জাল নথিতে ৭১ কোটি আত্মসাৎ

জাল বা ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে একটি পণ্যও রপ্তানি না করে কাগজে-কলমে রপ্তানি দেখিয়ে গত ছয় মাসে ব্যাংকিং চ্যানেলে ৫৯ কোটি ৪ লাখ ৩১ হাজার ৮৮৫ টাকা দেশে এনে সাদা করা হয়েছে। এ অর্থ নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রবেশ করেছে, যা পরে উত্তোলন করা হয়েছে। এ রপ্তানির বিপরীতে ১২ কোটি ৮২ লাখ ৭৬ হাজার ১৬৩ টাকা প্রণোদনা হিসেবে নিয়ে আত্মসাৎ করেছে। এ ক্ষেত্রে গত ছয় মাসে ২৩৯টি ভুয়া বিল অব এন্ট্রি দাখিল করা হয়েছে। এভাবে ৭১ কোটি ৮৭ লাখ ৮ হাজার ৪৮ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। অবৈধ এ লেনদেনে কে বা কারা জড়িত তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। কী উদ্দেশ্যে এ অর্থ দেশে আনা হয়েছে তাও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর থেকে এনবিআর চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে পাঠানো প্রতিবেদন থেকে এসব জানা গেছে। সম্প্রতি এ প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে।

এনবিআরের শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ ফকরুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমদানি-রপ্তানি-সংক্রান্ত কার্যক্রম কঠোরভাবে নজরদারি করা হচ্ছে। এরই মধ্যে বেশ কিছু ভুয়া বা জাল কাগজপত্র দিয়ে রপ্তানি করে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দেশে এনে প্রদর্শন করার ঘটনা ধরা পড়েছে। ভুয়া বা জাল কাগজপত্র দিয়ে অর্থ পাচারের ঘটনাও ধরা পড়েছে। একইভাবে প্রণোদনা নিয়ে অর্থ আত্মসাতের ঘটনাও শুল্ক গোয়েন্দারা উদঘাটন করেছে। ভবিষ্যতে আরও গুরুত্ব দিয়ে আমদানি-রপ্তানিতে ভুয়া তথ্য দিয়ে অবৈধ অর্থের লেনদেন বন্ধ করতে কাজ চলছে। আশা করি, এ অপকর্ম কমানো সম্ভব হবে। এ অপকর্মের সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা হবে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, নির্বাচনের আগে দেশে অবৈধ অর্থের লেনদেন বাড়ে। এ কাজে বিদেশ থেকেও অর্থ আসার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বিদেশ থেকে দুভাবে অর্থ আসতে পারে। এক হুন্ডিতে। অন্যভাবে জাল কাগজপত্রে ব্যাংকিং চ্যানেলে। এনবিআর কঠোর নজরদারি করছে জাল কাগজপত্র দিয়ে ব্যাংকিং চ্যানেলে কোনোভাবেই যেন অবৈধভাবে বিদেশ থেকে অর্থ আনতে না পারে। 

প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, ‘কাগজে-কলমে যেসব পণ্য রপ্তানির কথা বলা হয়েছে তার একটি চালানও বন্দরে প্রবেশ করানো হয়নি। রপ্তানি দেখাতে ভুয়া বিল অব এন্ট্রি, এলসি, ইনভয়েস, প্যাকেটজাত করার তালিকা সবই জাল করা হয়েছে। কাগজে-কলমে দুই প্রতিষ্ঠানের নাম দেখিয়ে এ অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বাস্তবে অস্তিত্বই নেই। শতভাগ রপ্তানি করা প্রতিষ্ঠান হিসেবে এরা কাঁচামাল আমদানি শুল্কমুক্ত (বন্ড) সুুবিধাও নিয়েছে। এ অপকর্ম ধরা পড়ার পর সুবিধা বাতিল করা হয়েছে। নির্দিষ্ট ব্যাংক হিসাবে রপ্তানি মূল্য হিসেবে অর্থ প্রবেশ করেছে। প্রতিষ্ঠানের নামে জমাকৃত অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। অর্থ উত্তোলনকারীদের সন্ধান করা হচ্ছে। তারা ঘটনার কিছুই জানে না এবং বড় অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে তারা এ কাজ করেছে বলে ধারণা করা হয়েছে। এ অপকর্মের মূলহোতাদের চিহ্নিত করতে কাজ চলছে। ব্যাংকের অসাধু কর্মকর্তা ও এনবিআরের অসাধু কর্মকর্তারা এ কাজে জড়িত আছে কি না তাও দেখা হচ্ছে।’

দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সাবেক সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমদানি-রপ্তানিতে জাল, ভুয়া বা মিথ্যা তথ্য কারও একার পক্ষে দেওয়া সম্ভব না। এ কাজে প্রদানকারী ব্যবসায়ী নামধারী অসাধু ব্যক্তিদের শাস্তির আওতায় আনা প্রয়োজন। তবে এ কাজে ব্যাংক ও এনবিআরের অসাধু ব্যক্তিরা জড়িত কি না তাও খতিয়ে দেখে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। 

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘অনেক অসাধু ব্যক্তি দেশে ও বিদেশে ব্যবসা করলেও বিদেশেই অর্থ গচ্ছিত রাখে। দেশে কোনো প্রয়োজন হুন্ডিতে অর্থ আনলে পরে ব্যয়ের সময় তা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন ওঠে। বিশেষভাবে হুন্ডিতে দেশে আনা অর্থ ব্যাংকিং চ্যানেলে ব্যয় করলে তার তথ্য থেকে যায়। এ ক্ষেত্রে ব্যয়ের অর্থ কোনো উৎস থেকে আয় করা হয়েছে, তা নিয়ে সরকারি সংস্থার প্রশ্ন করার সুযোগ থাকে। কিন্তু ধরা না পড়ে ব্যাংকিং চ্যানেলে জাল, ভুয়া বা মিথ্যা তথ্য দিয়ে আমদানি-রপ্তানির মাধ্যমে অর্থ দেশে আনলেও তা ব্যাংকিং চ্যানেলে ব্যয় করা হলে তার উৎস নিয়ে কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ থাকে না।’

দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং জানমালের নিরাপত্তায়, নির্বাচনে নিজের বা নিজের দলের প্রভাব বাড়াতে বা নির্বাচন ঘিরে সন্ত্রাসী কার্যক্রম করতে অবৈধভাবে কোনো ব্যক্তি আমদানি-রপ্তানিতে মিথ্যা তথ্য দিয়ে ব্যাংকিং চ্যানেলে বিদেশ থেকে অর্থ এনে ব্যবহার করছে কি না তা খতিয়ে দেখতে সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে এরই মধ্যে এনবিআর নজরদারি বাড়িয়েছে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর দেশ রূপান্তরকে বলেন, সাধারণ নির্বাচনের আগে দেশে অর্থের অবৈধ লেনদেন বাড়ে। সরকারি সংস্থাগুলো নজরদারি বাড়ালে অবৈধ লেনদেন কমানো সম্ভব। বিশেষভাবে আমদানি-রপ্তানিতে জাল তথ্য দিয়ে লেনদেন কমানো যাবে।