আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি কিংবা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে যোগাযোগ না রেখে নিজেদের মতো রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। তাই বিএনপিসহ সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো ধারাবাহিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে গত শুক্রবার ঢাকাসহ সারা দেশে কালো পতাকা মিছিল করলেও ছিল না জামায়াত। তবে সরকারের পদত্যাগ, নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা ও কারাবন্দি নেতাদের মুক্তির দাবিতে রাজপথে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে দলটি।
জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা সব সময় জনগণের পক্ষে, জনগণের জন্য রাজনীতি করি। বিগত দুটি সংসদ নির্বাচনে জনগণ ভোট দিতে পারেনি। বর্তমান সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচন হলে জনগণ ভোট দিতে পারবে না। তাই আমরা জনগণের ভোটাধিকারসহ সংবিধানস্বীকৃত সব অধিকার আদায়ে রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়ে যাব। আমরা মনে করি জামায়াতে ইসলামীর ১২ থেকে ১৫ শতাংশ ভোট রয়েছে। আমাদের এখন লক্ষ্য, তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে সফল করা। নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে সরকারকে বাধ্য করা। আমরা সে লক্ষ্যেই এগোচ্ছি। সামনে আন্দোলন আরও জোরদার হবে।’
সংগঠন শক্তিশালী হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘২০১৬ সাল থেকে আমরা সমাজকল্যাণ ও সংগঠন গোছানোর কাজ করে আসছি। এই সময়ে কয়েক লাখ কর্মী এবং নেতার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। জ্যেষ্ঠ নেতাদের হারালেও তরুণ নেতৃত্ব তৈরি হয়েছে কয়েক লাখ। তাই আমরা দেখছি আমাদের সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি পেয়েছে। কর্মসূচিতে নেতাকর্মীদের উপস্থিতি যেমন আমাদের মনোবল বৃদ্ধি পেয়েছে তেমনি রাজনীতিতে আলোচনার জন্ম দিতে পেরেছি।’
মূলত আগমী দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে না থাকলেও তাদের দাবি সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না। প্রায় প্রতিদিনই গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতির মাধ্যমে দলের বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের কথা জানিয়ে আসছে দলটি। ইতিপূর্বে জানানো হয়েছে, জামায়াতে ইসলামী বিভিন্ন সংসদীয় আসনে তাদের প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করেছে। তাদের প্রার্থীরা সামাজিক মাধ্যমেও এলাকাভিত্তিক তাদের কার্যক্রম তুলে ধরেছেন। পাশাপাশি ভার্চুয়ালি বিভিন্ন জেলা নেতাদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ রাখছেন। প্রায় প্রতিদিনই তারা বিভিন্ন জেলার সব ইউনিটের নেতাকর্মীদের সঙ্গে ভার্চুয়ালি বৈঠক করছেন।
এদিকে মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে শীর্ষ নেতাদের সাজা, প্রকাশ্য রাজনীতিতে দীর্ঘ অনুপস্থিতি, নিবন্ধন বাতিল এবং সরকারের নানামুখী চাপে থাকার পরেও বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা অবস্থান আছে দলটির। গত প্রায় চার দশকেরও বেশি সময় ধরে দলটি নিজেদের অস্তিত্বের স্বার্থে কখনো বিএনপি অথবা আওয়ামী লীগের সঙ্গে এক ধরনের বোঝাপড়া করে রাজনীতি করে আসছে। সর্বশেষ ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে আদালতের একটি রায়ের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধন বাতিল করেছিল। এরই মধ্যে নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে জামায়াতে ইসলামী।
মহানগর জামায়াতের এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের সাবেক নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মৃত্যুর পর তার জানাজা পড়তে দেওয়া হয়নি। এর প্রতিবাদে আমরা রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে তিনদিনের কর্মসূচি পালন করেছি। সামনের দিনগুলোতে জনগণের দাবি নিয়ে রাজপথে থাকব। আশা করছি সরকার আমাদের রাজপথে কর্মসূচি পালন করতে দেবে।’
দলটির নেতাদের আশা নির্বাচন নিয়ে সব পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হলে এবং সবাই তাতে অংশ নেওয়ার পরিবেশ তৈরি হলে তারাও তাদের নিবন্ধন ফেরত পাবেন আইনি প্রক্রিয়াতেই। তাই এখন দলকে রাজনীতির মাঠে চাঙ্গা ও দৃশ্যমান করাই তাদের মূল লক্ষ্য। আর এর মাধ্যমেই তারা সরকারবিরোধী আন্দোলনে নিজেদের অবস্থানও জোরদার করতে চান। আমরা সবসময়ই বলছি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক বা নির্দলীয় সরকারব্যবস্থা লাগবে। বর্তমান সরকার বিদায় নিলেই জামায়াতের বিরুদ্ধে নেওয়া সব বেআইনি পদক্ষেপের প্রতিকার পাবে।
গত বছরের ১০ ডিসেম্বর বিএনপি রাজধানীর গোলাপবাগে মহাসমাবেশ করে। এর আগে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে ২০ দলীয় জোটের শরিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের ডেকে জোটের বিলুপ্তির কথা জানানো হয়। তবে এটি বিএনপিকে জামায়াত-বিতর্ক থেকে স্বস্তি দেওয়ার কোনো কৌশল কি না তা নিয়ে জোর আলোচনা রয়েছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। এরপর চলতি বছরের ১০ জুন ঢাকায় সমাবেশ করে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় দলটি। বিশেষ করে হঠাৎই কর্তৃপক্ষ সমাবেশের জন্য দলটিকে অনুমতি দেওয়ায় এ নিয়ে নানা ধরনের তর্ক-বিতর্ক শুরু হয় রাজনৈতিক অঙ্গনে। কারণ এর আগে পুলিশ যেমন দলটিকে কোথাও কোনো কর্মসূচি পালন করতে দেয়নি, তেমনি পুলিশের বাধার কারণে এর কর্মী-সমর্থকরাও প্রকাশ্যে কোথাও বৈঠকেরও সুযোগ পাননি। আবার ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাদের অনেকেই বহুবার দলটিকে নিষিদ্ধ করে আইন করার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। সেই দলটি একটি প্রতিনিধিদল যখন সমাবেশের জন্য পুলিশ কমিশনারের অফিসে যান তখনই এ নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়। সঙ্গে সঙ্গে সরকারের কয়েকজন মন্ত্রীর বক্তব্যও মানুষের দৃষ্টি কেড়েছে। ঢাকার সমাবেশের পর সিলেট, চট্টগ্রামসহ কয়েকটি বিভাগে সমাবেশের কর্মসূচি করতে চেয়েছিল জামায়াতে ইসলামী। কিন্তু ‘নাশকতার আশঙ্কা’ দেখিয়ে সমাবেশে সায় দেয়নি স্থানীয় পুলিশ।
তবে দলটির প্রচারের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা মতিউর রহমান আকন্দ সমাবেশের অনুমতি না দেওয়ার বিষয়ে বলেছেন, ‘পুলিশ আমাদের সমাবেশ নিয়ে আশঙ্কায় রয়েছে। তারা নাশকতার কথা বলছে। অথচ গত কয়েকদিন আমরা যে সমাবেশ করেছি, প্রচার করেছি তাতে কিন্তু অপ্রীতিকর কোনো ঘটনা ঘটেনি। তবে অনুমতি নিয়ে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে দেশের সর্বত্রই সমাবেশের কর্মসূচি সফলের চেষ্টা আমাদের থাকবে।
রাজপথে কর্মসূচি নিয়ে নামার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় নির্বাচনকে সামনে রেখে মার্কিন ভিসা নীতি ঘোষণার পর থেকে।
বর্তমান জামায়াতের মুখপাত্র মতিউর রহমান আকন্দ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখন সামনের দিনগুলোতে তারা জনগণের দাবি নিয়ে জনমত সংগঠন করবেন যার মূল উদ্দেশ্যই থাকবে সরকারের বিরুদ্ধে মানুষকে সংগঠিত করা। কারণ আমরা মনে করি সরকারকে বিদায় করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আদায় করতে পারলে আমাদের নিবন্ধন, দল, জোট, নির্বাচনসহ সব কিছু নিয়েই আমরা সিদ্ধান্ত নিতে পারব।’