নরসিংদীর পলাশে ঘোড়াশাল সার কারখানায় ‘ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া ফার্টিলাইজার প্রকল্প’টির কাজ প্রায় শেষ। আগামী ১৩ সেপ্টেম্বর জাপানকে পরিশোধ করতে হবে ৫২২ কোটি টাকা। এ ছাড়া জ্বালানি বিভাগের কাছে বিসিআইসির গ্যাস বিল বকেয়া ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা। জাপানের প্রথম কিস্তি পরিশোধ নিয়ে অর্থ বিভাগ ও বিসিআইসির মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়ি চলছে। অর্থ বিভাগ বলছে, টাকা পরিশোধের দায়িত্ব আমাদেরই কিন্তু অর্থ বিভাগের টাকার সংকট। বিসিআইসি বলছে, আমাদের কাছেও কোনো অর্থ নেই, ফান্ড খালি।
গত ১৭ আগস্ট প্রকল্পটির ওপর স্টিয়ারিং কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে এ প্রকল্পের রিপেমেন্টের বিষয়টি আলোচনায় আসে। পিআইসি সভার বিবরণী ইতিমধ্যে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সভায় প্রকল্প পরিচালক রাজিউর রহমান মল্লিক জানান, সাধারণ ঠিকাদার প্রকল্পের সব কার্যক্রম শেষ করে আগামী অক্টোবর মাসের শেষ সপ্তাহে উৎপাদন শুরু করে আগামী ৩১ ডিসেম্বর কারখানাটি বিসিআইসির কাছে হস্তান্তর করবে। ফলে প্রকল্পটি উৎপাদনে যাওয়ার আগেই জাপানি ইয়েন অংশের রিপেমেন্ট প্রথম কিস্তি আগামী ১৩ সেপ্টেম্বর পরিশোধ করতে হবে।
এখন এটাই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে তিনি সভাকে জানান, জাপানি ইয়েন অংশের প্রথম কিস্তি বাবদ আনুমানিক ৫২২ টাকা বিসিআইসি থেকে সংস্থান করা সম্ভব নয়। রিপেমেন্টের প্রয়োজনীয় অর্থ বিভাগের মাধ্যমে পরিশোধের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
এ দাবির পরিপ্রেক্ষিতে অর্থ বিভাগের প্রতিনিধি বলেন, প্রকল্পের সভেরিন গ্যারান্টি যেহেতু সরকার দিয়েছে, তাই সরকারকে রিপেমেন্ট সময়মতো করতে হবে। কিন্তু বর্তমান বাজেটে প্রকল্পটির রিপেমেন্টের ৫০০ কোটি টাকা কোথাও ধরা নেই। বিষয়টি অনুমোদিত হয়ে এলে অন্য কোনো খাত থেকে ব্যবস্থা করে দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিসিআইসি কর্তৃক অন্য কোনো ফান্ড থেকে কিছু অর্থ দেওয়া সম্ভব হলে এবং বাকি টাকা অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া হলে ফান্ড ব্যবস্থা করতে সুবিধা হবে। বিসিআইসিকে ১০০ কোটি টাকা দেওয়ার জন্য তিনি অনুরোধ করেন।
এ সময় শিল্প সচিব জাকিয়া সুলতানা বলেন, যেহেতু সময়মতো প্রকল্পটি শেষ করে উৎপাদনে যেতে পারেনি, তাই কারখানায় উৎপাদিত সার বিক্রির মাধ্যমে লব্ধ এবং ভর্তুকি বাবদপ্রাপ্ত অর্থের মাধ্যমে ঋণের কিস্তির প্রয়োজনীয় অর্থ সময়মতো পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না।
বিসিআইসির ফান্ড থেকে অর্থ দেওয়ার ব্যাপারে শিল্প সচিব বলেন, বিসিআইসির হাতে এখন টাকা নেই। যদি অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ট্রেড গ্যাপের টাকা পরিশোধ করা সম্ভব হয়, তাহলে সেই অর্থ থেকে রিপেমেন্টের অর্থ পরিশোধ করা সম্ভব। তিনি বলেন, ট্রেড গ্যাপের টাকা না পাওয়ার কারণে বিসিআইসির পক্ষে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগকে গ্যাস বিল পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। বর্ধিত গ্যাস বিল বাবদ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা পাবে। গ্যাসের সংকটের কারণে গত বছর বিসিআইসির চারটি কারখানা প্রায় বন্ধ ছিল। যার ফলে বিসিআইসির পক্ষে রিপেমেন্টের প্রয়োজনীয় অর্থ পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক রাজিউর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমি প্রকল্প পরিচালক, এটি পরিশোধের দায়িত্ব বিসিআইসি ম্যানেজমেন্টের। আমি যতটুকু জানি বিসিআইসি ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছে। ১৩ তারিখের মধ্যে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। আশা করি দেওয়া সম্ভব হবে। গ্যাস সংকট প্রসঙ্গে প্রকল্প পরিচালক বলেন, এখন তিতাস আমাদের গ্যাস দিচ্ছে। সংকট আছে, তবুও তারা বিভিন্নভাবে ম্যানেজ করে দিচ্ছে। অক্টোবরে উৎপাদনে গেলে আমরা সার বিক্রির টাকা দিয়েই বকেয়া পরিশোধ করতে পারব।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পের উদ্দেশ্য হচ্ছে নরসিংদীর পলাশ উপজেলায় বিদ্যমান পলাশ ইউরিয়া সার কারখানার জায়গায় দৈনিক ২ হাজার ৮০০ টন অর্থাৎ বার্ষিক ৯ লাখ ২৪ হাজার টন ইউরিয়া সার উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন শক্তি সাশ্রয়ী অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পরিবেশবান্ধব ইউরিয়া সার কারখানা স্থাপন।
সভায় জানানো হয়, চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত প্রকল্পটির ক্রমপঞ্জীভূত বাস্তব অগ্রগতি ৮০ দশমিক ৩৯ শতাংশ, আর্থিক অগ্রগতি ৭১ দশমিক ৬১ শতাংশ এবং এলএসটিকে অংশের বাস্তব অগ্রগতি ৯৪ দশমিক ৩৯ শতাংশ। প্রকল্পের জিওবি অংশের বরাদ্দ ছিল ৪ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা, যার মধ্যে জুলাই, ২০২৩ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৬২২ কোটি টাকা অর্থাৎ আর্থিক অগ্রগতি ৩৬ দশমিক ১৪ শতাংশ। প্রকল্পের জিওবি অংশের মধ্যে পুরাতন ভবনগুলো ভেঙে নতুন বিল্ডিং স্থাপন, নতুন আরএমএস স্থাপন এবং রেললাইন স্থাপনকাজ অনেক পিছিয়ে রয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশন জানিয়েছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে তুলনামূলক কঠিন শর্তে সাপ্লায়ার্স ক্রেডিট হিসেবে জাপান ও চীনের ঠিকাদারদের যৌথ কনসোর্টিয়াম ব্যাংক অব টোকিও-মিতসুবিশি ইউএফজে লিমিটেড (এমইউএফজি) ও দ্য হংকং অ্যান্ড সাংহাই ব্যাংকিং করপোরেশন লিমিটেড (এইচএসবিসি) ৮ হাজার ৬১৭ কোটি টাকার ঋণ সংগ্রহ করে দেয়। কমিটমেন্ট ফি, সার্ভিস চার্জ মিলিয়ে এ ঋণের সুদের হার ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। চার বছরের নির্মাণকালসহ ১৫ বছরে কনসোর্টিয়ামকে ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার ঋণ পরিশোধ করতে হবে।
মন্ত্রণালয়ের প্রজেক্ট স্টিয়ারিং কমিটির সভায় প্রকল্প পরিচালক জানান, ২০২০ সালের মার্চ থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত কাজের অগ্রগতির ভিত্তিতে প্রকল্পের সাধারণ ঠিকাদারকে ৪০টি প্রোগ্রেস পেমেন্ট বাবদ ৬ হাজার ৯২৩ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। বর্তমানে সাধারণ ঠিকাদারের বিভিন্ন পর্যায়ের দেশি-বিদেশি ৩ হাজার ২৭২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত আছেন।
প্রকল্প পরিচালক সভায় জানান, প্রকল্পে নতুন রেগুলেটরি মিটারিং স্টেশন স্থাপনের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ৭১ দশমিক ৯০ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার লক্ষ্যে গত ২৬ জুলাই শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগে চিঠি দেওয়া হয়। সে অনুযায়ী গত ৩১ জুলাই ১৬ টাকা হারে গ্যাস বিল পরিশোধের শর্তে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ থেকে গ্যাস সরবরাহের অনুমোদন পাওয়া গেছে। পরে সেপ্টেম্বর, ২০২৩-এ দৈনিক ১৩০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং পরে অক্টোবর, ২০২৩-এ দৈনিক ১৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দেওয়ার কথা উল্লেখ আছে। সাধারণ ঠিকাদারের চাহিদা মোতাবেক সময়মতো গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব না হলে প্রকল্প বাস্তবায়ন বিলম্বিত হবে, প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি পাবে, সার উৎপাদন বিলম্বিত হবে এবং ঋণের সুদ আরও বাড়বে। সাধারণ ঠিকাদারের চাহিদা মোতাবেক প্রকল্পে নতুন আরএমএস স্থাপনের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ৭১ দশমিক ৯০ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
প্রকল্প পরিচালক বলেন, প্রকল্পের রেললাইন স্থাপনের কাজটি সম্পাদনের লক্ষ্যে বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃক প্রাক্কলিত ২৬৫ কোটি টাকা ইতিমধ্যে পরিশোধ করা হয়েছে। ব্যাটারি লিমিটের অংশটুকুর জন্য বাংলাদেশ রেলওয়ে থেকে ই-জিপি সিস্টেমে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। দরপত্র মূল্যায়ন শেষে অনুমোদন প্রসেসিংয়ে আছে।
প্রকল্পের ব্যাটারি লিমিটের অভ্যন্তরে রেললাইন নির্মাণের সঙ্গে প্রকল্পের অন্যান্য ভৌত কার্যক্রম যেমন রাস্তা নির্মাণ, ড্রেন নির্মাণ, কনভেয়ার বেল্ট কাঠামো নির্মাণ, পাইপ ব্ল্যাক কাঠামো ইত্যাদি কার্যক্রম সম্পর্ক রয়েছে, যা প্রকল্পের সাধারণ ঠিকাদার দ্বারা নির্মাণাধীন। প্রকল্পের ব্যাটারি লিমিটের অভ্যন্তরে রেললাইন স্থাপনের কাজটি দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য সাধারণ ঠিকাদার কর্তৃক বারবার অনুরোধ জানানো হচ্ছে। এ পর্যায়ে যুগ্ম সচিব (পরিকল্পনা), শিল্প মন্ত্রণালয় ব্যাটারি লিমিটের অভ্যন্তরে রেললাইন স্থাপনের কাজটি কবে শেষ হবে জানতে চান। প্রকল্প পরিচালক ব্যাটারি লিমিটের অভ্যন্তরে রেললাইন স্থাপনের কাজটি ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হবে বলে জানিয়েছেন।