পাসপোর্ট ভিসা টাকা ছাড়াই মালয়েশিয়া পাঠাত চক্রটি

অর্থ ও পাসপোর্ট-ভিসা ছাড়াই সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া পাঠানো হবে। সেখানে পৌঁছানোর পর ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা পরিশোধ করতে হবে। এমন সহজ শর্তে মালয়েশিয়া গিয়ে কর্মসংস্থানের মাধ্যমে উন্নত জীবনের কথা প্রচার করত একটি মানবপাচার চক্র। তাদের টার্গেট ছিল বিভিন্ন এলাকার তরুণ ও যুবক। মিয়ানমার ও বাংলাদেশের সংঘবদ্ধ এই আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্রের ফাঁদে পা দিয়ে মিয়ানমারের কোস্টগার্ড কর্র্তৃক আটক ১৯ যুবক। এছাড়াও নির্যাতনের ফলে মারা যাওয়া আরেক যুবকের লাশ পেয়েছে পরিবার।

চক্রটির তিন সদস্যকে গ্রেপ্তারের পর র‌্যাব বলছে, গ্রেপ্তারকৃত মো. ইসমাইল (৪৫) ২০০১-২০০৫ সাল পর্যন্ত মালয়েশিয়া থাকাকালীন মিয়ানমারের আরাকানের নাগরিক (রোহিঙ্গা) রশিদুল ও জামালের সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠে। এরপর ইসমাইল দেশে ফিরে রশিদুল এবং জামালসহ অন্তত ১২ জনের আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্র গড়ে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তৈরি করেন। এরপর নানাভাবে মালয়েশিয়া পাঠানোর ফাঁদ পেতে মিয়ানমার নিয়ে নির্যাতন করে মুক্তিপণ আদায় করতেন।

গ্রেপ্তার অন্যরা হলেন মো. জসিম (৩৫) ও মো. এলাহী (৫০)। নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীতে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে এই তিন ব্যক্তি এর আগেও মানবপাচারের মামলায় কারাভোগ করেছেন। গতকাল শনিবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে বাহিনীটির মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়।

র‌্যাব জানায়, ১৯ মার্চ আড়াইহাজার এলাকার ১৯ জন তরুণ অবৈধভাবে চক্রের মাধ্যমে মালয়েশিয়া যাওয়ার সময় মিয়ানমারের কোস্টগার্ডের হাতে আটক হয়। এ ঘটনায় তাদের পরিবার আড়াইহাজার ইউএনও কার্যালয়ে গিয়ে স্বজনদের ফিরে পেতে আবেদন করে। এরপর থানায় মামলা করা হয়।

র‌্যাবের মুখপাত্র কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, এই চক্রটি গত ১৯ মার্চ ২২ জনকে নিয়ে একটি ট্রলারে যাত্রা শুরু করে মিয়ানমার উপকূলে পৌঁছালে সেখানকার কোস্টগার্ড ১৯ জনকে গ্রেপ্তার করে। অন্য তিনজনকে চক্রের সদস্য জামাল কৌশলে ছাড়িয়ে তার ক্যাম্পে নিয়ে যান। সেখানে আটকে রেখে মুক্তিপণের জন্য নির্যাতন করেন। তার মধ্যে জহিরুলের পরিবারের কাছে তারা ছয় লাখ টাকা দাবি করেন। তার পরিবার গত ১০ মে চার লাখ ২০ হাজার টাকা দেয় এবং এক লাখ ৮০ হাজার টাকা মালয়েশিয়ায় পৌঁছানোর পর দেওয়ার কথা জানায়।

এরপর জহিরুলকে মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে মিয়ানমার থেকে থাইল্যান্ডের সমুদ্রসীমা হয়ে সিঙ্গাপুরের পাশ দিয়ে মালয়েশিয়ার জোহার বারুতে পাঠায় পাচারকারীরা। নির্যাতনের কারণে সে অসুস্থ হয়ে পড়লে মালয়েশিয়া পুলিশ তাকে হাসপাতালে ভর্তি করে। ২৪ মে সেখানকার হাসপাতালে মারা যান জহিরুল। গত ২৮ মে শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় তার লাশ দেশে আনা হয়।

গ্রেপ্তারদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাতে কমান্ডার মঈন জানান, মালয়েশিয়া পৌঁছানোর পরে জনপ্রতি তিন লাখ ২০ হাজার টাকা করে দিতে হবে জানিয়ে তরুণ ও যুবকদের ফাঁদে ফেলত চক্রটি। এরপর গ্রেপ্তারকৃত জসিম ও এলাহীসহ চক্রের অন্য সদস্যরা তাদের ইসমাইলের কাছে নিয়ে আসতেন। তাদের নারায়ণগঞ্জ থেকে বাসে টেকনাফের মানবপাচার চক্রের আরেক সদস্য আলমের কাছে হস্তান্তর করা হতো।

এরপর আলম সুবিধাজনক সময়ে তাদের ট্রলারে করে মিয়ানমারে জামালের কাছে পাঠিয়ে দিতেন। পরবর্তী সময়ে জামাল তার মিয়ানমারের ক্যাম্পে তাদের আটকে রেখে নির্যাতন করে তা ভিডিও করতেন। পরে সেই ভিডিও আড়াইহাজারের ইসমাইলের মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের পরিবারের কাছে পাঠিয়ে ছয় লাখ টাকা করে মুক্তিপণ দাবি করা হতো। যাদের মুক্তিপণের টাকা পাওয়া যেত, তাদের মিয়ানমার থেকে থাইল্যান্ডের সমুদ্রসীমা হয়ে মালয়েশিয়ায় রশিদুলের কাছে পাঠিয়ে দিতেন তারা।

র‌্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, গ্রেপ্তার ইসমাইল নিজের ও অন্য সদস্যদের অংশের টাকা রেখে অবশিষ্ট টাকা মালয়েশিয়ায় রশিদুলের কাছে মোবাইল ব্যাংকিং ও ব্যাংকের মাধ্যমে পাঠিয়ে দিতেন। পরবর্তী সময়ে রশিদুল ও মিয়ানমারের জামাল মুক্তিপণের টাকা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিতেন। রশিদুল প্রায় ২৫ বছর ধরে মালয়েশিয়ায় অবস্থান করে মানবপাচার চক্র চালাচ্ছেন।

এদিকে মিয়ানমার কোস্টগার্ডের হাতে আটক ১৯ জনকে দেশে ফিরিয়ে আনতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসন।