শক সিনড্রোমে আক্রান্ত হচ্ছে ৭৫ শতাংশ রোগী

দেশে বর্তমানে ৭৫ শতাংশ ডেঙ্গু রোগী ডেন-২ ও ১৮ শতাংশ রোগী ডেন-৩ দ্বারা আক্রান্ত। বাকি ৬ শতাংশ রোগী ডেন-২ ও ডেন-৩ এই দুই ধরনের ডেঙ্গু দ্বারাই আক্রান্ত। সরকারের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন অ্যান্ড রেফারেল সেন্টার ডেঙ্গু রোগীর ২০০ নমুনা পরীক্ষা করে এমন চিত্র পেয়েছে। সেন্টারের ভাইরোলজি বিভাগ গত সপ্তাহে এসব নমুনা পরীক্ষা করে।

রোগতত্ত্ববিদরা জানিয়েছেন, ডেঙ্গুর চারটি ধরন : ডেন-১, ডেন-২, ডেন-৩ এবং ডেন-৪। ডেঙ্গুর একটি ধরনে আক্রান্ত হলে সেই নির্দিষ্ট ধরনের প্রতিরোধক্ষমতা শরীরে গড়ে ওঠে, পরবর্তী সময়ে সেই ধরনটিতে মানুষ আর আক্রান্ত হয় না। তবে অন্য ধরনে মানুষ আক্রান্ত হতে পারে। এভাবে মোট চারবার আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। প্রথমবার আক্রান্ত হওয়ার চেয়ে দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হলে রোগের তীব্রতা ও জটিলতা দুটিই বাড়ে।

এ ব্যাপারে সেন্টারের ভাইরোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মনিরা পারভীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা বেশিরভাগই নমুনায় ডেন-২ ও ডেন-৩ পেয়েছি। কয়েকটা নমুনায় ডেন-২ ও ডেন-৩ দুটোই পেয়েছি। নমুনাগুলোর বেশিরভাগই ডেঙ্গু নেগেটিভ ছিল। এসব রোগীর এনএস১ পরীক্ষায় ডেঙ্গু ধরা পড়েনি।’ এই ভাইরোলজিস্ট বলেন, ‘২০০০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত আমার অভিজ্ঞতা বলে, ডেন-৩ হেমোরেজিক বা রক্তক্ষরণের সঙ্গে সম্পর্কিত। আর ডেন-২ ধরনে বমি ও ডায়রিয়াসহ শারীরিক কিছু ডিজঅর্ডার দেখা দেয়। শক সিনড্রোম হয়।’

এ ব্যাপারে সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শাহেদ আলী জিন্নাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাইরে যেসব রোগীর এনএস১ পরীক্ষা করে ডেঙ্গু নেগেটিভ ও পজিটিভ এসেছে, তাদের নমুনা পরীক্ষা করে এমন ফল পাওয়া গেছে। এখন হয়তো আরও কিছু মিউটেশন থাকলেও থাকতে পারে বা নতুন কোনো মিউটেশন এসেছে কি না, সেটি এ মুহূর্তে বোঝা যাচ্ছে না। যদি আমরা ডেঙ্গু ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্স করতে পারি, তাহলে নতুন কোনো মিউটেশন দেশে আছে কি না, সেগুলো চিহ্নিত করতে পারব।’

সেন্টারের ভাইরোলজি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০০টি নমুনার মধ্যে ১৫১টি নমুনায় সেরোটাইপ-২, ৩৭টি নমুনায় সেরোটাইপ-৩ এবং ১২টি নমুনায় সেরোটাইপ-২ ও ৩ দুটি সেরোটাইপের একত্রে উপস্থিতি পাওয়া গেছে। শিগগিরই ডেঙ্গু সিকোয়েন্সিংয়ের কাজ শুরু হবে।

ডেঙ্গুর এমন ধরনকেই এ বছর ডেঙ্গু পরিস্থিতি জটিল হওয়ার কারণ হিসেবে মনে করছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ভাইরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. সাইফ উলাহ মুন্সী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২০১৬ সাল থেকে ডেঙ্গুর সেরোটাইপের ডেটা লক্ষ করলে দেখা যাবে, ঘুরেফিরে ডেন-২ ও ডেন-৩-এর প্রকোপ বেশি ছিল। এবার যারা ডেন-৩ দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছে, তারা আগামীতে ডেন-৩ দ্বারা হলে পরিস্থিতি খারাপ হয়ে যাবে। এই যে একের পর এক ধরন আসা, এটাই ডেঙ্গু পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার আরেকটা কারণ। ধারাবাহিকভাবে ভিন্ন ভিন্ন সেরোটাইপ আসছে। ২০১৬-১৭ সালে ডেন-৩ পরিমাণ বেশি ছিল। এবারের চিত্র বিপরীত। সে সময় যারা ডেন-৩ দ্বারা আক্রান্ত ছিল, তারা যদি এবার ডেন-২ দ্বারা আক্রান্ত হয়, তাহলে পরিস্থিতি জটিল হবে। ঠিক তেমনি সে সময় যারা ডেন-২ দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে, তারা যদি এবার ডেন-৩ দ্বারা আক্রান্ত হয়, তাহলে তাদের পরিস্থিতিও জটিল হবে।

এর আগে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) জানিয়েছিল, এ বছর ৬২ শতাংশ রোগী ডেঙ্গুর ধরন ডেন-২-এ আক্রান্ত হয়েছে। বাকি ৩৮ শতাংশ আক্রান্ত হয়েছে, অন্য ধরন ডেন-৩-এ।

দেশের ইতিহাসে ২০১৯ সালে সর্বোচ্চ এক লাখের বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিল। তখন ৯০ শতাংশ মানুষ ডেন-৩-এ আক্রান্ত হয়েছিল। ২০২২ সালে নমুনা বিশ্লেষণে প্রাধান্য ছিল ডেন-৩-এর। ৯০ শতাংশ রোগী আক্রান্ত হয়েছিল ডেন-৩-এ। বাকি প্রায় ১০ শতাংশ ছিল ডেন-৪। ২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ডেন-১ ও ডেন-২ বেশি ছিল। প্রায় সাত বছর পর ডেন-২ বেশি দেখা যাচ্ছে।

ডেঙ্গুতে মৃত্যু ৫০০ ছাড়াল : দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় (গতকাল বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) ডেঙ্গুতে আরও ১৩ জন মারা গেছে। এর মধ্য দিয়ে গতকাল বছরের প্রথম মৃত্যু ৫০০ ছাড়িয়ে ৫০৬ জনে পৌঁছাল। তাদের মধ্যে ঢাকায় মারা গেছে ৩৭৪ জন ও ঢাকার বাইরে ১৩২ জন। 

গত ২৪ ঘণ্টায় ২ হাজার ৭০ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর দেশে আক্রান্ত বেড়ে দাঁড়াল ১ লাখ ৬ হাজার ৪২৯ জনে। এ সময় ডেঙ্গুতে মারা গেছে ১৩ জন। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ৫০৬ জনে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ২ হাজার ৭০ জনের মধ্যে ঢাকার বাসিন্দা ৮৫৭ জন ও ঢাকার বাইরের ১ হাজার ২১৩ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ডেঙ্গুতে যে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে তাদের মধ্যে আটজন ঢাকার এবং পাঁচজন ঢাকার বাইরের বাসিন্দা।