উত্তরের তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, যমুনাসহ বিভিন্ন নদ-নদীর পানি বেড়ে সৃষ্ট বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটছে। এসব নদীর পানি বাড়ায় কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, নীলফামারী, বগুড়া, জামালপুর ও সিরাজগঞ্জে হাজারো বাসিন্দা পানিবন্দি হয়েছে। ধীরে ধীরে পানি কমতে থাকলেও বন্যাকবলিত মানুষের দুর্ভোগ কমেনি বলে গতকাল রবিবার সংশ্লিষ্ট এলাকা সরেজমিনে গিয়ে প্রতিনিধিরা জানান।
কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানান, ব্রহ্মপুত্র নদের অববাহিকায় সদর উপজেলার যাত্রাপুর, উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ, সাহেবের আলগা, চিলমারী উপজেলার নয়ারহাট, চিলমারী ইউনিয়ন ও রৌমারী-রাজিবপুর উপজেলার অর্ধশতাধিক চরাঞ্চল বন্যার পানিতে ডুবে গেছে।
গত এক সপ্তাহের তুলনায় বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও এখনো পানিবন্দি রয়েছে প্রায় ১০ হাজার পরিবার। এসব চরাঞ্চলে কৃষকের বীজতলা, শাকসবজি ও রোপা আমন ধান ডুবে গেছে, নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় গোখাদ্য ও জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল ব্রহ্মপুত্র নদের পানি নুনখাওয়া পয়েন্টে বিপদসীমার ৩২ সেন্টিমিটার, চিলমারী পয়েন্টে বিপদসীমার ১১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রৌমারী উপজেলার প্রায় ২৫টি গ্রামে বন্যার পানি উঠেছে। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ছয় হাজারের বেশি পরিবার।
ধরলা ও ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বৃদ্ধি পেয়ে উলিপুর, সদর উপজেলা ও চিলমারী উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের মানুষের জ্বালানি ও খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। গবাদি পশুর খাদ্য সংকট নিয়ে কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নবেজ উদ্দীন আহমেদ জানান, ৪০টি বিদ্যালয়ের পাঠদান তিন দিন বন্ধ ছিল। পানি কমিয়ে যাওয়ার কারণে আজ থেকে পাঠদান শুরু হয়েছে।
কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক বিপ্লব কুমার মোহন্ত জানান, বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার হেক্টর ফসলের জমি।
গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, করতোয়া নদীর পানি কমতে শুরু করেছে। তবে জেলার তলিয়ে যাওয়া নিম্নাঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ কমেনি। সদর উপজেলার ঘাগোয়া, কামারজানি ইউনিয়নের কিছু অংশে ও সাঘাটা, ফুলছড়ি, সুন্দরগঞ্জ উপজেলার নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চলগুলো এখনো পানিতে ডুবে আছে। এ ছাড়া জেলার চার উপজেলার ১৬৫টি চরের প্রায় ১০ হাজার মানুষ জলমগ্ন।
জেলার অন্তত ১০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্লাবিত হয়েছে। তবে এসব স্কুলে পাঠদান অব্যাহত আছে। ফলে ছাত্রছাত্রীরা ঝুঁকি নিয়ে বিদ্যালয়ে যাওয়া-আসা করছে।
এসব এলাকার নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চলে কৃষকের বীজতলা, শাকসবজি ও রোপা আমন ধানক্ষেত পানির নিচে তলিয়ে আছে। সাঘাটা ও ফুলছড়ি উপজেলার কিছু অঞ্চলে ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তার ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। দফায় দফায় পানি বৃদ্ধির ফলে গোখাদ্য ও জ্বালানি-সংকট দেখা দিয়েছে।
নীলফামারী প্রতিনিধি জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ডের সূত্রমতে, ডালিয়া পয়েন্টে গতকাল সন্ধ্যা ৬টায় তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমার (৫২.১৫) ৬৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। বিকেল ৩টায় পানি বিপদসীমার ৭৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়। তবে বিপদসীমা অতিক্রম করার সম্ভাবনা নেই বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
ডিমলার বিভিন্ন এলাকার একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বানের পানির কারণে এবারের তিস্তা চর এলাকার আমন ধানের ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। সরকারের কাছে চর এলাকার মানুষের জন্য ত্রাণ নয় বাঁধ নির্মাণের দাবি জানান তারা।
জামালপুর সংবাদদাতা জানান, যমুনা নদীর পানি ৯ সেন্টিমিটার কমে বিপদসীমার ২১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আগের চেয়ে পানি কমলেও ইসলামপুর ও দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার ১৭টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়ে ৯ হাজার ৮৩০টি পরিবারের প্রায় ৪৩ হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছে। নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের প্রায় ১১ হাজার হেক্টর জমির রোপা আমন নিমজ্জিত রয়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, এসব এলাকার অনেক রাস্তাঘাট বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। এ ছাড়া ইসলামপুর উপজেলার কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভেতরে বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে।
সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, জেলার কাজিপুর, সদর, বেলকুচি, চৌহালী ও শাহজাদপুরে দুই হাজারের বেশি পরিবারের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। সিরাজগঞ্জ পয়েন্টের পর কাজিপুর পয়েন্টেও বিপদসীমার ওপর দিয়ে যমুনার পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এতে প্লাবিত হয়েছে সিরাজগঞ্জের প্রায় ৪২টি ইউনিয়নের চরাঞ্চল। একই সঙ্গে তলিয়ে গেছে এসব অঞ্চলের আবাদি জমি ও পানিবন্দি হয়ে পড়েছে শত শত পরিবার।
গতকাল সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, যমুনায় পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। বন্যাকবলিত এলাকায় দেখা দিয়েছে শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট।
নদ-নদীর পানি বৃদ্ধির কারণে জেলার কাজিপুর, সদর, বেলকুচি, চৌহালী ও শাহজাদপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। এর ফলে ঘরবাড়ি, কবরস্থান, ফসলি জমিসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নদীতে বিলীন হচ্ছে।
বগুড়া প্রতিনিধি জানান, বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে যমুনার ভাঙন রোধে ৪০ হাজার সিসি ব্লক দিয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহসভাপতি ম. আব্দুর রাজ্জাক। গতকাল বিকেলে সারিয়াকান্দির ভাঙনকবলিত ইছামারা এলাকায় ব্লক ফেলে এ কার্যক্রম উদ্বোধন করেন তিনি।
গত বৃহস্পতিবার থেকে তিন দফা উজানের ঢলে, তীব্র স্রোতে মুহূর্তেই যমুনায় বিলীন হয়েছে তীরবর্তী চল্লিশটি বসতবাড়িসহ অর্ধশত স্থাপনা।