এই পদ্মা এই মেঘনার লালনসম্রাজ্ঞী

কেউ বলে লালনকন্যা, কেউবা লালনসম্রাজ্ঞী, আবার কেউ বলে জীবন্ত কিংবদন্তি।

ফরিদা পারভীন। আধুনিক সমাজে লালনগীতিকে প্রতিষ্ঠিত করার পেছনে যার ভূমিকা অনস্বীকার্য। সংগীতে বিশেষ অবদানের জন্য পেয়েছেন একুশে পদক, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং এশিয়ার নোবেলখ্যাত ফুকুওয়াকা অ্যাওয়ার্ড। ফ্রান্সের এক লেখক এই শিল্পীর আত্মজীবনী লিখছেন। সংগীতের দিকপাল ফরিদা পারভীন এসেছিলেন দেশ রূপান্তরে। তার সঙ্গে গান-গল্পে মেতে ওঠেন সহকারী সম্পাদক তাপস রায়হান, জ্যেষ্ঠ সহ সম্পাদক মোহসীনা লাইজু, আপেল মাহমুদ ও বিনোদন সম্পাদক মাসিদ রণ। ক্যামেরার পেছনে ছিলেন লিটু হাসান। গ্রন্থনা : মাসিদ রণ

দিনটি ছিল মেঘ-বৃষ্টি ভরা। থেমে থেমে বৃষ্টিতে ভিজছে রাজধানী। প্রখ্যাত শিল্পী ফরিদা পারভীন এলেন পড়ন্ত বিকেলে আড্ডা দিতে। গল্প শুরুর আগেই বাংলা মোটরে দেশ রূপান্তর কার্যালয়ের টপ ফ্লোরে গ্রিন লাউঞ্জ রেস্টুরেন্টের সবুজে ঘেরা ছাদ বাগানে ফটোশুটে অংশ নেন ফরিদা পারভীন। সেই চিরচেনা সাজ। সহজ সরল হাসি জড়ানো মুখে বারবার ক্যামেরায় ধরা দিচ্ছেন তিনি। বরাবরের মতোই পরনে জামদানি শাড়ি। আজকের রঙটা সুইট কফি। সঙ্গে পছন্দের সোনার হালকা গয়না। এক হাতে চুড়ি, অন্য হাতে সোনালি রঙের ঘড়ি। এদিকে স্টুডিওতে সবাই তার অপেক্ষায়। সোজা নিচে নেমেই তিনি বসলেন আড্ডায়।

আজকের আড্ডাটা প্রকৃত অর্থেই আড্ডা। তাই অন্যদিনের মতো তার ছোটবেলার গল্প দিয়ে শুরু হলো না কথা। তাপস রায়হান প্রশ্ন করলেন, একবার বলেছিলেন, কলকাতায় লালনের গান আসলে কিছুই হয় না। কেন বলেছিলেন?

ফরিদা পারভীন : কলকাতার একটি জনপ্রিয় দৈনিক আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, আপনাদের লালন ফকিরের গান আর আমাদের লালন ফকিরের গানের মধ্যে কি কোনো পার্থক্য দেখতে পান? আমি বললাম, এক কথায় জবাব দিই? আমাদেরটা হয়, আর আপনাদেরটা হয় না! এ কথা আমি কেন বলেছিলাম, সেটি কিন্তু আর বলার সুযোগ হয়নি। আজ যখন সেই প্রশ্নটি আপনারা করলেন, তাই বলছি- আসলে লোকজ গান হোক কিংবা ট্রেডিশনাল গান, সেগুলো কিন্তু একেকটা অঞ্চলভিত্তিক। লালন ফকিরের গান কিন্তু কুষ্টিয়া অঞ্চলের, খুলনা বেল্টের (যশোর, ঝিনাইদহ, নড়াইল) গান। আগে তো ছিল নদিয়া জেলার অন্তর্ভুক্ত। এই এলাকাতেই লালন ফকির থাকতেন। ফলে এই অঞ্চলের মতো করেই তিনি গান রচনা করেছেন, সব মুখে মুখে। যে কারণে কলকাতার শিল্পীরা যখন এই গানগুলো গায়, কোথায় যেন কিছু একটার অভাব আছে। এ কথা আমি জোর গলায় বলতে পারি, কারণ আমি তো সঠিক গুরুর ঘরানা থেকেই শিখে এসেছি।    

মাসিদ রণ : শুরু থেকেই লালনের গানকে বেছে নেননি। পরবর্তী সময় লালনগীতিতেই নিজেকে নিবেদন করলেন কেন?

ফরিদা পারভীন : এটা ঠিক যে, আমি শুরু থেকেই লালন ফকিরের গানের চর্চা করিনি। আমার গানের শিক্ষা একেবারে সংগীতের যে মূল অংশটি, সেখান থেকেই অর্থাৎ ক্লাসিক্যাল মিউজিক দিয়েই আমার যাত্রা শুরু। গুরু ধরে শেখা যাকে বলে আর কী, সেভাবেই তালিম নিয়েছি। দীর্ঘদিন ধরে ক্লাসিক্যাল সংগীতই চর্চা করেছি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ হিসেবে আমরা সবকিছুতেই কেমন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলাম। আস্তে আস্তে সব আবার আগের মতো করার চেষ্টা করা হলো সর্বমহলে। তেমনভাবেই লালন ফকির কুষ্টিয়াতে যে দোল পূর্ণিমা পালন করতেন সেটির প্রচলন শুরু হলো। ঢাকা থেকে অনেক গণ্যমান্য শিল্পী সেই প্রোগ্রামে গিয়েছিলেন। তখন তো আমি মাত্র এসএসসি পাস করেছি, তেমন কাউকে চিনিও না। যা হোক, সেই প্রোগ্রামে লালনের গান প্রথমবারের মতো গাওয়ার জন্য রীতিমতো জোর করতে থাকলেন আমার গুরু মোকসেদ আলী সাঁই। তার ভাষ্যমতে, তিনি অনেক দিন ধরে একটি পরিশীলিত কণ্ঠ খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন, যাকে নিয়ে লালনের গানকে সমৃদ্ধ করা যায়। পরিষ্কার করে বলতে গেলে, লালন ফকিরের গান এতদিন আখড়াতেই গাওয়া হতো। আর আপনি যদি সংগীত বলেন, সেটি হলো গুরুমুখী বিদ্যা। সাতটি স্বরের সঙ্গে গলা মেলাতে হয়, তাল, লয়, উচ্চারণ সবটাই শিখতে হয়। কিন্তু ফকিররা লালনের গান করতেন ভাবের মধ্যে থেকে। সেই কারণে কোথায় যেন একটা অপূর্ণতা ছিল লালনের গায়কিতে। গানগুলো সর্বজনীন হয়ে ওঠেনি তখন। ফকিররা সাঁইজির কালামকে পুঁজি করে ভিক্ষা করে বেড়াতেন! এসব কথা যারা একটু গবেষণা করেন তারা সবাই জানেন। যা হোক, এসব কারণেই আমার গুরু আমাকে লালনের গান কণ্ঠে তুলতে বারবার বোঝালেন। কিন্তু আমার মনে হতো আমি ক্লাসিক্যাল গানের চর্চা করি, আর তখন আমি ছোট মানুষ হলেও কুষ্টিয়াতে নজরুলের গানের জন্য আমার পরিচিতি ভালোই তৈরি হয়েছিল। ১৯৬৮ সাল থেকেই রাজশাহী বেতারে আমি নজরুলের গান করি। তাই আমার গুরু অনেক করে বোঝালেও আমি মন থেকে সায় দিতে পারছিলাম না। কারণ এখন যেমন দুটি গান মুখস্থ করেই রিয়েলিটি শোতে এসে লাখ লাখ টাকা, গাড়ি, বাড়ি পেয়ে যাচ্ছে অনেকে। তখন তো সেই সুযোগ ছিল না। শিল্পীরা মনে করত, আমি গান গাইতে পারছি, মানুষের ভালোবাসা পাচ্ছি, এটাই তো বড় বিষয়। যে ধারার গানই আপনি গান না কেন, তার জন্য দীর্ঘদিনের চর্চা ছিল পেছনে। একপর্যায়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও লালনের গান করি। সত্য বল, সুপথে চল, ওরে আমার মন গানটি দিয়েই সাঁইজির কালাম কণ্ঠে তুলে নিলাম।  এরপর তো আমার গুরু আমাকে শেখালেন। গুরুজি আমাকে বলেছিলেন, তুই একটি মাত্র গান করো। মানুষ যদি পছন্দ না করে আর কখনো গাইতে বলব না। কিন্তু সেই প্রথম গানেই একেবারে সাড়া পড়ে গেল রীতিমতো। তাই আর আমি সাঁইজির কালাম ছাড়তে পারলাম না!   তখন আমি জানি না, ঐশ্বরিক কোনো অনুরণন ঘটেছিল কি না! সারা দিন আমি এটা নিয়ে ভেবেছি। কে যে আমাকে ভাবিয়েছে যে, লালন সাঁইজির গান করলে তোর অনেক ভালো হবে, সেটি আমি বলতে পারব না (কথাগুলো বলতে বলতে শিল্পী যেন কোনো এক ভাবের দুনিয়ায় চলে গেলেন। খালি গলায় কিংবদন্তি গেয়ে উঠলেন, সত্য সুপথ না চিনিলে, পাবিনে মানুষের দরশন, ওরে আমার মন, সত্য বল, সুপথে চল, ওরে আমার মন। খরিদ্দার মহাজন যে জন, বাটখারাতে কম, তারে কসুর করবে জম, গদিয়ান মহাজন যে জন, বসে কেনে প্রেম রতন, সেজন বসে কেনে প্রেম রতন, সত্য বল, সুপথে চল, ওরে আমার মন। গান শুনে সবার হাতে অজান্তেই তালির ফোয়ারা, আর সঙ্গে তৃপ্তির হাসি মুখে)।

মোহসীনা লাইজু : লালনের গানে জড়ানোর পরবর্তী প্রেক্ষাপটটা কেমন?

ফরিদা পারভীন : আমার গুরুর কাছেই আমি পুরোদস্তুর লালনের গানের তালিম নেওয়া শুরু করি। সঙ্গে সঙ্গে প্রোগ্রামেও গাইতে থাকি। ১৯৭২-৭৩ সালে তিনিই আমাকে ঢাকায় নিয়ে এলেন ট্রান্সক্রিপশন সার্ভিসের সাত দিনব্যাপী লোকসংগীতের সম্মেলনে। তখন আমি ছাড়াও দেশের আনাচকানাচ থেকে অনেক গুণী শিল্পীর আবির্ভাব হয় জাতীয় পর্যায়ের সংগীতাঙ্গনে।  আমারই ২০০ থেকে ২৫০টি গান প্রিজার্ভ করা হলো। কিন্তু এখন কোনো কাজে সেই গানগুলো খুঁজলে আপনি পাবেন না। আধুনিক প্রযুক্তির অভাবে অনেক গান নষ্ট হয়ে গেছে। এটা খুবই দুঃখজনক।

তাপস রায়হান : লালনের গান সংরক্ষণের জন্য তাহলে কি কিছু করা হচ্ছে?

ফরিদা পারভীন : হচ্ছে টুকটাক। আমরা আমাদের অচিন পাখি একাডেমি থেকে অনেকগুলো গানের স্বরলিপি তৈরি করেছি। ফকিররাও তাদের মতো করে করছে না, তা নয়। তবে প্রশ্ন থাকতে পারে, সেগুলো কতটা সঠিক? অনেকে আবার নিজের গানকে লালনের গান বলে চালিয়ে দেন! কারণ এখন লালনের গানের ট্রেন্ড চলছে না? আমার নিজের চোখে দেখা, দেশের আধুনিক গানের অনেক জনপ্রিয় শিল্পী বিদেশে গিয়ে লোক গান গাইছেন। কারণ আমাদের লোক গান হচ্ছে সারা পৃথিবীর মধ্যে অন্যতম। ইউনেসকোর জরিপে বলা হয়েছে, ভাবজগতের শিরোমণি হচ্ছে লালন সাঁইজির গান। তাহলে হাজার বছরের সংস্কৃতিকে আপনি যেনতেন করে প্রেজেন্ট করবেন, সেটা তো হতে পারে না। এটা যারা করছেন তারা সস্তা বাহবা কিংবা সস্তা চমক সৃষ্টির জন্য করছেন। যেটা লালন ফকির বলেই গেছেন, ‘দেখ না মন ঝাঁক মারি এই দুনিয়াদারি। পরিয়ে কৌপনি ধ্বজা, মজা উড়াল ফকিরী’।

মোহসীনা লাইজু : লালনের গান নিয়ে এই যে ফিউশন হচ্ছে, এটাকে আপনি কীভাবে দেখেন?

ফরিদা পারভীন : আসলে  কনফিউশন তৈরি করছে (হাহাহা)। আমি আর গাজী আবদুল হাকিম (একুশে পদকপ্রাপ্ত বংশীবাদক ও ফরিদা পারভীনের জীবনসঙ্গী) কণ্ঠ আর বাঁশি দিয়ে যে ধরনের ফিউশন করি সেটি একবার শুনে দেখুন তো কোনো কনফিউশন মনে হয় কি না। লালনের কিছু গান এত রাগাশ্রয়ী, যে গানগুলো আমরা যখন একসঙ্গে করি তখন কিন্তু একটা দ্যুতি সৃষ্টি করে। তা শুনে মানুষ আবেগাপ্লুত হয়, সুরে মুহ্যমান হয়। একেই বলে ফিউশন। এখন আপনি মাথায় গামছা বেঁধে কৃষককে অপমান করছেন, মানুষের মাথার খুলির আদলে গলায় লকেট পরছেন, এগুলো লালন কিছুই করতেন না। তিনি সাদাপোশাকে সব সময় থাকতেন। কারণ তিনি ইহজীবনেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে চেয়েছেন। সাদা কাপড়েই তো মৃত দেহটা ঢাকা হয়, মুসলমানদের হজেও সাদা কাপড়টাই পরা হয়। তিনি মানবতার কথা বলেছেন, সমাজের কথা বলেছেন, সমাজ সংস্কারের কথা বলেছেন।

মাসিদ রণ : ফিউশনের কথা বাদই দিলাম। লালনের গানের আধুনিক যন্ত্রাণুষঙ্গ কিংবা আধুনিক প্রোডাকশন ডিজাইন করাতে আপনার কোনো আপত্তি আছে?

ফরিদা পারভীন : প্রোডাকশন আপনি যেভাবেই ডিজাইন করেন, আধুনিক যন্ত্র ব্যবহার করেন, কিন্তু এর যে মূল বিষয়টা সেটিকে সঠিকভাবে রাখতে হবে।

তাপস রায়হান : একটি সম্পূরক প্রশ্ন থেকে যায়, যদি সুর অবিকৃত রাখতে চাই তাহলে ঠিক-বেঠিক বুঝবে কীভাবে বর্তমান প্রজন্ম?

ফরিদা পারভীন : উপেন ভট্টাচার্য্যরে ‘বাংলার বাউল’ বইটিতে ৫০৫টি গান সংগৃহীত আছে। তার বাড়ি কুষ্টিয়ার হরিনারায়ণপুরে। আমার গুরুর কাছে তো ১৭০০ গান রয়েছে। এসব গানই সঠিক। কারণ তারা গুরু পরম্পরা থেকেই এসেছেন। আর সুর এবং গায়কির কথা বললে, এক-একটা গলার গায়কি এক-এক রকম। যার ফলে একটু ভিন্নতা আসতে পারে গানে। কিন্তু সুরটা কিন্তু ঠিক থাকতে হবে। আমার গলায় লালনের গান আপনাদের ভালো লাগে, কারণ সুরটা ঠিক রাখার সঙ্গে সঙ্গে পরিশীলিত গলায় গেয়েছি বলে। আমরা সঠিক সুরটা শিখতে পারি গুরু পরম্পরা থেকে। লালন সাঁই নিজেই যখন গেয়েছেন তখন দরিবুল্লাহ শাহ, মনিরুদ্দিন শাহ তার গানগুলোতে ওইভাবেই তুলে তার শিষ্যদের শিখিয়েছেন। আমি যেমন আমার গুরুর কাছ থেকে শিখেছি, তিনি আবার তার গুরুর কাছ থেকে শিখেছেন। শুরুর দিকে অবশ্য কিছু ভুলও ছিল বাণীতে। যেমন আঞ্চলিক ভাষায় হয়তো তারা লিখেছেন জেতের ছেলে, কিন্তু সর্বজনীন বাংলায় জেত বলে তো কিছু নেই, হবে জাতের ছেলে। তাই আমরা এখন জাত গেল, জাত গেল বলে গাই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেই গানের আদি খাতাটা বিশ্বভারতীতে রেখেছেন। 

মাসিদ রণ : ছোটবেলাটা কেমন কেটেছে? সংগীতশিক্ষা কবে থেকে শুরু এ বিষয়গুলো নিয়ে ভক্তদের অনেক আগ্রহ...

ফরিদা পারভীন : আমার বাবা তো চিকিৎসক ছিলেন, বদলির চাকরি ছিল তার। আমার ৫-৬ বছর বয়সে তিনি ছিলেন মাগুরায়। বাড়ির আশপাশে গানের চর্চা ছিল। প্রায়ই হারমোনিয়ামের সুর শুনতে পেতাম। সেই সুরটাই ওই ছোটবেলায় আমার কানে লেগে থাকত। কিন্তু সংকোচে বাবা-মাকে বলতে পারতাম না যে আমাকে একটা হারমোনিয়াম কিনে দাও, আমি গান শিখব। কথাটা ভেতরে ভেতরে রাখতে রাখতে এক দিন কি যেন হলো, দুম করে বাবাকে দাবি নিয়ে বলেই ফেললাম, আমাকে যদি হারমোনিয়াম না এনে দাও তাহলে কিন্তু পড়াশোনাই করব না! তার আগে আমি মঞ্চনাটকে অভিনয় করে গোল্ড মেডেল পেয়েছিলাম। সেই অভিনয় দেখে সবাই বাবাকে বলেছিলেন, এই মেয়ে তো একটা বিস্ময়কর প্রতিভা! এ অনেক বড় শিল্পী হবে। বাবাও গর্ববোধ করেন। অনেক সময় দেখবেন, আপনি মনে মনে একটা জিনিস বিশ্বাস করেন, অন্য কেউও যদি সেই একই কথা বলে তখন আপনি সেই ব্যাপারে আরও কনফিডেন্স হন। আমার বাবার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। তা ছাড়া বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান তো, যে কারণে আমার আবদার খুব গুরুত্বের সঙ্গেই নিলেন। আমাকে একটি হারমোনিয়াম বানিয়ে দিয়েছিলেন। এরপর কমল চক্রবর্তীর কাছে আমার প্রথম সংগীতে হাতেখড়ি। সারগাম দিয়েই শুরু। কারণ, আপনি অক্ষরজ্ঞান না থাকলে বাক্যগঠন করবেন কীভাবে? সেই গুরুর কাছ থেকেই দেখেছি, গুরুর স্বরূপ কেমন হওয়া উচিত। তিনি আমাকে কোলে বসিয়ে হারমোনিয়াম বাজাতে শেখাতেন, আমার চুল বেঁধে দিতেন। আস্তে আস্তে ক্ল্যাসিক্যাল ও নজরুলের গানের চর্চা চালিয়ে যেতে থাকি। ক্ল্যাসিক্যালে আমার গুরু ওস্তাদ ইব্রাহীম খান, ওসমান গণি খান, রবীন্দ্রনাথ রায় ও মোতালিব বিশ্বাস। তারা বাড়িতে এসে তানপুরায় আমাকে রেওয়াজ করাতেন। আর নজরুলের গানের তালিম হয়েছে আবদুল কাদের ও মীর মোজাফফর আলীর কাছে। গান তো চর্চা করার জিনিস, আত্মস্থ করার জিনিস। গুরুর চরণ ধরে থাকলেই প্রকৃত শিল্পী হওয়া যায়। সুর বড্ড অভিমানী, আপনি যদি তাকে ভালোবেসে গ্রহণ না করেন তাহলে সে কিছুদিন হয়তো থাকবে, তারপর চলে যাবেই। এটা একদম পরীক্ষিত। আমি যেটা বিশ্বাস করি, সেটাই বলি। সুরের সঙ্গে ঐশ্বরিক একটি যোগাযোগ রয়েছে। মৃত্যুকে কি আপনি অস্বীকার করতে পারেন? সৃষ্টিকর্তা যাকে দিয়ে যা করাবেন তাকে সেদিকেই ধাবিত হতে হবে।  

মাসিদ রণ : লালনের গানের সুর নাকি বাণী, কোনটা আপনাকে বেশি টানে?

ফরিদা পারভীন : প্রত্যেকটা সমান গুরুত্বপূর্ণ। কোনোটা ছাড়াই একটি গান শতভাগ আবেদন সৃষ্টি করে না।

আপেল মাহমুদ : সেই যে ছোট্ট মেয়েটি একটি হারমোনিয়ামের জন্য বাবার কাছে বায়না ধরেছিল। সেই মেয়েটি আজকে ‘লালনসম্রাজ্ঞী’। এই ডাকটি শুনতে কেমন লাগে?

ফরিদা পারভীন : (স্পষ্ট জবাব) না, এটা শুনতে আমার ভালো লাগে না। যদি আপনি বলেন, ফরিদা পারভীন লালনের প্রতি ভালোবাসায় অবগাহন করেছে, সে কথাটা প্রযোজ্য হয়। সম্রাজ্ঞী, কন্যা, হেনতেন আরে এগুলো তো সব বাংলা ভাষার অপপ্রয়োগ! এখন একজন ভালোবেসে বলছেন, সেই ভালোবাসাকে তো আমি ক্ষুণœ করতে পারি না। এজন্য আমার সামনে এসব নামে ডাকলেও হাসিমুখে মেনে নিই!

মাসিদ রণ : গানের সুর, তাল, লয় গুরুমুখী বিদ্যা। কিন্তু গায়কি একেবারেই স্বকীয়। আপনার এই স্বকীয় গায়কি তৈরি হয়েছে কীভাবে? আজ যদি সেই রহস্য ফাঁস করে দেন।

ফরিদা পারভীন : আমি কুষ্টিয়ায় বড় হওয়ার ফলে লালনের গানের প্রকৃত ঢঙটা আপনাতেই এসেছে। আর ভাষা নিয়ে আমি চর্চা করেছি। পরে বাংলা ভাষা নিয়ে পড়াশোনা করেছি। আমার শিক্ষক বলতেন, তুমি যেহেতু গান করো, ফলে তোমার উচ্চারণ হতে হবে শতভাগ শুদ্ধ। এর বাইরে আমি সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গান খুব শুনতাম।

মাসিদ রণ : লালনের গান এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এতে আপনার অনেক বড় ভূমিকা। এশিয়ার নোবেলখ্যাত ফুকুওয়াকা অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন। সেসব অভিজ্ঞতার কিছু যদি শেয়ার করেন...

ফরিদা পারভীন : একটা অভিজ্ঞতার কথা বলি। সেটি হলো সুইডেনের রানীর গ্রামের বাড়িতে সাংস্কৃতিক দলের প্রতিনিধি হিসেবে গিয়েছিলাম। শাহনাজ রহমতুল্লাহ, ইন্দ্রমোহন রাজবংশীসহ আরও শিল্পী ছিলেন। আমি যখন ‘খাঁচার ভেতর অচিন পাখি’ গেয়ে শেষ করলাম, দেখি রানী কাঁদছেন, আমিও কাঁদছি। পরে তিনি বললেন, ‘তোমার গানের অর্থ আমি বুঝিনি, কিন্তু এই গানে যে গভীর বেদনা রয়েছে সেটি তোমার গায়কির মাধ্যমে আমার অন্তরে এসে লেগেছে। মনে হয়েছে, তোমার মধ্যে ঈশ্বর বাস করছে।’ এ কথা শুনে আমার মনে পড়ে গেল, মোহাম্মদ রাফি একই কথা বলেছিলেন লতা মঙ্গেশকরকে। এ ছাড়া আমি টিমসহ মরক্কোতে গিয়েছি, যেখানে আমি ছাড়া বাংলাদেশের কোনো আর্টিস্ট গান করতে যাননি। আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, ফ্রান্সসহ কত দেশে কত দারুণ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছি। কদিন আগেই বেলজিয়ামের একটি দলের সঙ্গে আমরা আন্তর্জাতিক কোলাবোরেশন করেছি, সেখানকার বিখ্যাত দাদা রেকর্ডিং স্টুডিওতে। ওদের ছয়টি আর আমাদের ছয়টি গান করেছি, অনবদ্য হয়েছে, যা তারা আর্কাইভ করবে। এমন অনেক কাজ হয়েছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। আমি আর গাজী আবদুল হাকিম ওতপ্রোতভাবে এ কাজগুলোর সঙ্গে যুক্ত থেকেছি। লাভোরি থিয়েটারে সব বিদেশি দর্শক, এক রাতের মধ্যে আমাদের সব সিডি বিক্রি হয়ে গেছে।

আর ‘ফুকুওয়াকা’ তো বিশাল ব্যাপার। এই অ্যাওয়ার্ড যখন পেলাম তখন সেখানে আরও বিভিন্ন দেশের প্রখ্যাত শিল্পীরা একই সম্মাননা পান। তাদের সম্মানে প্রতিটি পুরস্কারপ্রাপ্ত দেশের মন্ত্রীরা চলে এসেছেন। কিন্তু আমাদের দেশের অ্যাম্বাসাডরেরও সময় হয়নি, ফার্স্ট সেক্রেটারি না কাকে পাঠিয়েছে। তিনি আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন, তখন আয়োজকরা সাফ জানিয়ে দেন, এত নিম্ন পদের লোকের সঙ্গে তার দেখা করা যাবে না! তখন আমার কী পরিমাণ কষ্ট হয়েছিল ভাবুন! এসব নানা কারণে দেশের প্রতি একই সঙ্গে রাগ হয়, আবার মায়া হয়।

মোহসীনা লাইজু : আপনি যখন লালনের গান শুরু করেন তখন এত জনপ্রিয় ছিল না। এখন তো একটা জাগরণ হয়েছে...

ফরিদা পারভীন : জাগরণও না, কিছ্ইু না। এরমধ্যে একটা দুরভিসন্ধি রয়েছে। কারণ, যেই না ফরিদা পারভীন গেয়ে উঠল, লোকজন একটু নড়েচড়ে বসল। ফকির-ফাকরার গান, এত সুন্দর হলো কীভাবে? এত ভালো লাগছে কী করে? এরপর ড্রয়িংরুমে লালনের গানের একটি সিডি রাখতেও সম্মানিত বোধ করতে শুরু করেন একজন প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ, সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, তাও ফরিদা পারভীনের সিডি। তখন কেউ কেউ ভাবল, এটা তো মানুষের কাছে খুব সমাদৃত হচ্ছে, তাহলে ধরো, এই গানটাই করতে হবে! ফকিররা কখনো ঢাকা পর্যন্তও আসতে পারেননি সাঁইজির গান নিয়ে, তার পেছনেও আমার গুরুর অবদান রয়েছে। তাদের তো বাংলা একাডেমির প্রোগ্রামে আনা হয়, কিন্তু থাকার জায়গাও দেওয়া হয় না। তারা হাইকোর্টের মাজারেই ছিলেন। এখন তারা আমেরিকা পর্যন্ত যাচ্ছেন। এতে আমার অবদানের কথা বলব না, বলব সব অবদান আমার গুরুর। 

আপেল মাহমুদ : তখনকার দিনে মুসলিম পরিবারের মেয়ে হিসেবে গানের চর্চাতে কোনো বাধা আসেনি?

ফরিদা পারভীন : আমার পরিবার শিক্ষিত, ফলে কোনো বাধা পাইনি। তবে মুসলিম পরিবারে গান-বাজনা নিয়ে যে বাধা সেটা তখন ছিল এখন নেই এটা আমি মানি না। ওপরে ওপরে যে অগ্রগতি আমরা দেখি, ভেতরে ভেতরে ওই একই রয়ে গেছে সবটাই।

মাসিদ রণ : ধর্মচিন্তা থেকেই আমাদের প্রিয় শিল্পী প্রয়াত শাহনাজ রহমতুল্লাহ পর্দার আড়ালে চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু আপনি ধর্ম আর গান বরাবরই একসঙ্গে চর্চা করছেন। এ বিষয়ে দর্শনটা কী জানতে পারি?

ফরিদা পারভীন : না না না, ধর্মে তো সে কথা বলছে না। আমি সময়মতো ধর্মকর্ম করব, আর এটা আমার আরেকটি কাজ। এতে অসুবিধার কী আছে?

জমাটি এ আড্ডা শেষ হয় শিল্পীর কালজয়ী গান-‘এই পদ্মা এই মেঘনা’ দিয়ে।