ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতাদের কোন্দল দিন দিন আরও প্রকট হচ্ছে। ছাত্র সমাবেশে নেতাদের বক্তব্য দিতে না দেওয়া, সাত কলেজ নিয়ে টানাটানি, আধিপত্যকে কেন্দ্র করে বেশ কিছুদিন ধরে চলছে তাদের রেষারেষি। এর প্রভাব পড়ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। তাদের এ চলমান অস্থিরতা বন্ধ না হলে বড় ধরনের সহিংসতার আশঙ্কা করছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
অধিভুক্ত সাত কলেজ শাখার নিয়ন্ত্রণ চায় সংগঠনের বিশ্ববিদ্যালয় শাখা। তাদের দাবি, এতে অ্যাকাডেমিক মানের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক মানেরও উন্নয়ন ঘটবে শিক্ষার্থীদের। তবে এতে সম্মতি জানায়নি কেন্দ্রীয় কমিটি। এ নিয়ে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি, বিক্ষোভ ও শিক্ষার্থী আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। গত মঙ্গলবার সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ। এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে সাত কলেজ ছাত্রলীগের কমিটি হওয়ার সুযোগ নেই এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিটিতে অধিভুক্তবিষয়ক সম্পাদক পদ যুক্ত করার ঘোষণা দেন সাধারণ সম্পাদক তানভীর হাসান সৈকত।
এ নিয়ে সাত কলেজ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সৈকতের মন্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে মঙ্গলবার রাতেই বিক্ষোভ করেছে ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের একাংশ। বুধবার বিক্ষোভ মিছিল করেছে কবি নজরুল কলেজ ছাত্রলীগ।
এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এলাকায় ঢাকা কলেজের দুই ছাত্রলীগ কর্মীকে বেধড়ক মারধরের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার ভোররাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। ধারণা করা হচ্ছে, সাত কলেজ ছাত্রলীগ নিয়ন্ত্রণ ইস্যুতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের টানাপড়েন চলছে তার পরিপ্রেক্ষিতে এ ঘটনা ঘটে থাকতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রণে যেতে নারাজ সাত কলেজ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের একাংশ। কবি নজরুল কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি বেলায়েত হোসেন একটি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘দেশরত্ন শেখ হাসিনা আপার প্রমোশন যুগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাইল আমাদের ডিমোশন। এটা একেবারেই অনাকাক্সিক্ষত। সাত কলেজের জন্য বাংলাদেশ ছাত্রলীগ আছে।’
তিতুমীর কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি মো. রিপন মিয়া বলেন, ‘আগে সাত কলেজ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিটিতে সাত কলেজের যোগ্য কর্মীদের স্থান দেওয়া হোক। তারপর না হয় আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিটির অনুসারী হব।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্যে ক্ষেপেছেন ইডেন কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি তামান্না জেসমিন রিভাও। সৈকতকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, ‘আপনি আগে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্র পড়েন, তারপর কথা বলেন। একটা জেলা ইউনিটকে কোন সাহসে আপনি উপজেলা ইউনিট বানাতে চান? আপনি যত শিক্ষার্থীর নেতৃত্ব দেন আমি তার থেকে বেশি শিক্ষার্থীর নেতৃত্ব দিই।’
ছাত্রলীগের মধ্যে এমন অস্থিরতায় নিরাপত্তাহীনতার শঙ্কায় ভুগছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। সাত কলেজ ছাত্রলীগের নেতাদের যুক্ত করা হলে শিক্ষার পরিবেশ বিনষ্ট হবে বলে মনে করেন তারা। গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ সুমন বলেন, ‘ছাত্রলীগের চলমান ঝামেলা মিটমাট না করলে যেকোনো সময় সহিংস রূপ ধারণ করতে পারে পরিস্থিতি। আর এর বলি হতে পারি আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীরা।’
রাকিবুল ইসলাম নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘সাত কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের আন্ডারে নিয়ে এলে ক্যাম্পাসের পরিবেশ আরও নষ্ট হবে। তারা ভবিষ্যতে লাইব্রেরি ব্যবহার, বাস ব্যবহার এমনকি হল ব্যবহারের দাবিগুলোও জানাতে পারে। আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীরা এমন সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত হতে পারি না।’
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক তানভীর হাসান সৈকত দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাত কলেজ শিক্ষার্থীদের স্বার্থেই আমরা তাদের অধিভুক্ত করতে চাইছি আর তা শান্তিপূর্ণভাবে। কিন্তু কেউ কেউ তাদের দিয়ে বিক্ষোভ করাচ্ছে। সাত কলেজ ছাত্রলীগের বেশিরভাগই আমাদের পক্ষে রয়েছে। অল্প কিছু নেতাকর্মীকে আমাদের বিরুদ্ধে উসকে দেওয়া হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, দুই কর্মীকে মারধরের বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না।
ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান বলেন, ‘এটি একটি সাংগঠনিক বিষয়। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কাজ হবে। গঠনতন্ত্রে যেভাবে ছাত্রলীগের ইউনিটগুলোর কমিটি গঠন করার কথা রয়েছে সেভাবেই কাজ করা হবে। এর বাইরে আমাদের চিন্তা নেই।’ যারা হামলার ঘটনা ঘটিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মাকসুদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টি আমাদের কাছে সবসময় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা জোরদার করতে আমরা কাজ করছি। এর ব্যত্যয় ঘটলে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি এবং নেব।’ তিনি আরও বলেন, শুধু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নয়, শিক্ষার্থী এবং ছাত্র সংগঠনগুলোর উচিত এ বিষয়ে লক্ষ রাখা। যাতে কোনোভাবেই ক্যাম্পাসের পরিস্থিতির অবনতি না ঘটে।