নাচের একটা জাদু আছে

লুবনা মারিয়াম নামের মানুষটিকে না চিনলে, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অগ্রগমন ও একজন শিল্পীর প্রতিনিয়ত যে ছুটে চলা, তাকে বোঝা যাবে না। তাকে চিনলে এমন একজনকে চেনা হয়ে যায়, যিনি বাংলার সংস্কৃতির গতি-প্রকৃতি গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছেন, জীবনে তা ধারণ করেছেন।  নৃত্যের সুষমা ছড়িয়ে দিয়েছেন দূরবিশ্বেও। ফলে লুবনা মারিয়াম বাংলাদেশের জন্য নিজেই হয়ে উঠেছেন অধ্যয়নের ক্ষেত্র। এই নৃত্যশিল্পী, কোরিওগ্রাফার ও সংগঠক এসেছিলেন দেশ রূপান্তরের শুক্রবারের আড্ডায়। তার সঙ্গে গল্প-কথার মিশেলে আড্ডায় মেতে ওঠেন সহকারী সম্পাদক তাপস রায়হান, হেড অব ইভেন্টস অ্যান্ড ব্র্যান্ডিং শিমুল সালাহ্উদ্দিন, জ্যেষ্ঠ সহ-সম্পাদক আপেল মাহমুদ ও বিনোদন সম্পাদক মাসিদ রণ

শিমুল সালাহ্উদ্দিন : আপনার মা সুলতানা সারওয়াত আরা, যিনি পূর্ববাংলার প্রথম গ্র্যাজুয়েট মুসলমান নারী। বাবা কাজী নুরুজ্জামান বীর মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক সচেতন মানুষ। তাদের কথা দিয়েই শুরু করি...

লুবনা মারিয়াম : আমি সবসময় বলি, সৌভাগ্য নিয়ে জন্মেছি যে, এ রকম বাবা-মা পেয়েছি। মাথা তুলে দাঁড়াতে পারি তাদের জন্য। এত আন্তরিক মানুষ, এত সৎ মানুষ, সত্যি আমরাও তেমন হতে পারিনি। তবে তাদের কাছ থেকে শিক্ষা পেয়েছি ভালো মানুষ হওয়ার। আবার বাবা-মা ছিলেন দুজন দুই মেরুর মানুষ। বাবা ছিলেন ধীরস্থির, কিন্তু ভীষণ দার্শনিক মানসিকতার। আর মা প্রচন্ড চঞ্চল, একজন তৃণমূল কর্মী হিসেবে কাজ করেছেন। ফলে দুজন আমাদের মধ্যে দুই রকম প্রভাব বিস্তার করেছে। বাবা সেই কিশোর বেলা থেকেই বলেছেন- মাও সেতুং পড়, চিন্তা ভাবনার কর। আর মার কথা ছিল- বই পড়, কিন্তু তার চেয়ে বেশি কাজ কর। কাজের মাধ্যমেই শেখ।   

মাসিদ রণ : কেমন ছিল শৈশব?

লুবনা মারিয়াম : বাবা-মা দুজনই কলকাতার মানুষ। আমার নানা চট্টগ্রাম ফটিকছড়ির। কিন্তু তিনি ব্রিটিশ গভর্নমেন্টের জুডিশিয়াল সেক্রেটারি ছিলেন বলে কলকাতাতেই থাকতে হতো। মায়ের জন্ম ও বেড়ে ওঠাও কলকাতাতেই। নানিও কলকাতার মানুষ। আর বাবা ছিলেন নদিয়ার। নানি খুব নামকরা উর্দু লেখিকা ছিলেন। ফলে আমরা বাড়িতে বাংলায় কথা বলতাম না, উর্দুতেই স্বাচ্ছন্দ্য ছিলাম। তবে বাবা-মা দুজনই যেহেতু খুবই রাজনীতি সচেতন মানুষ ছিলেন, তাই রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই তারা আমাদের ভাইবোনদের উর্দু থেকে সরিয়ে বাংলা ভাষায় নিয়ে আসেন। আমি বাংলা বলেছি ৭-৮ বছর বয়সে।

যাই হোক, বাবার মনে একটা দুঃখবোধ কাজ করেছে আজীবন। তিনি তো ইন্ডিয়ান আর্মিতে ছিলেন। ১৪ আগস্ট ১৯৪৭-এ তার পোস্টিং ছিল দেরাদুনে। একদিন মাঝরাতে কমান্ডিং অফিসার এসে বললেন, জামান তোমাকে যেতে হবে। একটা প্লেন যাচ্ছে কাকুলে, সব মুসলমান সোলজারদের নিয়ে। বাবা বললেন, আমি কেন যাব? আমি তো পাঞ্জাবের কাউকে চিনি না! আমার দেশ নদিয়ায়, এখানেই চারশ বছর ধরে বাপ-দাদার ভিটে। কিন্তু অফিসার শুনলেন না। তিনি বলনেন, না তোমাকে যেতেই হবে। তোমার বাড়ি থেকেও টেলিগ্রাম এসেছে। যদি এমন কোনো সুযোগ থাকে তবে তোমাকে যেন সেখানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। বাবার অনেক কষ্ট হয়েছিল, এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে। সবসময় পাঞ্জাবদের সঙ্গে তার বিরোধ লাগত। এমনকি দু-একবার কোর্ট মার্শাল হওয়ার মতো পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত তিনি ইন্ডিয়ান আর্মি থেকে ইস্তফা দিলেন। ঢাকাও তার জন্য ছিল একেবারে নতুন জায়গা। এ কারণে আমাদের কোনো গ্রামের বাড়ি নেই। ঢাকা শহর যখন ঈদের ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে যায়, আমরা তখন ফাঁকা ঢাকায় বসে থাকি। মনে হয়, একটা গ্রামের বাড়ি থাকলে ভালো হতো।     

শিমুল সালাহ্উদ্দিন : জীবনে যে নাচবেনই এটা কবে ঠিক করলেন? নাচের প্রেমে কীভাবে পড়লেন?

লুবনা মারিয়াম : একদমই ঠিক করিনি (হাহাহা)। তার হাসির সঙ্গে আড্ডার পরিবেশ হয়ে ওঠে হাস্যোজ্জ্বল। আমাকে নাচে কেন ভর্তি করা হলো, এই নিয়ে দুবছর টানা মার সঙ্গে তুমুল ঝগড়া হতো। কারণ আমি তো ছোটবেলা থেকেই খুব পড়ুয়া। শুধু মাঝে মাঝে অসুস্থ থাকতাম। ফলে সারাক্ষণ বই নিয়ে ঘরের এক কোণে বসে থাকতাম। ফুপু, চাচা, মামারা বলতেন- লুবনা যদি আসে হাতে যেন বই না দেখি! হাবিবুল্লাহ বাহার চৌধুরীর স্ত্রী আনোয়ারা বাহার চৌধুরী একসময় কলকাতায় শিক্ষকতা করতেন। আমার মায়ের সঙ্গে খুব সখ্য ছিল। আমাকে তার কাছে নিয়ে গেলেন। আমি কারও সঙ্গে মিশি না, খেলাধুলা করি না, এসব বলার পর তার কাছে পরামর্শ চাইলেন। তিনিই মাকে বললেন, আমাকে বাফায় নাচের ক্লাসে ভর্তি করাতে। শুনেই আমি কান্না করি। অথচ আমি এখন অনেক বড় একটা নাচের স্কুল চালাই (হাহাহা)! এ জন্য এখন আমার স্কুলের যে বাচ্চাটা নাচতে চায় না, পেছনের সারিতে দাঁড়িয়ে থাকে আমি তাকে খুব বুঝতে পারি, যে ওইটাই আমি!

একটা মজার ঘটনা আছে। ১৯৬৪-৬৫ সালের কথা। আমি তো কিছুতেই নাচতে চাইতাম না। তখন বাফায় চারুকলা ডিপার্টমেন্টে একজন পোলিশ আর্টিস্ট ছিলেন, নাম সাবলিনস্কি। কী যে ভালো পেইন্টিং করতেন! যত বাচ্চা আমার মতো নাচতে ভালোবাসে না, তাদের এনে উনার স্কাল্পচার বানাত বা ছবি আঁকার ওখানে বসিয়ে দিতেন। উনি আমাকে একদিন জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি নাচের ক্লাসে যাও না কেন?’ বললাম, ‘আমি তো নাচতে পারি না।’ তখন এত সুন্দর একটা কথা তার কাছ থেকে শিখেছি! বললেন- নো, ট্যালেন্ট ১%, আর হার্ডওয়ার্ক ৯৯%। তুমি কেন বলছ, তোমাকে দিয়ে নাচ হবে না? আমি বলছি, তুমি পারবে। ওর সঙ্গে আমার একটা গেম চলত। আমি হয়তো তার সঙ্গে মাটি দিয়ে কাজ করছি, ও বলত ৫%? এ রকম করতে করতে আমার দক্ষতার পার্সেন্টেজ বাড়তে লাগল তার কাছে। অবশেষে তিনি যাওয়ার আগে আমি স্টেজে নাচের পারফরমেন্স করেছিলাম। দেখে এত খুশি হয়েছেন বলার বাইরে! বড় হয়ে তাকে এত খুঁজেছি, কিন্তু পাইনি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন : প্রথম স্টেজ পারফরমেন্সের কথা মনে আছে?

লুবনা মারিয়াম : অবশ্যই। সব মজার কথাগুলো মনে পড়ছে। তখন তো বুলবুল ললিতকলা একাডেমি-বাফার প্রতিষ্ঠাতা বুলবুল চৌধুরী মারা গেছেন। এরপর অজিত সান্যাল এসে কয়েক বছর বাফায় ছিলেন। তিনি একটি ছোট্ট নৃত্য নাটিকা করেছিলেন বাচ্চাদের জন্য। আমি তো নাচতে পারি না, তাই আমাকে দিল ফুলের চরিত্রটি। আর এটা শুনে সব বাচ্চারা চিৎকার করে বলতে লাগল- ও নাচতে পারে না, আর ওই-ই সারাক্ষণ স্টেজে থাকবে (হাহাহা)! দ্যাট ওয়াজ এ লাইফ চেঞ্জিং এক্সপেরিয়েন্স। মঞ্চের একটা জাদু আছে। যে বাচ্চাটা জীবনের প্রথম স্টেজ শোর দিন সকালেও বাবাকে বলছে, আব্বু সবাই আমার দিকে তাকিয়ে থাকবে (আব্বু আমাকে বুদ্ধি শিখিয়ে দিলেন, মানুষ তোমার দিকে তাকিয়ে থাকুক, অসুবিধা নেই। তুমি চোখ বন্ধ করে থাকবে তাহলে কে তাকিয়ে আছে তুমি তার কিছুই দেখতে পাবে না (হাহাহা)। কিন্তু স্টেজে যখন ফুট লাইট জ্বলে তখন কিন্তু অডিয়েন্স দেখা যায় না। তাই আমাকে আর চোখ বন্ধ করে থাকতে হলো না। সেই আমি একদিনেই স্টেজের প্রেমে পড়ে গেলাম! বাবা-মা পারফরমেন্স দেখে রাতে বললেন, এই তুই তো ভালোই করলি! এই যে প্রশংসা, এটাও আমাকে আরও অনুপ্রাণিত করেছিল নাচে মনোযোগী হতে। অনেকে মনে করেন, কেউ পরিপূর্ণভাবে নাচ না শিখলে তাকে স্টেজে তোলা ঠিক না। কিন্তু আমি তা করি না। আমার স্কুলের কোনো বাচ্চা একটু নাচ শিখলেই আমি তাকে মঞ্চে তুলে দিই। আমি জানি, মঞ্চের জাদু তাদের মধ্যে কতটা কাজ করবে। তারা আর নাচ থেকে দূরে থাকতে চাইবে না।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন : আপনার পড়াশোনা কোথায় কোথায়?

লুবনা মারিয়াম : বাবার চাকরিসূত্রেই আমার প্রথম স্কুল রাওয়ালপিন্ডিতে সেন্ট হেলেনস ইংলিশ মিডিয়াম। ঢাকা এসে হলিক্রস স্কুলে ভর্তি হই। কলেজও সেখানেই। এরপর উচ্চতর পড়াশোনা করতে আবার ভারতে চলে যাই। আমার বিষয় ছিল সংস্কৃত।

তাপস রায়হান : ‘মুক্তির গান’ প্রামাণ্য চলচ্চিত্রে আপনাকে দেখা যায়। একাত্তরের উত্তাল সময়ের কিছু স্মৃতিচারণ শুনতে চাই...?

প্রশ্ন শুনেই শিল্পীর চোখ ছলছল। স্বাভাবিক হয়ে বলতে শুরু করেন...

লুবনা মারিয়াম : আমি একটা গবেষণা করেছি। স্মৃতি সরলরেখায় চলে না যে একটির পর একটি ঘটনা মনে পড়তে থাকবে। স্মৃতির কিছু লেয়ার আছে। কিছু স্মৃতি কখনো পুরনো হয় না। তেমনি ‘একাত্তর’ আমার কাছে গতকালকের ঘটনা মনে হয়। তবে মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা বলার আগে একটু আগে থেকে বলতে হয়। বাবা যেহেতু সবসময় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন, ফলে আমরা ঢাকায় আসার পর থেকেই বাড়িতে দেশের অনেক বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিক, কবি-সাহিত্যিক আসতেন। হক চাচা, তোহা চাচা, বদরুদ্দিন ওমরসহ অনেকে। দেশের উত্তাল সময়ে একটা গোপন দরজা দিয়ে তারা ঢুকতেন। ফলে আমরা মুক্তিযুদ্ধে যাব এটাই খুব স্বাভাবিক ছিল। তা ছাড়া আমরা তো রাজপথেই মানুষ হয়েছি।

বুলবুল ললিতকলা একাডেমির ছাত্রী তখন আমি, সারাক্ষণ প্রতিবাদের মুখে পড়তে হয়। আমরাও সারাক্ষণ রাজপথে। বিশেষ করে ২১-এ ফেব্রুয়ারিতে খালি পায় হেঁটে ওয়াইজঘাট থেকে আজিমপুর কবরস্থানে যাচ্ছি, সেখান থেকে শহীদ মিনার যাচ্ছি। এ জন্য আমাদের জন্য রাজনীতিতে জড়ানো কোনো ব্যাপারই ছিল না।

একসময় আব্বু চলে গেলেন মুক্তিযুদ্ধে। আর আমরা পুরো পরিবার চাচার শ^শুরবাড়ি টাঙ্গাইলে চলে গেলাম গা-ঢাকা দিতে। দেড় মাসের মাথায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে মুক্তিবাহিনীর সদস্য হিসেবে আব্বুর নাম ঘোষণা করা হলো। তখন তো আর আমাদের সেখানে থাকা সম্ভব হলো না। আরও গ্রামের দিকে চলে গেলাম। আমার ভাইকে আবার তখন বাবা করাচি পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু সেখান থেকে ঝগড়াঝাটি করে ফিরে আগরতলায় চলে যায়। জুন-জুলাইয়ে আব্বু আমাদের ভারতে যাওয়ার জন্য শিল্পী ওয়াহিদুল হককে পাঠালেন। এত মাস পর সেই প্রথম আব্বুকে দেখলাম। আগরতলায় গিয়ে শুনলাম যারা অফিসার র‌্যাঙ্কের, তাদের পরিবারদের জন্য একটু ভালো ব্যবস্থা করা হয়েছে কল্যাণীতে। আর অন্যদের জন্য তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই। যদিও বাবা এটার একদমই পক্ষপাত ছিলেন না। তিনি নিজের খাবারদাবার টাকাপয়সাও জুনিয়রদের দিয়ে দিতেন। যাই হোক, কলকাতায় তো মায়ের অনেক আত্মীয়। মায়ের মামি গৌরী আইয়ুবের সঙ্গে আবার মৈত্রী মাসির ভীষণ বন্ধুত্ব ছিল।

ততদিনে ওয়াহিদ ভাই আর সনজিদা আপা মুক্তিসংগ্রামী শিল্পী সংস্থা গড়ে তুলেছেন। তারা খবর পেলেন, নায়লা কল্যাণীতে থাকছে। গৌরী নানিকে দিয়ে খবর পাঠাল তাকে। সে নিয়মিত বাসে করে কলকাতা গিয়ে গান করে আবার কল্যাণীতে ফিরে আসত। আর আমি আর মা সারাক্ষণ কল্যাণীতে উদ্বাস্তু শিবিরে কাজ করতাম। ভ্যাকসিন দেওয়া, ছোট বাচ্চাদের পড়াশোনা করানোসহ অনেক ধরনের কাজ করতাম। বাবা সেপ্টেম্বরে ৭ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার হলেন। ফলে আমরাও মায়ের সঙ্গে এক ট্রাক ওষুধপথ্য নিয়ে মালদাতে চলে গেলাম ৭ নম্বর সেক্টরের কাছে। সেখানেই দেখা হয়, একটা বীরপুরুষের সঙ্গে। ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর। বরিশালের ছেলে, অফিসার র‌্যাঙ্কে ছিলেন। কিন্তু কোনো দিন অফিসারদের সঙ্গে মিশতেন না। আমার ছোট ভাই নাদিমরা তো বাঙ্কারে থাকতেন। ওই বাঙ্কারের ছেলেদের সব খাবার টাকাপয়সা দিয়ে দিতেন জাহাঙ্গীর ভাই। (বলতে বলতে লুবনার চোখে পানির ধারা গড়িয়ে পড়ে। কাঁপা কাঁপা গলায় পুনরায় বলতে লাগলেন) তিনি শহীদ হলেন, বীরশ্রেষ্ঠর খেতাব পেলেন। আসলে আমি এদিক দিয়েও সৌভাগ্যবান। জীবনে এত এত গুণী মানুষের সান্নিধ্যে আসার সুযোগ পেয়েছি। আমি এদের কাছে ঋণী। তাই তো বলি, আমার জীবনটা দিয়েই ঋণ শোধ করছি।   

শিমুল সালাহ্উদ্দিন : ওয়ার্ল্ড ড্যান্সে বাংলাদেশের নৃত্যের বড় অ্যাম্বাসাডর আপনি। ওয়েস্টার্ন আর ফিউশন নাচের দাপটেও ধ্রুপদি নৃত্যের প্রতি যে অভিনিবেশ তা কখনো ছাড়েননি। আপনার নৃত্যভাবনা জানতে চাই?

লুবনা মারিয়াম : এখানেও একটা মজার বিষয় আছে। মুক্তিযুদ্ধের আগে তো আমরা ভারতে যেতেই পারতাম না। সেখানে কী কী হচ্ছে কিছুই জানতেও পারতাম না। তখন বাংলাদেশের ফোক নাচটাই করতাম বাফায়। হিন্দুস্তানি ক্ল্যাসিক্যাল নাচ শিখিওনি, পারতামও না। এ নিয়ে দুঃখ ছিল। এরপর তো দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ইন্ডিয়ান হাইকমিশন থেকে প্রতিবছর, নানা ধরনের বৃত্তির মাধ্যমে দেশের ছেলেমেয়েদের বৃত্তির ব্যবস্থা করা হলো। তারা সেখান থেকে পড়াশোনা করে এসে দেশে ধ্রুপদি নাচ চর্চা শুরু করল। আমি অবশ্য তখন ইন্ডিয়া থেকে বড় গুরুদের ঢাকায় এনে নানা ধরনের কর্মশালা, প্রোডাকশন, কোরিওগ্রাফিমূলক কাজ করেছি আমার নাচের স্কুল সাধনার ব্যানারে। যাতে পরবর্তী প্রজন্ম ধ্রুপদি নাচগুলো মিস না করে। কিন্তু বহু বছর পর উপলব্ধি করলাম, আমাদের কাছে নাচটা শুধুই শিল্পচর্চা ছিল না। নাচ করেছি আন্দোলনের হাতিয়ার হিসেবে। এই যে নিজের ভেতর থেকে কিছু সৃজন করা, সেখান থেকেও নতুন নতুন কোরিওগ্রাফি করা শিখেছি। এই ক্ষমতাটা তো এখনকার অনেক বাচ্চাদের মধ্যে নেই। আমার মনে হয়, এখনকার বাচ্চারা পড়াশোনাটা কম করে। লেখালেখি তো একদমই করে না। আমি সারাক্ষণ অনলাইনে ক্লাস করাচ্ছি, সবাইকে উদ্বুদ্ধ করছি। 

মাসিদ রণ : এখন আপনি বেশি মনোযোগী হয়েছেন বাংলাদেশের ফোক নাচে। সে বিষয়ে কিছু বলুন?

লুবনা মারিয়াম : একসময় মনে হলো  ধ্রুপদি নাচগুলো তো আমাদের দেশের নাচ নয়। আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে আমি সেই নাচগুলো দিয়ে আমার দেশের কোনো পরিচয় তৈরি করতে পারব না। তাই আমি আবার শিকড়ে ফিরে গেলাম। এখন আমি বাংলাদেশের পিওর ফোক নিয়ে কাজ করছি। সারাক্ষণ এ নিয়েই গবেষণা করে যাচ্ছি, যাতে আমাদের নিজেদের সংস্কৃতিতে যে নাচগুলো আছে সেগুলোই যেন সর্বস্তরে ছড়িয়ে দিতে পারি। এ জন্য ‘আইসিএস পিডিয়া’ নামের একটি অনলাইন প্ল্যাটফরম করেছি। যেখানে রেজিস্ট্রেশন করে দেশের যত ধরনের সাংস্কৃতিক চর্চা হয় সেসব সেখানে লিপিবদ্ধ করেছি। এটা একেবারেই দেশের জন্য, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রয়োজনের তাগিদ থেকে ফ্রি অব কস্টে আমরা ‘সাধনা’র পক্ষ থেকে করে বাংলাদেশ সরকারের কালচারাল মিনিস্ট্রিকে দিয়ে দিয়েছি। সাড়ে তিন হাজার গ্রামের মানুষকে এটি ব্যবহারের ট্রেনিং দিয়েছি প্যান্ডামিকের মধ্যে। 

আপেল মাহমুদ : নৃত্যের প্রসারে আমাদের সরকারি-বেসরকারি গণমাধ্যমের ভূমিকাকে আপনি কীভাবে দেখেন?

লুবনা মারিয়াম : অনেক বড় ভূমিকা থাকতে পারে। কিন্তু এখানে টেলিভিশনে যে নাচের অনুষ্ঠান হয়, তাতো আমিই দেখি না। দর্শক না দেখলে দোষ দেব কীভাবে? কারণ দর্শকের হাতে তো এখন অনেক অপশন। ভালো নাচ টিভিতে প্রচার হয় না। এমন কিছু প্রচার করতে হবে, যা দেখতে দর্শক আগ্রহী হবে। নয়তো দর্শক অনলাইনে গিয়ে সার্চ দিয়ে পছন্দের নাচটা ঠিকই অন্য প্ল্যাটফরম থেকে দেখবে। 

আপেল মাহমুদ : শুধু টিভি নয়। এখন তো শিল্পকলাতেও নাচের অনুষ্ঠান কমে গেছে?

লুবনা মারিয়াম : শিল্পকলার কথা নাই বললাম! আসলে এখন আর কে কী করছে, সেটি দেখার সময় আমার নেই। গত পাঁচ বছর আমি খবরের কাগজ পড়ি না, টিভি নিউজ দেখি না। এতে মন খারাপ হয়। কারণ আমার ৭০ বছর হতে চলেছে। অনেক কাজ এখনো বাকি। তাই যতটা সময় পাই শুধু সেই কাজগুলোই করতে চাই। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কিছু দিয়ে যেতে চাই।

তাপস রায়হান : আপনার কন্যা আনুশেহ জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী। কিন্তু অনেক বছর প্রচারের বাইরে কেন?

লুবনা মারিয়াম : আনুশেহ অত্যন্ত গুণী একজন শিল্পী। আমার মেয়ে বলে বলছি না, বেশি গুণী হলে বোধহয় তারা একটু আলাদা হয়। ও একটা কিছু করলে পরের দিন অনেকেই সেটি নকল করে। আমি তাকে এটা বললে- ও বলে, করুক না! আমি তো নতুন কিছু সৃষ্টি করতে পারব আবার। ওরা তো সেটি পারবে না। তাই করছে সে। এত সুন্দর করে ফ্যাশন হাউজ ‘যাত্রা’ চালাচ্ছে। এখন চেষ্টা করছে, গ্রামে গিয়ে গবেষণা করতে। লক্ষ্মীপুর রাজেন্দ্রপুরে যদি একটি আর্টিস্টিক ভিলেজ করা যায়, সেটি নিয়ে কাজ করছে। এখন হয়তো গান জনসম্মুখে করছে না। কিন্তু আমার বিশ্বাস ও কিছু একটা করে দেখাবে। আসলে ওতো মানুষ হয়েছে নানার কাছে। তাই এত আনকম্প্রোমাইজিং। কোক স্টুডিওতে গান করবেই না। মাল্টিন্যাশনাল কালচারের বিরোধিতার জন্যই এই সিদ্ধান্ত। 

মাসিদ রণ : দেশের নাচের জন্য জীবন উৎসর্গ করলেন। কিন্তু রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাননি এখনো। কোনো আক্ষেপ আছে?

লুবনা মারিয়াম : একুশে পদক, স্বাধীনতা পদকসহ যত রাষ্ট্রীয় পুরস্কার আছে সবই তো রাজনৈতিক পদক। এসব রাজনৈতিক স্বীকৃতির আমার প্রয়োজন নেই। নাচের সেক্টরে পৃথিবীর যেখানে যাবেন, বাংলাদেশের কারও নাম জানতে চাইলে আমার নামটাই তারা বলবে। তবে যারা এ ধরনের পদক পেয়েছেন তাদের আমি সাধুবাদ জানাই।

গ্রন্থনা : মাসিদ রণ

ছবি : আবুল কালাম আজাদ

লোকেশন : গ্রিন লাউঞ্জ