পুরনো দুর্গে নাবকা

[১৯৮৮ সালে নোবেলজয়ী মিসরীয় লেখক নাগিব মাহফুজ আরবি সাহিত্যের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র, আধুনিক আরবি সাহিত্যের প্রাণপুরুষ।  একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্প লেখক, চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য রচয়িতা এবং নাট্যকার। নাগিব মাহফুজের মৃত্যু হয় ২০০৬ সালের ৩০ আগস্ট, কায়রোতে। মৃত্যুর বারো বছর পরে, অর্থাৎ ২০১৮ সালে, লেখকের স্বহস্তে লেখা গল্পের পা-ুলিপি ড্রয়ারের ভেতর খুঁজে পাওয়া যায়। পা-ুলিপি সুতায় বাঁধা ছিল এবং সংযুক্ত লেবেলে লেখা ছিল ‘১৯৯৪ সালে প্রকাশিত হবে।’ আততায়ীর হাতে জখম হওয়ার কারণে তিনি গল্পগুলো সময়মতো প্রকাশ করতে পারেননি। সেখানে ১৮টি গল্প ছিল এবং প্রতিটি গল্প লেখকের স্মৃতিবিজড়িত কায়রোর বিখ্যাত গামালিয়া মহল্লার বাসিন্দাদের ঘিরে রচিত হয়েছে। গল্পগুলো লেখকের অন্যতম অনুবাদক রজার অ্যালেনের ইংরেজি অনুবাদে ‘দ্য কোয়ার্টার : স্টোরিজ বাই নাগিব মাহফুজ’ শিরোনামে ২০১৯ সালে প্রকাশিত হয়। ‘পুরনো দুর্গে নাবকা’ গল্পটি ‘দ্য কোয়ার্টার: স্টোরিজ বাই নাগিব মাহফুজ’ গ্রন্থের ‘নাবকা ইন দ্য ওল্ড ফোর্ট’ গল্পের অনুবাদ। উল্লেখ্য, গল্পটি আগে বাংলায় অনূদিত হয়নি।]

 

পানি বিক্রেতা অ্যাডামের কনিষ্ঠ পুত্র নাবকা। মহামারী প্লেগে নয় সন্তান মারা যাওয়ার পর তিনি নাবকার বাবা হয়েছেন। তিনি ছেলেকে স্থানীয় মসজিদের সেবায় নিয়োজিত করার অঙ্গীকার করেন, যদি সৃষ্টিকর্তা তাকে বাঁচিয়ে রাখেন। তিনি তার অঙ্গীকার পালন করেন। ছেলের বয়স যখন সাত বছর, তখন তিনি ছেলেকে মসজিদের ইমামের হাতে তুলে দেন। ‘সৃষ্টিকর্তার আপন ঘর পরিচর্যা করা হলো সবচেয়ে ভালো কাজ,’ তিনি তার বন্ধুদের বললেন। ‘নামাজের মাঝে, দোয়া-দরুদ ও পড়াশোনার ফাঁকে তার হৃদয় আলো এবং আশীর্বাদ উভয়ই আত্মস্থ করবে।’

নাবকা অধিকাংশ সময় মসজিদে ব্যয় করে। সে খুব অল্প সময় বাড়িতে অথবা মহল্লার ছেলেদের সঙ্গে সময় কাটায়। ইমাম তার ওপর অত্যন্ত খুশি। তিনি নাবকার কর্মশক্তি ও নির্ভরযোগ্যতাকে প্রশংসা করেন। তার বয়স এখন প্রায় দশ বছর এবং এ বয়সে সে তার বাবা এবং মাকে হারায়। ভূগর্ভস্থ জায়গার ওপর পুরনো দুর্গটি বিশেষভাবে পছন্দ করার জন্য সে সবার কাছে পরিচিত ছিল।

‘কখন ভূগর্ভস্থ জায়গার মধ্যে দুর্গটি খুলবে?’ সে পাশ দিয়ে যাওয়া পথচারী সবাইকে জিজ্ঞেস করত। ‘সাধারণত দুর্গটি বছরে একবার খোলে, যখন প্রতœতত্ত্ববিদ আসেন,’ সবার একই প্রতিক্রিয়া, ‘তবে এখন দুর্গটি শয়তানদের আস্তানায় পরিণত হয়েছে।’

যখন নাবকার বয়স দশ বছর, তখন ইমাম তাকে তার বাবা ও মায়ের কবর জিয়ারত করার অনুমতি দেন। ‘এখন কবর জিয়ারত করার মৌসুম নয়,’ তিনি ছেলেটিকে বললেন।

তবে নাবকা জোরাজুরি করে এবং সে স্বপ্ন দেখার অজুহাত দাঁড় করায়। সে কবরস্থানে যায়, কিন্তু সময়মতো ফিরে আসেনি; তিন দিন অতিবাহিত হয়েছে। ইমাম সতর্ক হন এবং ধারণা করেন যে, ছেলেটি হয়তো তার জীবনের নতুন কোনো চলার পথ পছন্দ করেছে অথবা অন্য কোনো কারণ, হয়তো ছেলেটির কিছু একটা ঘটেছে। তিনি তার দুশ্চিন্তার কথা মহল্লার প্রধানকে বলেন এবং ছেলেটিকে খুঁজে আনার জন্য শেইখ একজন প্রহরীকে পাঠান। কিন্তু তৃতীয় দিন শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে প্রহরী দেখে যে, ছেলেটি ভূগর্ভস্থ ঘর থেকে বেরিয়ে আসছে। তার চোখেমুখে ফুটে আছে নির্মল অভিব্যক্তি, যা তার ব্যবহারের সঙ্গে মিলে না। ‘তুমি কোথায় ছিলে?’ ইমাম রাগী গলায় জিজ্ঞেস করেন।

‘আমি মৃতদের সঙ্গে ছিলাম,’ ছেলেটি শান্তভাবে বলল। ‘তারা আমাকে জ্ঞান এবং শক্তি দিয়ে পরিপূর্ণ করেছেন।’

‘তুমি কী উন্মাদ হয়ে গিয়েছ, নাবকা?’ ইমাম জিজ্ঞেস করেন। তাকে বিস্মিত দেখাচ্ছে। ‘নাকি কোনো শয়তান তোমার ওপর ভর করেছে?’

‘সৃষ্টিকর্তা আপনাকে বিদায় জানিয়েছেন! আমি চললাম।’ ‘তুমি কোথায় যাচ্ছ?’

‘আপনার ভৃত্য হয়ে থাকা কিংবা আপনি আমার মনিব হন, তা আমার জন্য কিছুতেই ঠিক হবে না।’ ‘সৃষ্টিকর্তা তোমাকে আরোগ্য দান করুক!’ ইমাম চিৎকার করে বললেন।

তখন থেকে মহল্লার সবাই পানি বিক্রেতার ছেলে নাবকার জীবনের অন্যদিক সম্পর্কে জানতে পারে।

ছেলেটির আচার-আচরণ কতটা বেহায়া হয়ে উঠেছে, তা দেখে লোকজন হতবাক হয়ে যায়। তার মতো দশ বছরের একটা ছেলের, এমনকি কোনো উন্মাদের কাছ থেকেও তারা কেউ আশা করেনি। ছেলেটি মহল্লার সম্মানিত লোকজনের মুখোমুখি হতে শুরু করে এবং সাধারণত এ ধরনের বাক্য দিয়ে তাদের সম্বোধন করে :

‘আপনার নিজেকে নিয়ে লজ্জিত হওয়া উচিত!’

‘কীভাবে আপনি এ ধরনের কাজ করেন?’

‘আপনি কী এখনও আত্ম-সম্মানের অভিনয় করেন?’ এ ধরনের সম্বোধন দিয়ে শুরু করার পরে ছেলেটি লোকজনের নৈতিকতা অথবা আর্থিক কেলেঙ্কারির কথা উল্লেখ করে। ফলাফল দেখা যায় যে, সবাই রাগে-ক্ষোভে ফুঁসতে থাকে এবং চিৎকার-চেঁচামেচি করে। লোকজন ভেবে পায় না যে, ছেলেটি কোন সূত্র থেকে এসব গোপন তথ্য সংগ্রহ করেছে। তাদের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সমস্ত সম্ভাব্য রূপ নিয়েছে : ষড়যন্ত্র ও শত্রুতা এবং দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়া আতঙ্ক। কথাটা বলার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে, মহল্লায় শয়তান ছেলেটির ওপর ভর করেছে। মসজিদের ইমামের জন্য সম্পূর্ণ ঘটনাটি বেশ কঠিন হয়ে পড়ে; তিনি ঘটনার জন্য কোনোভাবে নিজেকে দায়ী করেন। চারদিকে ছড়িয়ে পড়া নেতিবাচক মন্তব্য তার ওপর প্রভাব ফেলে এবং তিনি নাবকার সঙ্গে দেখা করার সিদ্ধান্ত নেন।

‘তুমি তোমার মসজিদে ফিরে যাও!’ তিনি চিৎকার করে বললেন।

‘তুমি তোমার মসজিদে ফিরে যাও!’ ছেলেটি ইমামের চেয়েও আরও জোরে চিৎকার করে বলল। ‘আমার আর কোনো মসজিদ নেই।’

ইমাম তার বিরুদ্ধে ধর্মের বিরোধিতা করার অভিযোগ করেন। তিনি ছেলেটিকে সব শক্তি দিয়ে জোরে ঘুষি মারেন। যা হোক, ছেলেটি অচেনা নতুন শক্তির বদৌলতে ইমামকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিতে পেরেছে। নিজের ভারসাম্য হারিয়ে ইমাম পেছন দিকে পড়ে যান এবং আতঙ্কে কাঁপতে থাকেন। তড়িঘড়ি করে মহল্লার প্রধান ঘটনাস্থলে এসে হাজির হন।

‘চিরকালের জন্য সুনাম হারানোর আগে তাড়াতাড়ি মহল্লায় যাও,’ ইমাম ছেলেটিকে বললেন। ‘আমি কখনো একটি মিথ্যা শব্দ উচ্চারণ করব না,’ ছেলেটি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জোর গলায় বলল। ‘আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে,’ জবাবে মহল্লার প্রধান চিৎকার করে বললেন। ‘আপনি নিজেকেই সম্মান করেন না,’ ছেলেটি উন্মাদের ভঙ্গিতে বলল। ‘সুতরাং আপনি কীভাবে লোকজনকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার কথা বলেন?’ আর এ কথাটাই মহল্লার প্রধানকে অগ্নিমূর্তি করে তোলে এবং তিনি বেতের লাঠি দিয়ে ছেলেটিকে প্রহার করেন। তিনি প্রথমে হালকাভাবে আঘাত করেন, কিন্তু ছেলেটি তাতে ভ্রুক্ষেপ করেনি এবং একটুও নড়েনি। যখন তিনি ছেলেটিকে জোরে প্রহার করেন, ছেলেটি তখন স্থবির হয়ে শান্তভাবে দাঁড়িয়ে থাকে। সবাই হতাশা নিয়ে দেখছিল। মনে হচ্ছিল ছেলেটি যেন ক্রমশ শক্তি অর্জন করছে এবং আঘাত হজম করার জন্য আরও সক্ষম হচ্ছে। সবার সম্মুখে অন্য জগতের অলৌকিক একটা কিছু ঘটছে।

পরে নাবকা সম্পর্কে আমি যা শুনেছি, তা তার কঠিন আচরণের খণ্ডিত এবং অতিরঞ্জিত বিবরণ। তবে মহল্লায় সংঘটিত কোনো এক লড়াই সম্পর্কে বিভ্রান্তকর বিবরণ পাওয়া যায়, যেখানে সমস্ত ধরনের লোক জড়িয়ে পড়েছিল। তা সারাদিন ধরে চলেছিল এবং বিকেলের দিকে ব্যর্থ হয়, যখন অন্ধকার নেমে এসেছিল। লোকজন বলাবলি করছিল যে, নাবকাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং জনগণ তাকে পদদলিত করেছে। যা হোক, কবরের বাসিন্দারা নিশ্চিত করেছে যে, সে এখনো বেঁচে আছে। তারা তাকে ভূগর্ভস্থ এলাকার আশপাশে ঘোরাঘুরি করতে দেখেছে। তার প্রত্যেকটি কদমে সে বড় থেকে আরও বড় হতে থাকে, যতক্ষণ না পর্যন্ত সে বিশাল জায়গা দখল করেছে। একসময় তারা তার মাথা আর দেখতে পায় না, যা স্বর্গ পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছে।

আর আজও লোকজন বিশ্বাস করে যে, নাবকা পুরনো দুর্গে বসবাস করছে।