সিডিএ-সিসিসি দ্বন্দ্বে ডুবছে চট্টগ্রাম

চট্টগ্রাম মহানগরীর সাম্প্রতিক জলাবদ্ধতার জন্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (সিডিএ) দায়ী করে গণমাধ্যমে বক্তব্য দিয়েছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (সিসিসি) মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী। প্রতিবাদে সিডিএ চেয়ারম্যান জহিরুল আলম দোভাষ সংবাদ সম্মেলন ডেকে জলাবদ্ধতার জন্য উল্টো সিটি করপোরেশনকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, করপোরেশনের সক্ষমতা ছিল না বলেই সিডিএকে জলাবদ্ধতা নিরসনের মেগা প্রকল্পটি দেওয়া হয়। এর জবাবে মেয়র আরেক দফা সংবাদ সম্মেলন করে তার প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা আছে বলে দাবি করেন।

দুই সংস্থার বাগ্যুদ্ধে বন্যা-জলাবদ্ধতায় নাকানিচুবানি খাওয়া চট্টগ্রামবাসী দারুণ ক্ষুব্ধ। কারণ এ নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে; ক্ষোভ-বিক্ষোভ হয়েছে; লেখালেখি হয়েছে। কিন্তু নগরীর জলাবদ্ধতার সমাধান কোনো কর্তৃপক্ষ দিতে পারেনি। তবু প্রাসঙ্গিক হিসেবে পাঠকদের কাছে বিষয়টি তুলে ধরা হলো।

কার কাজ কে বাগায়

দুই সংস্থার বিরোধের শুরু জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প নেওয়ার সময়। বিধি অনুযায়ী নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনের কাজ সিটি করপোরেশনের। তারাই নালা ও খালের মাটি অপসারণের কাজের পাশাপাশি সংস্কারকাজ করছিল। জলাবদ্ধতার ইস্যুতে চট্টগ্রামের বেশ কয়েকজন মেয়র গদি হারিয়েছেন। মেয়র আ জ ম নাছিরের সময় ২০১৬ সালে নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনের মেগা প্রকল্পের অনুমোদন নিয়ে নেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) তৎকালীন চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম। এ নিয়ে কম বিরোধ হয়নি। ওই সময় ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকার প্রকল্প মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের জন্য সিডিএ সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি করে। ওই প্রকল্পের মেয়াদ দুই দফায় বাড়ানোর পর এ বছরের জুনে শেষ হলেও কাজ হয়েছে ৭৬ শতাংশ। ফলে এখনো পানিতে ডুবছে চট্টগ্রাম।

প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার অ্যান্ড ফ্লাড ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক ড. এ কে এম সাইফুল ইসলাম। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘৭৬ শতাংশ কাজ হওয়ার পরও চট্টগ্রাম নগর যেভাবে ডুবছে, শতভাগ শেষ হলেও কি নগরবাসী জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পাবে? প্রকল্প শতভাগ শেষ হলেও জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি মিলবে না।’

খালেই খেয়েছে সব

১৯৯৫ সালের মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী, চট্টগ্রাম মহানগরীতে ৭০টি খাল ছিল। চট্টগ্রাম ওয়াসা ২০১৬ সালে ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করার সময় ৫৭টি খালের কথা উল্লেখ করে। তার ভিত্তিতেই সিডিএর তৎকালীন চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম জলাবদ্ধতার মেগা প্রকল্পের ডিপিপি অনুমোদন করিয়ে প্রকল্পটি একনেক থেকে পাস করিয়েছিলেন। প্রকল্পে ৩৬টি খালের সংস্কার ও উন্নয়নের কথা বলা হয়। বাকি ২১টি খাল গেল কোথায়?

চট্টগ্রাম মহানগরীর নদী-খাল রক্ষা নিয়ে আন্দোলনকারী পরিবেশকর্মী আলিউর রহমান বলেন, ‘আরএসশিটের ৭০টি খাল উদ্ধার করতে হবে। খালগুলোর কোথাও মার্কেট, কোথাও ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। খালের জায়গা খালকে ফেরত দিতে হবে।’

জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের পরিচালক লে. কর্নেল মোহাম্মদ শাহ্ আলী বলেন, ‘প্রকল্পের কাজ শতভাগ শেষ হলেও জলাবদ্ধতা পুরোপুরি যাবে না। আমরা ৩৬টি খালে কাজ করছি। বাকি খালগুলোর যদি সংস্কার না হয়, তাহলে প্রকল্পে সুফল আসবে না। নগরীর রাস্তার পাশের নালাগুলো যদি পরিষ্কার না থাকে এবং নালা দিয়ে পানি খালে না আসে, তাহলে রাস্তায় পানি থেকেই যাবে।’

কর্নেল শাহ্ আলীর বক্তব্যে প্রমাণ পাওয়া গেছে ৪, ৫ ও ৬ আগস্ট বন্দরনগরী পানিবন্দি থাকার সময়। তখন রাস্তায় পানি জমে ছিল। চাক্তাই খালে পানির প্রবাহ না থাকলেও রাস্তায় পানি ছিল।

একে পুঁজি করে সিডিএ চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমাদের প্রকল্পের কারণে পানি জমছে না। খালে তো পানি নেই। রাস্তা থেকে নালা হয়ে খালে পানি আসছে না। রাস্তা ও নালা সিটি করপোরেশনের আওতায়। জলাবদ্ধতার জন্য সিডিএ দায়ী নয়।’

লে. কর্নেল শাহ্ আলী বলেন,‘জলাবদ্ধতা নিরসনে দুই সংস্থার ৪০টি খালের মুখে রেগুলেটর বা সøুইসগেট বসানোর কথা। সব খালে রেগুলেটর না বসানো পর্যন্ত জোয়ারের পানি ঢুকবে এবং জলাবদ্ধতা যাবে না।’

অপূর্ণ চার প্রকল্প

সিডিএর ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প, সিটি করপোরেশনে ৩২৬ কোটি ৮৪ লাখ ১১ হাজার টাকার খাল খননের প্রকল্প (যথাসময়ে কাজ শুরু করতে না পারায় প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে ১ হাজার ২৫৬ কোটি টাকায় গিয়ে পৌঁছে, এখনো কাজ শেষ হয়নি), সিডিএর চাক্তাই থেকে কালুরঘাট পর্যন্ত ২ হাজার ৩১০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প, যার আওতায় ১২টি খালের মুখে রেগুলেটর বসানোর কথা, পানি উন্নয়ন বোর্ডের ১ হাজার ৬২০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প, যার আওতায় কর্ণফুলীর মোহনা থেকে মদুনাঘাট পর্যন্ত আরও ২৩টি খালের মুখে রেগুলেটর বসানোর কথাÑ এসব প্রকল্পের একটিও পুরোপুরি শেষ হয়নি। 

পাহাড় কাটাও দায়ী : মেয়র 

জলাবদ্ধতার জন্য পাহাড় কাটাকেও দায়ী করেন চট্টগ্রামের মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী। তিনি বলেন, নগরীর পাহাড় কাটার অনুমোদন দিচ্ছে সিডিএ। পাহাড় কাটা মাটি বৃষ্টির পানিতে মিশে নালা ও খাল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

মেয়রের এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে সিডিএ চেয়ারম্যান জহিরুল আলম দোভাষ বলেন, ‘চট্টগ্রামের পাহাড়গুলো বালির পাহাড়। পাহাড় না কেটে ভবন নির্মাণ করা গেলে এ অবস্থার সৃষ্টি হতো না।’ তিনি বলেন, ‘নগরীর পুকুর-দীঘি ভরাট করে মানুষ বাড়ি নির্মাণ করায় জলাধার কমে গেছে। এ কারণেও জলাবদ্ধতা বাড়ছে।’ 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিডিএর একজন পরিকল্পনাবিদ জানান, ‘সিডিএ চেয়ারম্যান আবদুচ ছালামের সময়ের আদেশটি এ নগরকে ধ্বংস করেছে। যেখানে ২০০০ সালের জলাধার সংরক্ষণ আইনে পুকুর ও জলাশয় ভরাট নিষিদ্ধ করা হয়েছে, সেখানে ওই আদেশের বদৌলতে আধা একর (৩০ কাঠা) থেকে ১৫ কাঠা পর্যন্ত পুকুর ও জলাশয়গুলোতে পরিবেশ অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলরের ছাড়পত্র নিয়ে ভবনের অনুমোদন দেওয়া যাবে। ১৫ কাঠার নিচের জলাশয়গুলোতে সিডিএ নিজেই ভবনের নকশার অনুমোদন দিতে পারবে।’

সিসিসির প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম মানিক বলেন, ‘জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ করছে সিডিএ। তারা কাজ শেষ করে আমাদের মুক্তি দিলে জলাবদ্ধতা থেকে আমরা মুক্তি পাই কি না, দেখা যাক।’

সিডিএর প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের একটি খাল খনন প্রকল্প ছিল। এটি বাস্তবায়ন করতে পারলে জলাবদ্ধতা থেকে নগরবাসী কিছুটা হলেও মুক্তি পেত।’

মাঠ-জলাধারের অভাব

বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের (বুয়েট) ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার অ্যান্ড ফ্লাড ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক ড. এ কে এম সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘একটি নগরে কী পরিমাণ খালি জায়গা রাখতে হবে, এর একটি অনুপাত রয়েছে ৩০ : ৭০। সেই অনুযায়ী খালি জায়গা রাখতে হবে। একই সঙ্গে নগরীর নালা ও খাল ভরাট বন্ধের পাশাপাশি সঠিক ড্রেনেজ পরিকল্পনা করতে হবে। পানি ধরে রাখার জন্য পুকুর ও জলাধার রাখতে হবে। পানি পরিবহনের জন্য খালগুলো সক্রিয় রাখতে হবে। সøুইসগেট থাকলে সেগুলোর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা লাগবে।’

কিন্তু সিডিএ কী করেছে? প্রাকৃতিক জলাধারখ্যাত বাকলিয়া এলাকায় কল্পলোক নামে একটি আবাসন প্রকল্প গড়ে তুলেছে। নগরীর চান্দগাঁও ও অক্সিজেন এলাকার জমি ভরাট করে গড়ে তুলেছে অনন্যা আবাসিক এলাকা। আরেকটি বড় প্রাকৃতিক জলাধার বগারবিলেও ভবন নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছে সিডিএ।

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের প্রধান প্রফেসর ড. মোহাম্মদ রাশিদুল হাসান বলেন, ‘চট্টগ্রামে নালা ও খাল ভরাটের হাত থেকে রক্ষা করে স্থানীয়ভাবে পুকুর, দীঘি ও নগরের চারপাশের নিচু জমিকে রক্ষা করতে হবে। এগুলো প্রাকৃতিক জলাধার হিসেবে কাজ করে।’

সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের পুর ও পরিবেশ প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মুশতাক আহমদ বলেন, ‘শোষণ, সংরক্ষণ ও পরিবহন এই তিন ধাপে পানির সঠিক ব্যবস্থাপনা হলে জলাবদ্ধতা হওয়ার কথা নয়। রাস্তা যেভাবে কার্পেটিং হয়, তাতে মাটি পানি শোষণ করতে পারছে না। পুকুর, দীঘি, বিল যদি ভরাট করে ফেলি, তাহলে পানি কোথায় জমা হবে? পানি পরিবহনের জন্য যদি নালা, খাল ও নদী সচল না থাকে তাহলে জলাবদ্ধতা হবেই।’

উন্নয়ন সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতা জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর গবেষণা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা প্রফেসর নজরুল ইসলাম বলেন, ‘সমন্বয় খুব জরুরি। না হলে নগরে জলাবদ্ধতা বাড়বে।’

বুয়েটের ড. এ কে এম সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘নগরগুলো সংস্থাগুলোর সমন্বয়ের অভাবে জলাবদ্ধতা হচ্ছে।’

মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, ‘সমন্বয়ের বিকল্প নেই। সমন্বয়ের মাধ্যমেই নগরীর জলাবদ্ধতার সমস্যা সমাধান করতে হবে। নালা-খালে পলিথিন ফেলা বন্ধ করতে হবে, পাহাড় কাটা বন্ধ করতে হবে।’

সমন্বয়ের উদ্যোগ তার পক্ষ থেকেই সবার আগে নেওয়া হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন সিডিএ চেয়ারম্যান জহিরুল আলম দোভাষ।