যমুনা নদীতে বন্যার পানি কমতে থাকায় সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার খুকনি, কৈজুরি ও জালালপুরÑ এ ৩টি ইউনিয়নের ১৪টি গ্রামে ভয়াবহ আকারে যমুনা নদীর ভাঙন শুরু হয়েছে। গত ৩ দিনে এসব গ্রামের অন্তত অর্ধশত বাড়িঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।
গ্রামগুলো হলো কৈজুরি ইউনিয়নের পাচিল, মোনাকষা, জালালপুর ইউনিয়নের ভেকা, উথুলি, গুচ্ছগ্রাম, হঠাৎপাড়া, পাকুরতলা, শক্তিধরপুর, বাঐখোলা, জালালপুর, পাড়া মোহনপুর, খুকনি ইউনিয়নের ঘাটাবাড়ি, আরকান্দি ও ব্রাহ্মণগ্রাম। বাড়িঘর হারিয়ে অনেক অসহায় মানুষ মাথা গোঁজার ঠাঁই না পেয়ে ভাঙনকবলিত এলাকায় পলিথিন টানিয়ে ঝুপড়ি তুলে রোদবৃষ্টিতে ভিজে অতিকষ্টে বসবাস করছেন। এসব অসহায় মানুষের কোনো খোঁজ নেননি জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের লোকজন।
এ বিষয়ে পাঁচিল গ্রামের গো-খামারি মুল্লুক চাঁন মন্ডল বলেন, ২০২২ সালের ১৫ জানুয়ারি ব্রাহ্মণগ্রাম থেকে পাঁচিল পর্যন্ত সাড়ে ৬০০ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রায় সাড়ে ৬ কিলোমিটার যমুনা নদীর তীরসংরক্ষণ বাঁধ নির্মাণকাজের উদ্বোধন করা হয়েছে। এ কাজ উদ্বোধনের পর ঠিকাদার কিছু এলাকায় বালুর বস্তা ডাম্পিং করার পর কাজ বন্ধ রাখায় যমুনা নদীর তীব্র ভাঙনে আমাদের বাড়িঘর নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। আমরা অসহায় হয়ে পড়েছি। তিনি বলেন, ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে গরুর খামার ও বাড়িতে দোতলা বিল্ডিং দিয়েছিলাম। যমুনার কড়াল গ্রাসে গরুর খামার ও একটি বিল্ডিংয়ের আংশিক বিলীন হয়ে যাওয়ায় আর্থিকভাবে চরম লোকসানে পড়েছি। অপরদিকে ব্যাংকঋণ পরিশোধের জন্য চাপ দিচ্ছে। ফলে দিশেহারা হয়ে পড়েছি।
এ বিষয়ে আজিদা বেগম, আরশাদ মিয়া ও নূরুজজামান মন্ডল বলেন, যমুনায় বাড়িঘর বিলীন হয়ে যাওয়ায় এবং অন্যত্র মাথা গোঁজার ঠাঁই না পেয়ে ভাঙনকবলিত এলাকায় পলিথিন দিয়ে ঝুপড়ি তুলে পরিবার-পরিজন নিয়ে রোদ-বৃষ্টিতে ভিজে খেয়ে না খেয়ে অতিকষ্টে বসবাস করছি। এখনো পর্যন্ত কোনো জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের লোকজন আমাদের খোঁজখবর নেয়নি। কোনোরূপ ত্রাণ সহায়তা দেয়নি। তারা বলেন, গত ৩দিনে এ গ্রামে অন্তত ২৫টি বাড়িঘর যমুনায় বিলীন হয়ে গেছে।
এ বিষয়ে ওই গ্রামের সিদ্দিক ম-ল, জরিনা খাতুন ও হনুফা বেগম বলেন, শুনেছি বন্যা ও ভাঙনকবলিতদের জন্য সরকার ১০ টন চাল বরাদ্দ দিয়েছে। কিন্তু আমরা যারা প্রকৃত নদীভাঙনে অসহায় তারা এ বরাদ্দের একমুঠ চালও পাইনি। এ চাল কাদের মধ্যে কখন কবে কোথায় বিতরণ করা হয়েছে তা আমরা জানি না।
এ বিষয়ে জালালপুর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য জিয়াউল হক বলেন, সঠিক সময়ে ঠিকাদার কাজ করলে এ বছর মানুষের আর ভাঙনের কবলে পড়তে হতো না। কিন্তু ঠিকাদার সঠিক সময়ে কাজ না করায় বর্ষা মৌসুম শুরুর পর থেকে এ ৩টি ইউনিয়নের ১৪টি গ্রামের প্রায় ৩ শতাধিক বাড়িঘর যমুনা নদীভাঙনের কবলে পড়ে বিলীন হয়েছে। বাড়িঘর হারিয়ে শত শত অসহায় মানুষ যাওয়ার জায়গা না পেয়ে ভাঙন এলাকায় পলিথিন টানিয়ে অতিকষ্টে বাস করছে। তাদের জন্য কোনো বরাদ্দ না দেওয়ায় এদের দিন চলছে অর্ধহারে অনাহারে।
এ বিষয়ে শাহজাদপুর উপজেলার খুকনি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মুল্লুক চাঁন বলেন, গত ২ মাসে অন্তত দেড়শো বাড়িঘর যমুনা নদীতে বিলীন হয়েছে। গত ৩দিনে অন্তত ২০টি বাড়িঘর নতুন করে বিলীন হয়েছে।
শাহজাদপুর উপজেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা রাশিদুল ইসলাম বলেন, এটা স্বাভাবিক ঘটনা। বর্ষা মৌসুমে যমুনায় ভাঙন দেখা দেয়। এতে আমাদের কিছু করার নেই। তিনি আরও বলেন, ভাঙন ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ১০ টন চাল বরাদ্দ পাওয়ার পর ৭ টন চাল ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। বাকি ৩ টন চাল গুদামে মজুদ আছে।
এ বিষয়ে সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, বন্যার পানি কমতে থাকায় শাহজাদপুরের কিছু অংশে ভাঙন দেখা দিয়েছে। ওই সব ভাঙনকবলিত এলাকায় অচিরেই বস্তা ফেলার কাজ শুরু করা হবে। তখন আর এ সমস্যা থাকবে না।