স্মৃতির রুপালি গিটার

আইয়ুব বাচ্চু অনেক প্রতিবন্ধকতার মধ্যে স্বপ্ন ও অপ্রতিরোধ্য হিম্মত নিয়ে বিকশিত হওয়া এক অপূর্ব জীবনযোদ্ধার নাম। বিস্ময়কর এক সংগীতযোদ্ধা। বাংলাদেশে তো বটেই, এই উপমহাদেশেও গিটারিস্ট ও রকসংগীতশিল্পী হিসেবে তিনি ছিলেন উজ্জ্বলতম অ্যাভাঁগার্দ। গণমানুষের শিল্পী আজম খানের পরে সব থেকে শক্তিমান ঢেউয়ের নাম আইয়ুব বাচ্চু। সত্যি বলতে কি, দেশের সর্বস্তরের মানুষের তথা আমজনতার হৃদয় তার মতো এত বেশি আর কেউ ছুঁতে পারেননি। জীবৎকালেই তিনি প্রবাদপ্রতিম হয়ে ওঠেন। দেশে বাংলা গান এবং সামগ্রিকভাবে রকসংগীত প্রতিষ্ঠায় তার প্রণিধানযোগ্য অবদান রয়েছে। বলা উচিত, বাংলা রকগানকে তৃণমূল পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে একক কৃতিত্ব তারই। বাংলা গানকে আন্তর্জাতিক অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার জন্য তার নিরলস প্রচেষ্টা ছিল আমৃত্যু। এক্ষেত্রে তার অনেক উল্লেখযোগ্য সৃষ্টিকর্ম রয়েছে। বহুমাত্রিক কাজ রয়েছে। তিনি স্বপ্ন দেখতেন এমন পাশ্চাত্যের কোনো খ্যাতিমান শিল্পীর গান যেমন তামাম দুনিয়ার মানুষ শোনেন, একইভাবে বাঙালি শিল্পীর বাংলা গানও তারা অনুরাগ নিয়ে শুনবেন। অভিভূত হবেন। জন্যভূমি ও বাংলা গানের প্রতি প্রচণ্ডরকম দরদ ছিল তার। আদতে তিনি ছিলেন একাই একশো। ‘ওয়ান ম্যান আর্মি’ বলতে যা বোঝায়, সংগীতের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন তা-ই। মস্ত বড় বাহাদুর।

এই লেখাটিতে শিল্পী আইয়ুব বাচ্চুর সংগীতের চেয়ে তার একান্ত ব্যক্তিগত কিছু অনুরাগের দিকে ফোকাস করতে চাই। যা একেবারেই অনালোচিত। অপ্রকাশিত। বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বিবেচনায় একটি নোকতা দিয়ে রাখতে চাই। আধ্যাত্মিক জগতের প্রতি আইয়ুব বাচ্চুর গভীর দরদ ছিল। তিনি সুফিবাদের আশিক ছিলেন। অনেকে হয়তো ভাবছেন, তিনি তো রকস্টার; হুট করে এ আমি কী লিখছি! হ্যাঁ, ঠিকই লিখছি। সুফিবাদের প্রতি তার প্রবল অনুরাগ ছিল। বহুভাবে তা গানেও এসেছে। ‘কাফেলা’ অ্যালবাম তার সেই অনুরাগের একটি উজ্জ্বল নমুনা। একদিন সন্ধ্যেবেলা ভাইজানকে (আইয়ুব বাচ্চুকে আমি ‘ভাইজান’ সম্বোধন করতাম) প্রশ্ন করেছিলাম, অধ্যাত্মবাদ নিয়ে। তিনি বলেছিলেন খুব অল্প কথায়   ‘বুঝলে, আমি খুব খোদাভক্ত মানুষ। স্রেফ আল্লাহর গোলাম আমি। মানুষই আমার সবটুকু ভালোবাসা।

ওই ওপরওয়ালা সবই জানেন। মাঝেমধ্যে আমি পীর-আউলিয়ার মাজারে চলে যাই। চুপচাপ। রাতের বেলা...।’ বললাম, ‘আপনাকে সেই সমস্ত পাবলিক প্লেসে লোকজন তো ঘিরে ধরার কথা! কীভাবে ম্যানেজ করেন?’ তার জবাব  ‘... না, তেমন অসুবিধা হয় না। রাতের বেলা তো। অন্ধকারে পৌঁছে যাই...।’ হ্যাঁ, তিনি সুফি সাধক-আউলিয়াদের দরগাহে যেতেন। এক্ষেত্রে চট্টগ্রাম, ঢাকা ও সিলেট অঞ্চল উল্লেখযোগ্য। নামাজ, জিয়ারত, এবাদত-বন্দেগি ভালোবাসতেন। তার অনুজ সহোদর ইরফান চৌধুরীর সঙ্গেও এ ব্যাপারে আমার বিশদ আলাপ হয়েছে। তো, যা বলতে চেয়েছি তিনি সংগীত সাধনার বাইরেও সুফি ভাবধারার ভেতরে একটি আধ্যাত্মিক জগতের অনুসন্ধানে পরিব্যাপ্ত ছিলেন। মানুষকে নিয়েই ছিল তার সংগীত, প্রেম, এবাদত সবকিছু। নবীনদের অগ্রযাত্রা দেখতে চাইতেন। নিজেই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন অসংখ্য মানুষের জন্য। তপন চৌধুরীর প্রথম ক্যাসেটের সবগুলো গান তারই সুর ও সংগীত পরিচালনায় সৃষ্টি হয়। অনেক শিল্পীকে তিনি যতœ করে গড়ে তুলেছেন। তারা সংখ্যায় এত বেশি যে, সবার নাম বলা প্রায় অসম্ভব। তথাপি দুজনের নাম বলতে চাই। একজন পার্থ বড়ুয়া। অন্যজন হাসান আবিদুর রেজা জুয়েল। নিজের সম্বন্ধে তার বিশ্বাস ছিল এটুকুই যে, তিনি মাছ-ভাতপ্রিয় একজন সাদামাটা বাঙালি এবং বাংলাদেশের সংগীতশিল্পের একজন ক্ষুদ্র কর্মী। এমন বিনয়, বিশ্বাস ও চর্চার ফলে পাশ্চাত্যের প্রথাগত রকস্টার এবং তার আদবকেতা কখনোই একই ধাঁচের ছিল না। একই রকম হওয়ার কথাও নয়। রকস্টার হওয়া সত্ত্বেও তিনি অত্যন্ত বিনয়ী ও সমাজসচেতন মানুষ ছিলেন। শিক্ষক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারসহ বিভিন্ন কর্মকা-ের সঙ্গে যুক্ত মানুষেরা যেমন সামাজিক দায়বোধসম্পন্ন পেশাজীবী; একইভাবে তিনিও তা-ই। বস্তুত এরূপ বিশ্বাস ও দায়বদ্ধতা নিয়েই তিনি সারা জীবন কাজ করেছেন। অবশ্য এইসব সূক্ষ্ম ব্যাপার সর্বস্তরের মানুষের বোঝার কথা নয়। ফলত, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ তাকে একজন মায়েস্ত্রো গিটারিস্ট এবং সংগীতশিল্পী হিসেবেই বেশি ভালোবাসেন। কার্যত এটিই স্বাভাবিক।

মানুষটি নেই। দেখতে দেখতে প্রায় পাঁচ বছর হতে চলল। তার গিটারগুলো স্তব্ধ, নির্বাক ̶  যেন সারি করে রাখা একেকটি শোকের স্মারক। যেন সুখ-দুঃখে মোড়ানো একেকটি সহস্র গল্পের মনুমেন্ট। ব্যাখ্যাতীত। তবু রোজকার ‘ঘুম ভাঙা শহরে’ (গীতিকার: শহীদ মাহমুদ জঙ্গী) কত শত ঘরে তিনি ঠিকই বেজে ওঠেন। একটি গানের মধ্যে তিনি ব্যক্ত করেছেন:

“যে মানুষটি হারিয়ে যায়,

বের করা যায় না তাকে খুঁজে...”

(গীতিকার: বাপ্পী খান)

এরও আগেই তিনি গেয়েছেন:

“এই রুপালি গিটার ফেলে

একদিন চলে যাব দূরে, বহুদূরে...

সেদিন চোখে অশ্রু তুমি রেখো

গোপন করে...”

(গীতিকার : কাওসার আহমেদ চৌধুরী)

আইয়ুব বাচ্চুর গানের মধ্যে গভীর কষ্ট নিয়ে অনেক দূরে চলে যাওয়া বা হারিয়ে যাওয়ার যে রকম দুর্নিবার আকুতি আমরা উপলব্ধি করি, তদ্রƒপ মর্মন্তুদ অভিব্যক্তি দেশের অপরাপর সংগীতশিল্পীর মধ্যে বিরল। শিল্পে ট্র্যাজেডি বা বিরহ-ব্যঞ্জনার শক্তি অপরিসীম।

আইয়ুব বাচ্চুর পুরো জীবনজুড়েই ছিল এক গভীর আবেগমথিত সংগীত-সাধনা। তিনি গিটার এবং গানের সঙ্গে নিজেকে একীভূত করে রেখেছিলেন আমৃত্যু। আমাদের জেনারেশনের কিশোরবেলার সমান্তরালে তার সংগীতজীবনের নিজস্ব পথ রচিত হয়। ফলত, আমাদের কৈশোর আর প্রথম যৌবনে বেড়ে ওঠার নানা বাঁকে, যাপিত জীবনে, স্মৃতির গহিনে তিনি মিশে আছেন, থাকবেন। এগুলো সহজ ব্যাপার নয়। সব শিল্পীর তকদিরে এমন রুহানি আলোর দেখা মেলে না। আইয়ুব বাচ্চুর এ এক অসামান্য অর্জন, বলাই বাহুল্য। বাংলাদেশে তো বটেই এ উপমহাদেশের মানুষের কাছে গিটার নামক ইন্সট্রুমেন্টের মোজেজা বোঝানোর ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন প্রকৃত অ্যাভাঁগার্দ শিল্পী। আমরা সবাই তার গান এবং গিটারবাদন শুনেছি। নানাভাবে দেখেছি। কিন্তু কেউ সেভাবে হয়তো ভাবিনি।

এই ভূখণ্ডে ক্ষণজন্মা একজন আইয়ুব বাচ্চু ছিলেন। প্রবলভাবে ছিলেন। সবটুকু হিম্মত নিয়েই বেঁচে ছিলেন। এখন তিনি নেই। তার মতো আর কেউই নেই...। আইয়ুব বাচ্চুর গীতিকবিতা, গান, গিটারের সুর, সংগীত ̶  সবকিছুই আছে, থাকবে। তার সৃষ্টিকর্মের মধ্য দিয়ে কোটি কোটি শ্রোতাদের মধ্যে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে তিনি অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তার বহুমাত্রিক গানের ভাণ্ডারের দিকে মনোযোগ দিলে বিস্ময় জাগে। মানুষটি কী পরিমাণ কাজ করেছেন! এখন যে ধরনের হাইব্রিড-সময় চলছে বা যেরকম ‘শর্টকাটের যুগ’ এসেছে, তাতে আইয়ুব বাচ্চুর মতো বহুমাত্রিক প্রতিভাসম্পন্ন কালজয়ী সংগীত-সাধক তৈরি হওয়া প্রায় অসম্ভব।

১৯৯৬ সাল। তখন আইয়ুব বাচ্চুর যুগান্তকারী ক্যাসেট ‘কষ্ট’ রিলিজ হয়েছে। নাম-যশ ও খ্যাতির চূড়ায় তিনি। এলআরবি এবং সলো ক্যারিয়ার দুটোতেই বিস্ময়কর সাফল্য লাভ করেছেন। তো, একদিন পূর্বনির্ধারিত দিন মোতাবেক আমি বেইলি রোডের অডিও আর্ট স্টুডিওতে যাই। বাড়ন্ত দুপুর। ভাইজান বেশ খোশমেজাজে, ফুরফুরে আছেন। তার পরিধানে রয়েছে চিরদিনের প্রিয় কালো টি-শার্ট আর নীল জিন্স। মাথায় কালো হ্যাট। স্টুডিওতে কাজ করছেন। কাজ মানে, চেয়ারে বসে তিনি গিটার বাজাচ্ছেন। আমাকে বললেন : ‘বসো, কাজটা সেরে নিই’। আমি বসে মুগ্ধ হয়ে শুনতে থাকি তার গিটারের যন্ত্রণাদগ্ধ সুর (১৯৯৩ সালে আইয়ুব বাচ্চু’র সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ঘটে তার মৌচাকের বাসায়। কিন্তু কনসার্ট ছাড়া তার সান্নিধ্যে এসে কোনোদিন গিটার শোনার সুযোগ মেলেনি। সেদিনই প্রথম)। আইয়ুব বাচ্চুর ‘কষ্ট’ নিয়ে সেদিন বেশিরভাগ আলাপ হয়। তিনি শ্রোতাদের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলেন। জন্মভূমি বীর চট্টলার কয়েকজন প্রিয় মানুষের খবর নিলেন। তারপর এক ফাঁকে স্টুডিওর খিদমতগার মারফত ফাস্টফুড আনালেন। দুজনে খেলাম। আমার ব্যাকপ্যাকে স্কেচবুক, পেন্সিল, কালিকলম, ইরেজার ইত্যাদি শিল্প-সরঞ্জাম ছিল। যথারীতি থাকে। আমি ভাইজানের একটি রেখাচিত্র আঁকতে চাইলাম। তিনি বললেন : ‘আজ না রে, আরেকদিন’। তারপর তিনি নিজেই স্কেচবুক চেয়ে নিয়ে দারুণ ক’টা কথা লেখেন। দেখি, চমৎকার হস্তাক্ষরে লেখা একটি মায়াময় চিঠি হয়ে গেল তা।

লেখাটির ভেতর একটি শব্দ আছে ‘এতদূর’। শব্দটি বুকের ভেতর হু হু করে। উড়ে যায় দূর অজানায়...। আইয়ুব বাচ্চু একজীবন ‘কষ্ট’ নিয়ে ‘এতদূর’ চলে গিয়েছেন যে, এ জীবনে আর কোনোদিন তার সঙ্গে মোলাকাত হবে না...।

লেখক : চিত্রশিল্পী, শিক্ষক ও গবেষক- বঙ্গীয় শিল্পকলা চর্চার অন্তর্জাতিক কেন্দ্র।