সড়ক পথে ঢাকা থেকে নেওয়া হবে জ্বালানি

কড়া নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই রাশিয়া থেকে আমদানিকৃত পারমাণবিক জ্বালানি (ইউরেনিয়াম) সড়ক পথে ঢাকা থেকে নেওয়া হবে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে। ইতিমধ্যে ডামি ফুয়েল (নকল জ্বালানি) দিয়ে পরিবহন, স্থানান্তর ও সংরক্ষণের কাজের মহড়া শেষ হয়েছে। ২৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রথম ইউনিটের প্রথম ব্যাচের পারমাণবিক জ্বালানি (ইউরেনিয়াম) রাশিয়া থেকে বাংলাদেশে এসে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ জ্বালানির উদ্বোধন করবেন। ইউরেনিয়াম পরিবহন ও আমদানির ওই আনুষ্ঠানিকতায় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের ভার্চুয়ালি যোগ দেওয়ারও কথা রয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রমতে এসব তথ্য জানা গেছে।

পরমাণু বিশেষজ্ঞ এবং প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ফ্রেশ ফুয়েল বা অব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি পরিবহন ও সংরক্ষণে বিকিরণজনিত ঝুঁকি নেই। তারপরও আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ জ্বালানি পরিবহনে থাকবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়সহ সেনাবাহিনী, পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা, স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, দমকল বাহিনী, সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের প্রতিনিধিদল।

সূত্রমতে, রাশিয়া থেকে বিশেষ বিমানে সাতটি চালানের মাধ্যমে দেশে আনা হবে পারমাণবিক জ্বালানি। প্রতিটি চালানে ১২টি বান্ডেল থাকবে। এ জ্বালানি দিয়ে এক বছরের বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে। সাতটি চালানোর পর ধাপে ধাপে আসতে থাকবে পারমাণবিক জ্বালানি।

ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জ্বালানি এসে পৌঁছানোর পর তিনটি বিশেষ ট্রাকে করে তা নেওয়া হবে রূপপুর বিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকায়। স্পর্শকাতর এ জ্বালানি পরিবহনে কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।

ইতিমধ্যে রাশিয়া থেকে ডামি ফুয়েল (পারমাণবিক জ্বালানির মতো দেখতে নকল জ্বালানি দন্ড) এনে মহড়া দেওয়া হয়েছে। গত ৮ আগস্ট রাত ৩টার দিকে ঢাকায় বিমানবন্দরের ৮ নম্বর গেট দিয়ে ডামি ফুয়েল পরিবহনের মহড়া দেওয়া হয়। এ সময় সেনাবাহিনী, পুলিশ, দমকল বাহিনী, পরমাণু শক্তি কমিশন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, রাশিয়ার প্রতিনিধিদলসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ২৭টি গাড়িবহর নিয়ে ঢাকা থেকে নিরাপদে রূপপুর প্রকল্প এলাকায় পৌঁছায় ডামি ফুয়েল। এরপর সেখানে ফুয়েল স্থানান্তর, সংরক্ষণ ও অন্যান্য কাজের মহড়া দেওয়া হয়। ইউরেনিয়াম পরিবহন ও সংরক্ষণে যাতে কোনো ধরনের সমস্যা না হয়, সেজন্যই আইন অনুযায়ী আগে থেকে ডামি ফুয়েল দিয়ে এ মহড়া দেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ অ্যাটমিক এনার্জি রেগুলেটরি এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী পারমাণবিক জ্বালানি পরিবহনের ক্ষেত্রে বীমা অথবা আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলা আছে। যেহেতু পারমাণবিক জ্বালানি পরিবহনে ঝুঁকি নেই, তাই দ্বিতীয় অপশনটি বেছে নিয়েছে বাংলাদেশ।

সূত্রমতে, প্রাথমিক পর্যায়েই জ্বালানি পরিবহনে বীমা করা হলে এজন্য প্রতি বছর কিস্তি বাবদ যে অর্থ ব্যয় হবে তাতে বিদ্যুতের দামও বেড়ে যাবে। এসব দিক বিবেচনায় আর্থিক নিশ্চয়তাপত্র ইস্যু করেছে সরকার।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ফ্রেশ পারমাণবিক ফুয়েল দন্ডে এত বেশি সুরক্ষা স্তর থাকে যে স্বাভাবিক অবস্থায় সেখান থেকে রেডিয়েশন ছড়ানোর কোনো সম্ভাবনা নেই। এমনকি ৬০০ থেকে ৭০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রাতেও কিছুই হবে না। এটা এমন যে, কোনো মানুষ দাঁত দিয়ে কামড়ালেও তাতে কোনো সমস্যা নেই। তিনি আরও বলেন, ‘জ্বালানি পরিবহনের সময় বিভিন্ন নিরাপত্তা বাহিনী ও বিশেষজ্ঞরা থাকবেন। এরপরও কাল্পনিকভাবে ধরে নিলাম একটা দুর্ঘটনা ঘটল। এতে বড়জোর এক-দুটো ইউরেনিয়াম দন্ড ভেঙে সামান্য কিছু আর্থিক ক্ষতি হতে পারে। কিন্তু বিকিরণের সম্ভাবনা নেই। এত অল্প সময়ের জন্য সামান্য এ আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কায় বীমা করতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় না করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ।’

প্রত্যাশিত গতিতে এগিয়ে চলছে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মাণকাজ। জ্বালানি আমদানির জন্য সব ধরনের সনদ মিলেছে। ইতিমধ্যে রাশিয়ার সাইবেরিয়ায় প্রথম ব্যাচের জ্বালানি উৎপাদনও শেষ হয়েছে। প্রথম ইউনিটকে প্রস্তুত করে তোলা হয়েছে জ্বালানি লোড করার জন্য।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ইউরেনিয়াম আমদানি এটা দেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় মাইলফলক। পারমাণবিক এ জ্বালানি আমদানি ও সংরক্ষণ সম্পন্ন হলে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক নিউক্লিয়ার ক্লাবে যুক্ত হবে। এ মর্যাদা পাওয়ার পাশাপাশি বিশে^র দরবারে পারমাণবিক শক্তিধর দেশ হিসেবেও পরিচিতি লাভ করবে। সেই সঙ্গে বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে উৎপাদন শুরু করতে আর কোনো বড় ধরনের চ্যালেঞ্জও থাকবে না।

প্রকল্প পরিচালক ও আন্তর্জাতিক পরমাণু বিশেষজ্ঞ ড. মোহাম্মদ শৌকত আকবর দেশ রূপান্তরকে বলেন, আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) নির্দেশনা মেনেই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি আমদানি, পরিবহন ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে। বিশ্বে কোথাও পারমাণবিক জ্বালানি পরিবহনের সময় দুর্ঘটনার রেকর্ড নেই। সুতরাং এ নিয়ে উদ্বেগ, দুশ্চিন্তার কিছু নেই।

প্রকল্প পরিচালক বলেন, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্রের কমিশনিং কাজ শেষে উৎপাদন শুরু করতে পরিকল্পনা মোতাবেক প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। জ্বালানি উৎপাদন এবং এটি হ্যান্ডেলিং করতে প্রয়োজনীয় জনবল তৈরিতে কোনো সমস্যা নেই। সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী দেশের এবং আইএইএর সব ধরনের নিয়মকানুন মেনে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে। কোথাও গ্যাপ নেই।

রূপপুর বিদ্যুৎ প্রকল্পের বিভাগীয় প্রধান (প্রশাসন ও অর্থ) অলোক চক্রবর্তী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ও বিদ্যমান আইন মেনে এ প্রকল্পের যেকোনো ধরনের কাজের ক্ষেত্রে প্রথম থেকেই দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানের সেবাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। সেই ধারাবাহিকতায় রূপপুর প্রকল্পে বীমার জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠান সাধারণ বীমা করপোরেশনকে জানানোর পর ইতিবাচক সাড়া মিলেছে। দেশে এ ধরনের বীমা অতীতে হয়নি। তাই সরকারি বীমা কোম্পানি এটা নিয়ে বিশদভাবে কাজ করছে।’

বর্তমানে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির মূল কমিশনিং পর্যায়ের কাজের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। কমিশনিংয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে পারমাণবিক চুল্লিতে নিরাপদে পারমাণবিক জ্বালানি লোড করা, সুষ্ঠুভাবে নিউক্লিয়ার বিক্রিয়ার মাধ্যমে বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের ‘ফিজিক্যাল স্টার্টআপ’ কার্যক্রম সম্পন্ন, বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে গ্রিড লাইন সিনক্রোনাইজেন বা যুক্ত করা, পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সবশেষে বাণিজ্যিক উৎপাদনের মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছে সরবরাহ করা।

দেশের প্রথম এ পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পটি রাশিয়ার কারিগরি ও আর্থিক সহায়তায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আওতায় পরমাণু শক্তি কমিশন বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পের জেনারেল ডিজাইনার ও কন্ট্রাক্টর রাশিয়ার রোসাটম করপোরেশনের প্রকৌশল শাখা। কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে ২০২৪ সালে এবং এর পরের বছর দ্বিতীয় ইউনিট থেকে ১২০০ মেগাওয়াট করে মোট ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যোগ হওয়ার কথা রয়েছে।

প্রায় ১ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন এ প্রকল্পে রাশিয়া ৯১ হাজার ৪০ কোটি টাকা ঋণ সহায়তা দেবে এবং বাংলাদেশ সরকার দেবে ২২ হাজার ৫২ কোটি ৯১ লাখ ২৭ হাজার টাকা।