রাজধানীর বনানীর কামাল আতাতুর্ক অ্যাভিনিউয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) জমির ওপর বোরাক রিয়েল এস্টেট লিমিটেড যে বহুতল ভবন নির্মাণ করেছে, সেই ভবনের শেয়ারের অংশ একে অন্যের মধ্যে বুঝে ও দখলে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। উভয়পক্ষের আপসে নিষ্পত্তির ভিত্তিতে ভবনের ১৫ থেকে ২৮ তলার মালিকানা ডিএনসিসির ৪০ শতাংশ এবং বোরাক রিয়েল এস্টেটের ৬০ শতাংশ শেয়ার বণ্টনের বিষয়টি আদালতকে অবহিত করলে তা চূড়ান্ত করে ৩০ দিনের মধ্যে তাদের পাওনা দখল বুঝে নিতে বলেছে আদালত। একই সঙ্গে এ বিষয়ে আগামী এক মাসের মধ্যে আদালতে একটি প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।
এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ও আদালতের নির্দেশে এ সংক্রান্ত ডিএনসিসি এবং রাজউকের প্রতিবেদন পেয়ে শুনানির পর গত মঙ্গলবার বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি খিজির হায়াতের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেয়। আদালত এ বিষয়ে পরবর্তী আদেশের জন্য আগামী ৯ অক্টোবর দিন ঠিক করেছে।
আদালতে বোরাক রিয়েল এস্টেটের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সাবেক বিচারপতি এবিএম আলতাফ হোসেন। সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী মো. আবু তালেব, শেখ মোসফেক কবির, আবুল কাশেম ও এনামুল হক তুহিন। অন্যদিকে ডিএনসিসির পক্ষে ছিলেন আইনজীবী ইমতিয়াজ মইনুল ইসলাম নীলিম। রাজধানী উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষের (রাজউক) পক্ষে ছিলেন আইনজীবী ইমাম হাসান। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. সাইফুদ্দিন খালেদ।
শুনানিতে ডিএনসিসির আইনজীবী ইমতিয়াজ মইনুল ইসলাম বলেন, বোরাক রিয়েল এস্টেটের সঙ্গে এই ভবন নির্মাণ ও শেয়ার বণ্টনের বিষয়ে বোর্ডসভার সিদ্ধান্ত আমরা স্থানীয় সরকার বিভাগকে অবহিত করেছি। সিটি করপোরেশনের জায়গায় ইতিপূর্বে যতগুলো ভবন নির্মিত হয়েছে, কোনোটিতেই ২২ শতাংশের বেশি সিটি কপোরেশন পায়নি। শুধু বোরাক থেকেই সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ ভবনের প্রথমাংশের ৩০ শতাংশ এবং ওপরের ১৫ থেকে ২৮ তলা পর্যন্ত ৪০ শতাংশ চুক্তিবদ্ধ হয়ে ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। ২৫ শতাংশ কমন এরিয়া, যা সিটি করপোরেশনের অংশ; তা বিবেচনায় নিলে আনুপাতিক হারে সিটি করপোরেশনের প্রাপ্য অংশ যথাক্রমে ৫৫ ও ৬৫ শতাংশ।
এ আইনজীবী আদালতকে আরও বলেন, ভবনের কমন স্পেস, দোকানপাটসহ এসব মিলিয়ে গড়ে ৫৫ থেকে ৬৫ শতাংশের মালিকানা সিটি করপোরেশনের। তুলনামূলকভাবে এ চুক্তিতে আমরা সন্তুষ্ট। বিষয়টি স্থানীয় সরকার বিভাগকে অবহিত করা হয়েছে।
অন্যদিকে শুনানিতে বোরাক রিয়েল এস্টেটের আইনজীবী আলতাফ হোসেন বলেন, যেহেতু বিষয়টি একটি সেটেলমেন্টে এসেছে; এখন আপনাদের একটা আদেশ পেলে ২০১৫ সাল থেকে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা, পেন্ডিং বিষয়টির সমাধান হয়ে যাবে।
এ সময় সিটি করপোরেশনের আইনজীবীকে উদ্দেশ্য করে আদালত বলে, তারা (বোরাক রিয়েল এস্টেট) তো দিতে প্রস্তুত; এখন আপনারা একটা চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন করে নিয়ে আসেন। পরে আদালত ৩০ দিনের সময় দিয়ে পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ৯ অক্টোবর দিন ধার্য করে।
আদালতের আদেশের পর ডিএনসিসির আইনজীবী ইমতিয়াজ মইনুল ইসলাম নীলিম বলেন, ‘এখন ডিএনসিসি এ বিষয়ে এগিয়ে যাবে, চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করে যার যার পাওনা বুঝে নেবে। আদালতের নির্ধারিত সময় আগামী এক মাসের মধ্যে তা সম্পন্ন করা হবে।’
আদেশের বিষয়ে বোরাক রিয়েল এস্টেটের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আলতাফ হোসেন বলেন, আপস-নিষ্পত্তির জন্য আদালতের নির্দেশে ডিএনসিসি-বোরাক রিয়েল এস্টেটসহ সংশ্লিষ্টরা বসে ভবনের বর্ধিত অংশ (১৫ থেকে ২৮ তলা) বণ্টনের সিদ্ধান্ত নেয় যে, ৪০ শতাংশ পাবে সিটি করপোরেশন এবং বাকি ৬০ শতাংশ পাবে বোরাক রিয়েল এস্টেট। আগামী ৩০ দিনের মধ্যে এ ব্যাপারে সিটি করপোরেশন চূড়ান্ত চুক্তিপত্র জমা দেবে। একই সঙ্গে তাদের একে অন্যের পাওনা বুঝে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে আদালত; সেটাও সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, আপস-নিষ্পত্তির ভিত্তিতে একটি খসড়া চুক্তিপত্র আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। এখন এটি চূড়ান্ত করে আগামী ৩০ দিনের মধ্যে তা বাস্তবায়ন করার জন্য আদালত নির্দেশ দিয়েছে।
এ আইনজীবী বলেন, আমরা আদালতকে বলেছি যে, এখানে নিয়মের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। যত ধরনের অনুমোদন প্রয়োজন সব অনুমোদন নিয়েই এ ভবন নির্মাণ সম্পন্ন করা হয়। এতে সিটি করপোরেশন লাভবান হয়েছে। সিটি করপোরেশনের নিজস্ব জমিতে ভবন নির্মাণের নকশা অনুমোদনের জন্য সিটি করপোরেশনে সরকার নিযুক্ত অথরাইজড অফিসার আছেন। উনি যথাযথ নিয়ম ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই ভবন নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছেন। সিটি করপোরেশনের মালিকানাধীন অন্যান্য ভবন নির্মাণেও সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী অথরাইজড অফিসার হিসেবে নকশার অনুমোদন দিয়েছেন।
গত ২০ অক্টোবর বহুতল এ ভবনের ১৫ থেকে ২৮ তলার শেয়ার বণ্টনের খসড়া চুক্তিপত্র ও নির্মাণসংক্রান্ত অনুমোদনপত্র দাখিল করতে ডিএনসিসিকে নির্দেশ দিয়েছিল আদালত। এ ছাড়া সিটি করপোরেশনের জমিতে ভবন নির্মাণ করতে রাজউক থেকে অনুমোদন নিতে হবে কি না, এ বিষয়ে রাজউককে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দিয়েছিল আদালত।
এর আগে গত ১২ জুন ভবন নির্মাণ চুক্তিপত্র, প্রচলিত আইন ও ইক্যুইটি অনুযায়ী দুই মাসের মধ্যে সেই ভবনের ডিএনসিসির প্রাপ্য হিস্যা বুঝে নিতে বোরাক রিয়েল এস্টেট ও ডিএনসিসিকে আপস-মীমাংসার নির্দেশ দিয়েছিল হাইকোর্ট। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী গত মঙ্গলবার ডিএনসিসি ও বোরাক রিয়েল এস্টেট তাদের সমঝোতা ও শেয়ার বণ্টনসংক্রান্ত প্রতিবেদন আদালতে তুলে ধরে।