রোহিঙ্গা ঢলের অর্ধযুগ

৬ বছরে দেড় লাখ শিশুর জন্ম

নিজ দেশের সেনাবাহিনীর হাতে নির্মমভাবে নির্যাতিত হয়ে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গারা ঢলে ঢলে বাংলাদেশ অনুপ্রবেশ শুরু করে। সেই সময়ে উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন সীমান্ত পেরিয়ে অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করে ৮ লাখের বেশি রোহিঙ্গা। সেই  রোহিঙ্গা ঢলের ৬ বছর পূর্ণ হয়েছে আজ (২৫ আগস্ট)। 

এই ৬ বছরে  ১২ ধরনের অপরাধে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ থানায় ৩ হাজার ২০টি মামলায় ৬ হাজার ৮৩৭ জন রোহিঙ্গারা আসামি হয়েছে। জন্ম নিয়েছে দেখ লাখের বেশি শিশু। ধীরে ধীরে কমেছে বিদেশি সহায়তা। আলোর মুখ দেখেনি প্রত্যাবাসন, স্থানীয় শ্রম বাজার দখলে গেছে রোহিঙ্গাদের।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসন, পুলিশ ও শরণার্থী কমিশনার কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে, নিজেদের সমস্যার উত্তরণ ঘটিয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে চললেও কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে আশ্রিত ১২ লাখ রোহিঙ্গা সরকার ও জাতির জন্য বড় ধরনের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, দুশ্চিন্তা এবং মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রোহিঙ্গা আগমণের গত ৬ বছরে কয়েক দফা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল প্রত্যাবাসনের। কিন্তু মিয়ানমারের তালবাহানা ও রোহিঙ্গাদের নানান শর্ত ও অজুহাতে এ পর্যন্ত প্রত্যাবাসন ব্যর্থ হয়েছে।

অপরদিকে, যত দিন যাচ্ছে ততই ভয়ংকর হয়ে উঠছে রোহিঙ্গারা। জড়িয়ে পড়ছে নানা ধরনের অপরাধে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাদ্য সহায়তা কমে যাওয়ায় সাধারণ রোহিঙ্গারা ইয়াবা, সোনা চোরাচালান, চুরি ছিনতাইসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।

কক্সবাজার জেলা পুলিশের দেওয়া তথ্যমতে, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে ২০২৩ সালের ২১ আগস্ট পর্যন্ত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ১২ ধরনের অপরাধে মোট ৩ হাজার ২০টি মামলা করা হয়েছে। অস্ত্র, মাদক, ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টা,  ফরেনার্স অ্যাক্ট, অপহরণ, বিশেষ ক্ষমতা আইন, পুলিশ এসল্ট, ডাকাতি কিংবা ডাকাতির প্রস্তুতি, হত্যা, মানব পাচারসহ অন্যান্য আইনে হওয়া মামলায় মোট আসামি ৬ হাজার ৮৩৭ জন।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রফিকুল ইসলাম বলেন, রোহিঙ্গারা তুচ্ছ ঘটনায় খুনোখুনি ছাড়াও মাদকের ব্যবসা, অপহরণ ও ধর্ষণের মতো নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। গত ছয় বছরে রোহিঙ্গাদের শীর্ষ নেতা মুহিবুল্লাহসহ ১৩১টি হত্যার মামলা হলেও খুন হয়েছে তার চেয়ে বেশি।

‘শরণার্থী জীবন আর ভালো লাগছে না। বাপ-দাদার কবরস্থান সমেত নিজ দেশে ফিরতে মন চাইছে। যত দ্রুত ফিরতে পারি ততই আমাদের জন্য মঙ্গল।’ গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে উখিয়ার ময়নারঘোনা রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আবদুর রহিম এমন কথা বলেন।

রোহিঙ্গারা ক্যাম্পের বাইরে স্থানীয় শ্রমবাজার দখল করেছে। শ্রমবিক্রিকে অতিরিক্ত আয়ের উৎস হিসেবে বেছে নেওয়ায় স্থানীয় শ্রমিকদের তুলনায় অনেক কম মজুরি নেয় তারা। তাই কাজদাতা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান রোহিঙ্গা শ্রমিকদের ওপর ভরসাও করছে। টেকনাফ স্থলবন্দরে পণ্যখালাসসহ যাবতীয় কাজ করে আসছে স্থানীয়দের পাশাপাশি রোহিঙ্গারাও।

স্থানীয়দের অভিযোগ, রোহিঙ্গাদের কারণে স্থানীয়রা নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে। রোহিঙ্গারা তুচ্ছ ঘটনায় দল বেঁধে বাড়ি ঘেরাও করে স্থানীয়দের মারধর এবং অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করছে। এসব কারণে রোহিঙ্গাদের দ্রুত প্রত্যাবাসন, কক্সবাজারের লোকালয়ে বাস করা রোহিঙ্গাদের শনাক্তকরণ, এনআইডি-জন্মনিবন্ধন-পাসপোর্ট বাতিল করে ক্যাম্পে ফেরত নেওয়ার দাবিতে গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে মানববন্ধন করেছে কক্সবাজারের স্থানীয় জনসাধারণ। কক্সবাজার পৌরসভার সামনে সর্বস্তরের জনসাধারণের ব্যানারে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।

রোহিঙ্গা প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি মাহাবুবুর রহমান বলেন, গেল ৬ বছরে এই রোহিঙ্গাদের হাতে আমাদের অনেক স্বজন প্রাণ হারিয়েছেন, অপহৃত হয়েছেন। এরা আমাদের জন্য বিষফোঁড়া। এদের দ্রুত ফেরত পাঠানো দরকার।

কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (অতিরিক্ত সচিব) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, ৩৩টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রতিবছর প্রায় ৩০ হাজার নতুন শিশু জন্মগ্রহণ করে। যেখানে তাদের জন্য সহযোগিতা বাড়ানো দরকার সেখানে দিনেদিনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কমছে।