সেপ্টেম্বরে কক্সবাজার যাওয়া হচ্ছে না রেলে চড়ে

আগামী সেপ্টেম্বর মাসে উদ্বোধন করা যাচ্ছে না দোহাজারী থেকে কক্সবাজার রেললাইন প্রকল্প। বন্যায় রেললাইনের নিচের মাটি সরে গিয়ে শূন্যে ভাসছে রেললাইন। এ ছাড়া এসব এলাকায় এখনো ১০ কিলোমিটার অংশে রেললাইন বসানোর কাজ বাকি। রেললাইন বসানোর পর পুরো লাইন চেকআপ করার পর কোনোভাবেই আগামী মাসের মধ্যে কাজ শেষ করা যাবে না। ফলে বিলম্বিত হতে পারে রেলে চড়ে কক্সবাজার যাত্রা।

দোহাজারী কক্সবাজার ঘুনধুম রেললাইন প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ মফিজুর রহমান বলেন, ‘এটাই আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ। আমাদের টিম দিয়ে দিনে ৪০০ থেকে ৫০০ মিটার রেললাইন বসানো যায়। সে হিসেবে ১০ কিলোমিটার অংশে রেললাইন বসাতে প্রায় এক মাস লাগবে। সব মিলিয়ে খুব টাইট শিডিউল হবে।’

এদিকে সাম্প্রতিক বন্যায় দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ১০০ কিলোমিটার দীর্ঘ রেললাইনের প্রায় ৩০০ মিটার সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত রেললাইনের সবটা অংশই সাতকানিয়ার তেমুহনী এলাকায়। নির্মাণকারী সংস্থা তমা কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেডের ডেপুটি প্রকল্প ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ রাশেদুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখনো এই এলাকায় বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টি না থামা পর্যন্ত আমরা কাজ শুরু করতে পারব না। আর ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় আমরা ভিজিট করেছি। তেমুহনীর ক্ষতিগ্রস্ত অংশটি মেরামত করতে আমাদের সর্বোচ্চ দুই সপ্তাহ লাগতে পারে। রেললাইনের মাটি ও পাথর সরে গিয়েছে। এ অংশে বাঁধ মেরামতের পাশাপাশি পাথর দিতে হবে এবং রেললাইন আবার নতুন করে বসাতে হবে। তারপরও এ অংশ সংস্কার করতে সমস্যা হবে না।’

গতকাল এই পয়েন্ট থেকে মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম নামের স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান, তেমুহনী মাস্টারবাড়ি এলাকার পাশের রেললাইন থেকে সবচেয়ে বেশি মাটি ও পাথর সরে গেছে। রেললাইনের নিচের মাটিও সরে গিয়ে কোথাও কোথাও ২০ থেকে ৩০ ফুট অংশ ঝুলন্ত অবস্থায় রয়েছে। টানা প্রায় ৩০০ মিটারের মধ্যে ১০ থেকে ২০ ফুট পরপর অংশের পাথর ও মাটি সরে গেছে।

এ প্রসঙ্গে মোহাম্মদ মফিজুর রহমান বলেন, ‘মেইন বাঁধ ঠিক আছে, শুধু পাথর সরে গেছে। পাথর ও মাটি সরে যাওয়া অংশের ক্ষতি আর্থিক হিসেবে অনেক নগণ্য। তবে আমাদের কাছে গুরুত্ব পাচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত অংশে মেরামতের উপকরণ নিয়ে যাওয়াটাই চ্যালেঞ্জ। আবহাওয়া স্বাভাবিক না হলে আমরা কাজ করতে পারব না।’

আগামী মাসে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন উদ্বোধনের কথা রয়েছে। কিন্তু এখনো দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার অংশে রেললাইন বসানো হয়নি। মোহাম্মদ রাশেদুজ্জামান বলেন, ‘দোহাজারী, সাতকানিয়া ও চকরিয়া এ তিনটি স্টেশন এলাকার ১০ কিলোমিটার অংশে রেললাইনের স্লিপার ও রেলওয়ে ট্র্যাক বসানোর কাজ বাকি রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘তিনটি স্টেশনের কিছু কাজের সঙ্গে রেললাইনের সম্পৃক্ততা ছিল, তাই বাকি রাখা হয়েছিল। এখন স্টেশনের কাজ শেষ তাই আমরা রেললাইন বসানোর কাজ শেষ করব।’

মরে গেছে আট হাজার গাছের চারা : রেললাইনের বাঁধকে মজবুত রাখার উদ্দেশ্যে পুরো বাঁধ জুড়ে গাছ লাগানো হয়েছিল। কিন্তু বন্যায় এসব গাছের প্রায় সব চারা মরে গেছে। ইঞ্জিনিয়ার সাইদুর রহমান বলেন, ‘দোহাজারী থেকে চকরিয়া পর্যন্ত আমরা প্রায় ১৫ হাজার গাছের চারা লাগিয়েছিলাম। যেসব চারা গত দুই-তিন মাস আগে লাগিয়েছি সেগুলো মরে গেছে। যেগুলো বড় হয়ে গেছে, সেগুলো টিকে আছে। সে হিসাবে প্রায় আট হাজার চারা মরে গেছে। এখন আবার নতুন করে গাছের চারা লাগাতে হবে।’

সংশয় আছে কালুরঘাট রেল সেতু নিয়েও : চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী পর্যন্ত ৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ এলাকাটি খুবই নাজুক। এই অংশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কর্ণফুলী নদীর ওপর কালুরঘাট সেতু। সেতুটি নাজুক হওয়ায় এ সেতু দিয়ে ট্রেনে চড়ে কক্সবাজার যাওয়া যাবে না। এজন্য বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের (বুয়েট) বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে সেতুর রেললাইন, সেতুর ডেক ও সেতুর কয়েকটি পিলার মজবুত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। সেই নির্দেশনা আলোকে তা সম্পন্ন করতে ৫৫ কোটি টাকার কাজ পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ম্যাক্স ইনফ্র্যাস্ট্রাকচার লিমিটেড। গত ১ আগস্ট থেকে সেতু দিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে কাজ শুরু করলেও বৈরী আবহাওয়ায় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে সংস্কার কার্যক্রম। এ বিষয়ে পূর্বাঞ্চলীয় রেলওয়ের প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবু জাফর মিঞা বলেন, ‘বৈরী আবহাওয়ার কারণে হয়তো নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষও করা যাবে না। সময় একটু বেশি লাগতে পারে।’

পূর্বাঞ্চলীয় রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘কক্সবাজার রেললাইন প্রকল্পের পরিচালক আশ^স্ত করেছেন তিনি সেপ্টেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করতে পারবেন। তবে কালুরঘাট সেতু নিয়েও কিছুটা সংশয় রয়েছে। আমরা হয়তো কক্সবাজার পর্যন্ত রেল চলাচল উদ্বোধন করতে পারব কিন্তু ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক করতে পরবর্তীকালে আরও কিছুটা সময় লাগতে পারে।’

দোহাজারী থেকে কক্সবাজার রামু হয়ে ঘুনধুম পর্যন্ত রেললাইন প্রকল্পটি সরকারের ফাস্ট ট্র্যাক প্রকল্প। ২০১০ সালে একনেকে ১ হাজার ৮৫২ হাজার কোটি টাকারর প্রকল্পটি অনুমোদন পেলেও ২০১১ সালে এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরবর্তী সময়ে ২০১৬ সালে প্রকল্পটি সংশোধন করার পর এর বাজেট বেড়ে ১৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকে। মিয়ানমারের আপত্তি থাকায় তা রামু থেকে আর ঘুনধুম পর্যন্ত প্রকল্পটি করা হচ্ছে না। এখন সরাসরি কক্সবাজারে চলে যাবে। সে হিসাবে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বাদ যায়। বর্তমান প্রকল্পের বাজেট প্রায় সাড়ে ১৫ হাজার কোটি টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ১০০ দশমিক ৮৩ কিলোমিটার অংশ ডুয়েলগেজ রেললাইন থাকবে। কিন্তু চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী পর্যন্ত ৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ এলাকা মিটারগেজের। তাই এখন মিটারগেজের ট্রেন চলাচল করতে পারবে। তবে চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী অংশে কালুরঘাট সেতু সংস্কার না হলে চট্টগ্রাম থেকে ট্রেনে কক্সবাজার যাওয়া স্বপ্নই থেকে যাবে।