মেটাভার্স ফরেন এক্সচেঞ্জ গ্রুপ বা এমটিএফইর বিরুদ্ধে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এ প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টদের পরিচয় ও তাদের আর্থিক লেনদেনের তথ্য সংগ্রহ করছে। তথ্য সংগ্রহের পর পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে প্রাথমিক তদন্ত কার্যক্রম শুরু করবে বলে জানা গেছে।
সিআইডির সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছে, বিভিন্ন মাধ্যম ও পদ্ধতি ব্যবহার করে তারা এমটিএফইর অভিযুক্তদের শনাক্তের চেষ্টা করছে। তাদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর সম্পদ, ব্যাংক লেনদেন ও ওয়ালেটের মাধ্যমে লেনদেনের তথ্য জানার চেষ্টা করা হবে। এখন পর্যন্ত অর্ধশতাধিক ব্যক্তির পরিচয় তাদের হাতে এসেছে, যারা এই এমএলএমটি বিস্তারে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রেখেছেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার সিআইডির মুখপাত্র অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার আজাদ রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এমটিএফই অ্যাপ ব্যবহার করে অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় আমরা কাজ শুরু করেছি। আমাদের ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট এ ঘটনার তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছে। এ ছাড়া সাইবার পুলিশ সেন্টারও কাজ করছে। তবে এখনই এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু বলা যাচ্ছে না।’
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এ ঘটনায় জড়িত দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে। তারা হলেন রাজশাহীর দীপেন্দ্রনাথ সাহা (৪৩) ও নওগাঁর লতিফুল বারি (৪২)। গত বুধবার তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
গতকাল দুপুরে রাজশাহী মহানগর পুলিশের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন রাজশাহী মহানগর পুলিশ কমিশনার বিপ্লব বিজয় তালুকদার। তিনি বলেন, নগরীর রাজপাড়া থানায় ২৩ জুলাই এমটিএফই নিয়ে একটি মামলা হয়। আইনজীবী জহরুল ইসলাম মামলাটি করেন। এরপর পুলিশের তিনটি সংস্থা যৌথভাবে এটি তদন্ত করছিল। এরই সূত্র ধরে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, প্রাথমিকভাবে জেনেছি এ দুজনের মাধ্যমে অনেকেই এখানে বিনিয়োগ করেছে। তবে এখনো কী পরিমাণ টাকা বিনিয়োগ হয়েছে, তা এখনো জানা যায়নি।
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে দীপেন্দ্রনাথ সাহা বাগমারা উপজেলা খালগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়ের হিন্দু ধর্ম বিষয়ের সহকারী শিক্ষক। তিনি এমটিএফইর রাজশাহী অঞ্চলের কর্মকর্তা বলে জানতে পেরেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বিভিন্ন সভা-সেমিনারের মাধ্যমে তিনি লোকজনকে এমটিএফই সম্পর্কে ধারণা দিতেন এবং তাদের প্রভাবিত করতেন। লতিফুল বারি তার সহযোগী হিসেবে কাজ করতেন।
সিআইডির কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, এমটিএফইর প্রতারণার ঘটনায় হাতিয়ে নেওয়া টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। তারা বলছেন, এটি একটি পরিকল্পিত আর্থিক প্রতারণা। অত্যন্ত কৌশলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষের টাকা হাতিয়েছে তারা। এ কাজটি তাদের নির্ধারিত এজেন্টদের মাধ্যমে করেছে। তারা তাদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে অবৈধ ই-মানি দেখিয়েছে অ্যাপে। অন্যদিকে হাতিয়ে নেওয়া টাকা এজেন্টরা হুন্ডি বা ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তরের মাধ্যমে বিদেশে থাকা চক্রের অন্য সদস্যদের পাঠিয়ে থাকতে পারে।
জানা গেছে, অ্যাপটিতে কেউ ৫০০ ডলার বিনিয়োগ করলে প্রতিদিন যদিও তাকে লাভ দেওয়া হতো প্রায় ১৩ ডলার। তখন বলা হতো, এত অল্প বিনিয়োগ হলে তো আর বড় লাভ আসবে না। বিনিয়োগ যত বেশি, লাভের পরিমাণও তত বেশি দিত অ্যাপটি। বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ানোর জন্য মাঝেমধ্যে লোকসানও দেখানো হতো। এজন্য ৫ হাজার, ১০ হাজার, এমনকি ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগ করেছেন অনেক গ্রাহক।
বিনিয়োগের ওপর সব মিলিয়ে মাসে ৩০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত লাভ পাওয়া যেত। কেউ ৫০১ ডলার বা ৫৮ হাজার টাকা (প্রতি ডলার ১১৬ টাকা ধরে) বিনিয়োগ করলে তার প্রতিদিন লাভ আসত প্রায় ১৩ ডলার বা ১ হাজার ৫০০ টাকা। বিনিয়োগ ৯০১ ডলার বা ১ লাখ ৫ হাজার টাকা হলে প্রতিদিন লাভ পাওয়া যেত প্রায় ৩ হাজার টাকা। কেউ ৫ হাজার ডলার অর্থাৎ ৬ লাখ টাকার মতো বিনিয়োগ করলে প্রতিদিন লাভ আসত প্রায় ৩২ হাজার টাকার সমপরিমাণ। এ লাভ আবার মাঝেমধ্যে দ্বিগুণও দেওয়া হতো। কাউকে দিয়ে বিনিয়োগ করাতে পারলে তাদের লাভের ওপর পাওয়া যেত ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন। এমন করে কারও মাধ্যমে ১০০ গ্রাহক বিনিয়োগ করলে ওই ব্যক্তির পদবি হতো সিইও। কমিশন আর নিজের বিনিয়োগের অর্থ মিলিয়ে কথিত সিইওকে মাসে ১৫-৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করার প্রলোভন দেখানো হতো।