়টি নিশ্চিত করেন কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক এ টি এম আব্দুজ্জাহের।