আকিমুনের নতুন দেশ, নতুন যৌবন, প্রথম প্রেম

উপন্যাসের মূল শক্তি কি তার আখ্যানে, তার বক্তব্যে, নাকি তার ভাষাভঙ্গির অভিনবত্বে কোনটি পাঠকের জন্য বেশি উপভোগ্য? নির্দিষ্ট কোনো মাপকাঠি নেই সত্য, কিন্তু তিনটিই যদি পাওয়া যায়, লাভ তো পাঠকেরই। সে লাভের ফসল আমরা ফলতে দেখি আকিমুন রহমানের প্রেমোপাখ্যান ‘একদিন একটি বুনোপ্রেম ফুটেছিলো’তে। একে তো প্রেমের টলটলে গল্পের ফাঁদে ফেলে আমাদের বেঁধে ফেলেন লেখক, তার ওপর তার নিজস্ব ভাষাভঙ্গির জাদুতে দুটি নবীন প্রাণের তীব্র ভাবাবেগে আমাদের জড়িয়ে নিয়ে যান সামনের দিকে। গল্পের প্রধান চরিত্র শিরির মনের মধ্যে প্রতিমুহূর্তে ফুটতে থাকা ফুলের গন্ধ নিয়ে আমরা তখন বুঁদ। গল্পের শুরু ১৯৭২-এ, শেষ ৭৪-এ। নবীন স্বদেশ পাওয়ার আনন্দ তখনো শেষ হয়নি। নবীন আমমুকুলের সঙ্গে নবযৌবনার প্রেমমুকুল কেবল ফুটতে শুরু করেছে। এমনই সময় ‘গল্পটা জন্ম নেয় ফাল্গুন মাসের ভোরসকালবেলা’। সদ্য যৌবনা মেয়ে শিরীন শিরীন চাঁদ সুলতানা। গল্পের প্রধান মুখ। বাবার সাধ, মেয়েকে যেভাবেই হোক পড়াতে হবে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে, নিজে তো আর পড়তে পারেননি সেখানে। প্রথম দর্শনেই প্রেমে পড়ে যায় চতুর্দশী শিরি, সুদর্শন যুবক ফরহাদের সঙ্গে। শিরির  চেয়ে বছর কয়েক বড়, পাশের এলাকার দূরসম্পর্কের এক ভাই সে। ‘সে-ই না রূপে নয়ন দিয়া আমার গৃহে থাকা হলো দায়’ অবস্থা শিরির তখন, ফরহাদেরও ঠিক তা-ই। কয়েকদিন পর ঘটে প্রথম স্পর্শ পাওয়ার সুখস্মৃতি এবং তা নাটকীয়ভাবে। ফরহাদও দিওয়ানা হয়। এরপর নানা মানসিক অভিঘাতে একে অপরের প্রেমের দড়ি শক্ত আঁটুনিতে বাঁধা পড়ে। এরপর গোপন অভিসার, প্রেম এবং প্রেম আর নানা টানাপড়েন, নানা চরিত্রের আগমন।

এদিকে এক কা- ঘটায় ফরহাদ। প্রভাবশালী এক লোকের গাড়ি ছিনতাই করতে গিয়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে সে। জেলে যায়, মুক্তি আর পায় না। মুক্তি পায় না শিরিও। ফরহাদের মুখ না দেখে কীভাবে বাঁচবে সে। সে তো তার জীবনেরও অধিক। কিন্তু সে কোথায়? আসে না কেন সে তাকে উদ্ধার করতে। কী এমন কাজে ব্যস্ত সে। নাকি এতদিন সে ভালোবাসার ছল করেছিল তার সাথে? সবই ছিল তার ভড়ং? ঘৃণায় নিজেকে একসময় প্রচন্ড ধিক্কার দিতে থাকে সে। কী করল সে এটা? বাবার এতদিনের লালিত স্বপ্নকে সে উড়িয়ে দিল এই ন্যাক্কারজনক কাজ করে। বাড়ির পুকুরে গিয়ে ডুবে মরে যাওয়াও তো এর চেয়ে ভালো। সে চেষ্টা একবার করে দেখবে নাকি সে! এদিকে হয় না-হয় না করেও একসময় বিয়ে ঠিক হয়ে যায় শিরির। বড়লোক পাত্র। অনেক ভুগিয়েছে তারা, শেষে কী মনে করে রাজি হয়েছে। কিন্তু একটা ভজঘট পাকিয়ে যায়, সম্বন্ধ ভেস্তে যায়। আর তা হয় ফরহাদের চালে। ফরহাদ তাহলে ফিরে এসেছে! যে শহর বানু তার প্রেমকে খান-খান করে ভেঙে দিয়েছিল, তার যোগসাজোশেই আবার ফরহাদকে ফিরে পাওয়া! জেলমুক্ত হয়েই শিরির দুর্যোগের দিনে ধরা দিয়েছে ফরহাদ। এবার আরো সুকঠিন গোপন অভিসারে যাওয়ার পালা দুজনের। শহর বানুর ছত্রছায়ায় তারই নিরালা বাড়িতে চলে অভিসার, স্কুলে মেট্রিক পরীক্ষার কোচিংয়ে যাওয়ার ছল করে। শিরি আবার প্রাণ পায়। ফরহাদকে একদিন ভুল ভেবেছিল সে। তার প্রিয় ঠিকই তার কথা যে মনে রেখেছিল এদ্দিন! এরই মাঝখানে সুইটি ঢুকে পড়ে দুজনের নিটোল প্রেমের মাঝখানে। এই সুইটি সর্বগ্রাসী, চটপটে, আকর্ষণীয় পুরুষজাগানিয়া। অচিরেই সুইটির আকাক্সক্ষার কাছে বন্দি হয়ে ফরহাদ তাকে বিয়ে করে ফেলে, শিরি তা জানতেই পারে না। সে অপেক্ষা করতেই থাকে। ফরহাদ তো আর আসে না। নিশ্চয়ই ফরহাদ ফিরে আসবে, তাকে আসতেই হবে যে। কিন্তু একসময় খবর পায় ফরহাদ বিয়ে করে ফেলেছে। নিদারুণ অপমানে নিজের প্রতি ঘৃণার মেঘ জমে তার।  নিজেকে ধ্বংস করে দেবে নাকি সে? দারুণ এক বর্ষার দিনে পুকুরে ডুবে মরতে যায় কি য়ায় না, এমন সময় ফরহাদ এসে তাকে টেনে তোলে পুকুর থেকে। সে জানায়, শরীরের লোভে পেয়ে বসেছিল তাকে। সুইটির সাথে দুই কি তিন মাস বিয়ের পর সে বুঝতে পারে বড় ভুল হয়ে গেছে তার। এ জীবনের মধ্যে শিরিকে অনর্থক টেনে আনা মানেই তার জীবনকে শুধু শুধু নষ্ট করা। সে না ভালোবাসে শিরিকে। শিরির কোনো অনিষ্ট চায় না সে। তা হলে কী হবে, অবুঝ শিরি কি আর তাকে ছাড়ে! তার ফরহাদ যে তা কাছে ফিরে এসেছে! ছেড়ে দিলে আবার যদি গায়েব হয়ে যায়! কিন্তু ফরহাদ চায় না শিরির জীবনটা কলুষিত হোক, নিজের পৃথিবী যে তার কলুষে ভরা। আর শিরি না পড়বে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে, বাবার কথা তো তার রাখতেই হবে।

উপন্যাসটির বয়ান নামপুরুষে হলেও লেখকের বয়ানভঙ্গির একটা নিজস্বতা আছে, যা পড়ে আমরা ভিন্ন একটা স্বাদ পাই। কোনো একটি চরিত্রের মানসিক অবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়ে সে-চরিত্রের আবেগের সঙ্গে লেখকের সম্পৃক্তি ঘটে। যেহেতু গল্পের চরিত্ররা আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে, লেখকও তার মধ্যে ঢুকে পড়েন। এবং এভাবে পাঠককেও তার মধ্যে ঢুকিয়ে নেন কৌশলে। এ কারণেই বাংলাসাহিত্যে একটা নিজস্ব ভাষারীতি দাঁড়িয়ে গেছে তার, এবং তা রসসাহিত্য শুরু করার অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই। এ ব্যাপারে একটা কথা না বললেই নয় যে, প্রমিত বাংলার মধ্যে যে-আঞ্চলিক ভাষাকে তিনি তার সাহিত্যে বিশেষ ঢঙে প্রতিনিধিত্ব করেন, তা ‘মান আঞ্চলিক ভাষা’য় করেন বলেই বৃহত্তর পাঠকসমাজে সে ভাষারীতি গ্রহণযোগ্যতা পায় বলেই মনে করি। ঢাকাকে কেন্দ্র করে তার আশপাশের জেলাগুলোর আঞ্চলিক ভাষা ঘেঁটে সর্বজনগ্রাহ্য আঞ্চলিক ভাষার যে মান আমরা দাঁড় করিয়েছি তাকেই বলা যায় ‘মান আঞ্চলিক ভাষা’। একটু নমুনা দেওয়া যাক লেখকের ভাষারীতির। আখ্যানের শেষের দিকে, ৭৪-এর দুর্যোগের অস্থির সময়টাতে, অনিশ্চয়তার দোলাচলে থাকা শিরির সামনে যখন তার প্রেমাস্পদের নাটকীয় আবির্ভাব ঘটে, তখনকার অবস্থা: “তরে ছাড়া যে বাঁচন যাইবো না! তরে ছাড়া যে বাঁচোন যায় না! আমি সেইটা বুঝি নাই শিরি! আমি বুঝি নাই! আমি লোভে পইড়া গেছিলাম! শইল্লের লেইগা লোভ থাকে তো! আমারে সেই লোভে টাইন্না নিছে গা শিরি!’

হিজলতলার মাটিতে এই যে টপটপ কইরা পানি পড়তাছে, এইটা বৃষ্টির পানিই তো? তাই না? শিরির চোখ তো কোনোদিন এত পানি ঝরানোর শক্তি রাখে না! তাই না? একদম রাখে না!”

প্রথমটা স্তবক ফরহাদের, দ্বিতীয়টি ঔপন্যাসিকের।

উপন্যাসটির বর্ণনারীতি, বিশেষ করে আবেগের সুতীব্র ঘনঘটা আর বিভিন্ন জায়গায় ভূরি-ভূরি বিস্ময়সূচক চিহ্ন আমাদের কিছুটা হলেও প্রশ্নমুখী করতে পারে আখ্যানটা কি লেখক আকিমুন রহমানের নিজস্ব জীবনের বয়ান, না পুরোটাই কল্পিত?  

‘একদিন একটি বুনোপ্রেম ফুটেছিলো’ উপন্যাসটিতে লেখক গল্পটাকেই প্রধান্য দিতে চেয়েছেন সত্য; বলতে চেয়েছেন নিটোল প্রেমের কথা, দুই সরল প্রাণের প্রথম প্রণয়ের কথা; ভালোবাসার মধ্যে যে নিষ্কলুষ, নির্দাগ অভিব্যক্তি থাকে, তার কথা; কিন্তু বক্তব্যকে তা ছেড়ে যায়নি বক্তব্য তো লুকিয়ে আছে গল্পের ভেতরকাঠামোতেই। তাকে আর বুদ্ধি দিয়ে বিচার করতে হয় না, খুব সহজেই তা খোলাসা হয়ে পড়ে পাঠশেষে।

লোকশ্রুতির শিরি ফরহাদকে পায় না, আমাদের শিরিও পায় না তাকে। কীভাবে পাবে, সংক্ষুব্ধ মা-মাটি যে নতুনের পথে এগিয়ে যাওয়ার জন্য উন্মুখ। এত সহজ নাকি স্বাধীনতা রক্ষা করা! এত সহজ নাকি তার মধ্যে মানবিক সম্পর্ক ধরে রাখা!

একদিন একটি বুনোপ্রেম ফুটেছিল।। আকিমুন রহমান।। গ্রন্থকুটির।। ৩৬০ টাকা।।