পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে মামলা ১২ হাজারের বেশি আসামি

জামায়াত নেতা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মৃত্যুর পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) এলাকায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় তার ছেলে মাসুদ সাঈদীসহ অজ্ঞাতনামা পাঁচ হাজার ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করে মামলা করেছে পুলিশ। এ ছাড়া সাঈদীর গায়েবানা জানাজা কেন্দ্র করে রাজধানীর পল্টন ও চট্টগ্রামের তিন থানায় চারটি মামলায় অভিযুক্ত পাঁচ শতাধিক। এদিকে সাঈদীকে চিকিৎসা দেওয়া চিকিৎসককে হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ধানম-ি থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে।

বিএসএমএমইউ এলাকা এবং শাহবাগ মোড়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় করা মামলার এজাহারে মাসুদ সাঈদী ছাড়াও আরও তিনজনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তারা হলেন জামায়াতের সহকারী মহাসচিব হামিদুর রহমান, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম ওরফে মাসুদ ও ঢাকা মহানগর জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সাধারণ সম্পাদক মো. সাইফুল ইসলাম। গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় বিষয়টি নিশ্চিত করে ডিএমপির গণমাধ্যম শাখার অতিরিক্ত উপকমিশনার কে এন রায় নিয়তি দেশ রূপান্তরকে জানান, গত মঙ্গলবার রাতে শাহবাগ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. জব্বার বাদী হয়ে মামলা করেন। মামলায় পুলিশের ওপর হামলা ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগও আনা হয়েছে। তবে এ মামলায় কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি।

শাহবাগ থানায় করা মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী গত সোমবার রাতে বিএসএমএমইউ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। সেই খবরে জামায়াত-শিবিরের হাজারো নেতাকর্মী রাতেই বিএসএমএমইউ ও শাহবাগ এলাকায় ভিড় করেন। তারা বিভিন্ন ধরনের উসকানিমূলক সেøাগান দেন। একপর্যায়ে মিছিল করে তারা শাহবাগ থেকে বাংলামোটর ও শাহবাগ মৎস্য ভবনের মোড় পর্যন্ত যান চলাচল বন্ধ করে দেয়। এ সময় শাহবাগের বারডেম ও বিএসএমএমইউতে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী আটকা পড়েন।

পুলিশ তাদের রাস্তা ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করলে পুলিশের সঙ্গে মারমুখী আচরণ করেন তারা। সড়ক না ছেড়ে তারা সরকার ও রাষ্ট্রবিরোধী সোগান দিতে থাকেন। গতকাল ভোরের দিকে সাঈদীর মরদেহ পিরোজপুরে তার নিজ বাড়িতে নেওয়ার সময় জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা ইটের টুকরো, লাঠিসোটা ও রড নিয়ে পুলিশের ওপর হামলা চালান এবং সরকারি কাজে বাধা দেন। তারা বিএসএমএমইউর ভেতরে সরকারি স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ করে ক্ষতি করেন। পুলিশকে লক্ষ্য করে ককটেলও ছোড়েন এতে কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন। এ সময় পুলিশের গাড়ি, মোটরসাইকেল, সাঁজোয়া যানে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। একপর্যায়ে পুলিশ সাঈদীর মরদেহ বহনকারী ফ্রিজিং ভ্যান বের করে আনে। এ সময় পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, রাবার বুলেট ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।

সাঈদীর গায়েবানা জানাজাকে কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গে জামায়াত-শিবিরের সংঘর্ষের ঘটনায় ১১৬ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে পল্টন থানায় মামলা করে পুলিশ। পল্টন থানার ওসি সালাহউদ্দিন জানান, বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর গেটে পুলিশের ওপর হামলা ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার ঘটনায় একটি মামলা করা হয়েছে। ঘটনার সময় আটক ১৬ নেতাকর্মীকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে। এই ১৬ জনসহ মামলায় অজ্ঞাত আরও ১০০ জামায়াত নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে।

পুলিশ জানিয়েছে, সাঈদীর মৃত্যুর ঘটনায় মঙ্গলবার বাদ জোহর জামায়াতের নেতাকর্মীরা বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের ভেতরে বিক্ষোভ মিছিল করেন। একপর্যায়ে তারা বায়তুল মোকাররমের উত্তর ফটকে বেরিয়ে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়ে। পরে তারা বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ের কাছে শোক দিবসে অংশ নিতে আসা আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালান।

এদিকে চট্টগ্রামে গায়েবানা জানাজাকে কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গে জামায়াত-শিবিরের সংঘর্ষের ঘটনায় নগরের কোতোয়ালি থানায় দুটি ও খুলশী থানায় একটি মামলা হয়েছে। মঙ্গলবার রাতে করা এসব মামলার মধ্যে কোতোয়ালি থানার দুই মামলায় চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতের আমির মো. শাহাজাহানসহ ২৫ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। খুলশী থানার মামলায় আটজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত ১০০ থেকে ১২০ জনকে আসামি করা হয়েছে। তিন মামলায় মঙ্গলবার ঘটনাস্থল থেকে আটক হওয়া ৪০ জনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কোতোয়ালি থানার ওসি জাহিদুল কবির এবং খুলশী থানার ওসি সন্তোষ কুমার চাকমা।

চিকিৎসককে হত্যার হুমকি মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে চিকিৎসা দেওয়া বিএসএমএমইউ চিকিৎসক অধ্যাপক এস এম মোস্তফা জামানকে হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। গত মঙ্গলবার রাতে ধানমন্ডি থানায় জিডি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ডিএমপির গণমাধ্যম শাখার অতিরিক্ত উপকমিশনার কে এন রায় নিয়তি।

জিডিতে বলা হয়েছে, সাঈদী অসুস্থ অবস্থায় বিএসএমএমইউয়ের হৃদরোগ বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক চৌধুরী মেশকাত আহমেদের অধীন চিকিৎসাধীন ছিলেন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দলের একজন সদস্য হিসেবে অধ্যাপক মোস্তফা জামান তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু কতিপয় ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইউটিউবের বিভিন্ন আইডি থেকে তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছেন এবং হত্যার হুমকি দিচ্ছেন।

এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, তিনি (মোস্তফা জামান) কাল রাতে আমার কাছে এসেছিলেন। তিনি সমস্ত ঘটনা বলেছেন। আমরা প্রত্যক্ষ করেছি, যিনি চিকিৎসক, যিনি সেবাদান করেন, তাকে চিকিৎসা দিয়েছেন, তাকেও তারা হত্যার হুমকি দিচ্ছে। এটা আমার কাছে আশ্চর্য লাগে!

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমার কাছে মনে হয়, তারা যে নোংরা চিন্তা করে, তারা যে সব সময় সন্ত্রাসী চিন্তা করে, তারা যে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সব সময় চিন্তা করে তারই প্রতিফলন; হুমকির মাধ্যমে তারা জানান দিয়েছে।

গতকাল রাতে র‌্যাবের মুখপাত্র কমান্ডার খন্দকার আল মঈন জানিয়েছেন, ঝিনাইদহের মহেশপুর থেকে তফসিরুল ইসলাম নামের এক হুমকিদাতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়া ঢাকার উত্তরা থেকে হাফিজা মাহবুবা বৃষ্টি নামের একজনকে আটক করার কথা জানিয়েছে সিটিটিসি।

সাঈদীকে বিধিসম্মতভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে : বিএসএমএমইউ দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে আন্তর্জাতিক প্র্যাকটিস অনুসরণ করে সব ধরনের চিকিৎসা বিধিসম্মতভাবে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) কর্র্তৃপক্ষ। কর্র্তৃপক্ষ আরও বলেছে, সাঈদীর রোগের গতিপ্রকৃতি, চিকিৎসা ও সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ পরিণতি সম্পর্কে তার ছেলে মাসুদ সাঈদী অবগত ছিলেন। গতকাল বিকেলে বিএসএমএমইউ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানায়। বিএসএমএমইউ কর্র্তৃপক্ষ গতকাল বিকেল ৩টায় সাঈদীর চিকিৎসা বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন ডাকে। কিন্তু তার আগেই অনিবার্য কারণে সেই সংবাদ সম্মেলন বাতিল করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ সাঈদীর চিকিৎসা বিষয়ে এই সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেয়।

কক্সবাজারে ৫ মামলায় আসামি ৭ হাজার : দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর গায়েবানা জানাজা ঘিরে কক্সবাজারের চকরিয়া ও পেকুয়ায় পুলিশের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনায় পাঁচটি মামলা হয়েছে। গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় চকরিয়া ও পেকুয়া থানায় করা এসব মামলায় ৪৫২ জনের নাম উল্লেখসহ সাড়ে ৭ হাজার জনকে অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে চকরিয়া থানায় হত্যা মামলা, বিশেষ ক্ষমতা আইন ও পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগে তিনটি এবং পেকুয়া থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইন ও পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগে দুটি মামলা করা হয়। চকরিয়া থানার ওসি জাবেদ মাহমুদ এবং পেকুয়া থানার ওসি ওমর হায়দার মামলাগুলো নথিভুক্তের তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়েছে চট্টগ্রাম ব্যুরো ও কক্সবাজার প্রতিনিধি