কার আইন কে মানে

বিভাগ ও অনুষদের প্রস্তাবের বাইরে গিয়ে সম্প্রতি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কলা অনুষদের নাট্যকলা ও পরিবেশনাবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তির শর্তের বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিভাগ সূত্রে এ কথা জানা গেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদে ভর্তিতে এসএসসি ও এইচএসসির মিলিত জিপিএ ‘৬’ হওয়ার কথা। নাট্যকলা ও পরিবেশনাবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক হওয়ার জন্য এসএসসি ও এইচএসসিতে আলাদাভাবে জিপিএ ৪ হওয়ার শর্ত উল্লেখ করা হয়েছে বিজ্ঞপ্তিতে। যদিও এ শর্তের উল্লেখ নেই ইউজিসির অভিন্ন নীতিমালায়।

সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪২তম অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল ও ৮১তম সিন্ডিকেট সভায় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) প্রণীত শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতিতে অভিন্ন নীতিমালা মানার সিদ্ধান্ত হয়। ইউজিসির অভিন্ন নীতিমালায় শিক্ষক হওয়ার যোগ্যতা স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাস উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে একটিতে ৩.৫০ (৪.০০) ও অন্যটিতে ৩.২৫ (৪.০০) থাকার কথা বলা হয়েছে। নীতিমালার কোথাও এসএসসি ও এইচএসসির ফলকে যোগ্যতার মাপকাঠি হিসেবে উল্লেখ করেনি ইউজিসি।

নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞপ্তি প্রসঙ্গে ইউজিসির সচিব ড. ফেরদৌস জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকার অভিন্ন নীতিমালা করতে ইউজিসিকে দায়িত্ব দিয়েছিল। বিশেষজ্ঞদের নিয়ে আমরা একটি অভিন্ন নীতিমালা করেছি। এটিকে মানার জন্য সবাইকে বলাও হয়েছে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য জিপিএ আর চাকরির জন্য জিপিএ নিয়ে প্রশ্ন করলে মন্তব্য করতে রাজি হননি ইউজিসি সচিব।

কলা অনুষদের বিভাগগুলোতে এমন জিপিএ চাওয়া প্রত্যাশিত নয় বলে মন্তব্য করেছেন কলা অনুষদের একাধিক শিক্ষক। সংগীত বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. জাহিদুল কবীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এমন শর্তে আটকে থাকা উচিত নয়। যে যোগ্যতায় শিক্ষার্থীদের ভর্তি করা হয় এবং যে যোগ্যতা তারা অর্জন করে তার সমন্বয় থাকা উচিত। এতে মেধাবীদের বেছে নিতে সুবিধা হবে।’

নাট্যকলার এমন বিজ্ঞপ্তি কি বিভাগের প্ল্যানিং কমিটির সুপারিশেই হয়েছে? জানতে চাইলে বিভাগটির প্রধান ড. কামাল উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের চাহিদা যা ছিল তা-ই প্ল্যানিং কমিটি পাঠিয়েছে। বাকিটা প্রশাসনের নিজস্ব সিদ্ধান্ত। আমরা আবেগে অনেক কথা বলতে পারি, বাস্তবে তাতে কাজ হবে না।’

বিভাগটির প্ল্যানিং কমিটির এক সদস্য বলেন, ‘প্ল্যানিং কমিটির প্রস্তাব ছিল জিপিএ ৩.৫০। আমরা জিপিএ ৪ (৫.০০) চাইনি।’

বিজ্ঞপ্তির শর্ত বিষয়ে কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মুশাররাত শবনম বলেন, ‘এটি অনুষদ, বিভাগ বা ইউজিসির নিয়মে হয়নি; উপাচার্যের মনে হয়েছে তাই দিয়েছে। আমার বলার কিছু নেই।’

বিজ্ঞপ্তির বিষয়ে সৌরভ নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় নাকি মানুষ গড়ার প্রতিষ্ঠান, অথচ ২০২৩ সালে যে সার্কুলার হলো কোনোভাবেই বোধগম্য নয়। শিক্ষক নিয়োগে এসএসসি ও এইচএসসির রেজাল্টের যে মাপকাঠি উল্লেখ করা হয়েছে তা ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল করার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে। আমাদের জিপিএ ২.৭৫ নিয়ে ভর্তি করানোর পর এখন জিপিএ ৪.০০ চাওয়াটা কি ঠিক? আমাদের গোল্ড মেডালিস্টও যদি বাদ পড়ে তাহলে আমাদের ভর্তি করানো হলো কেন? উচ্চ আদালতে আমরা যেতে চাই কিন্তু আমি জানি এজন্য আমাদের নানা হুমকি দেওয়া হবে, ভিসির অনুসারীরা ভবিষ্যতেও আমাদের ক্যারিয়ারে প্রভাব ফেলবে। শঙ্কায় আমরা উচ্চ আদালতে রিট করতে পারছি না।’

বিজ্ঞপ্তির শর্ত, ইউজিসির অভিন্ন নীতিমালা ও শিক্ষার্থীদের অভিযোগের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়য়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. সৌমিত্র শেখরকে খুদে বার্তা ও কল দিয়েও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

বিশ্ববিদ্যালয়টির রেজিস্ট্রার কৃষিবিদ ড. হুমায়ূন কবীর বলেন, ‘অভিন্ন নীতিমালা পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা নয়, এটি গাইডলাইন মাত্র। তাই ব্যত্যয় হয়েছে বলে মনে করিনি। এসএসসি ও এইচএসসি হলো বেসিক, সেখানে ভালো না করলে শিক্ষক হতে পারবে না কেউ।’ তিনি বলেন, ‘অনেকে নিজের লোক ঢোকানোর জন্য ভর্তির সময় কম জিপিএ চায়।’ তবে ভর্তির যোগ্যতা আর চাকরির যোগ্যতা বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি বিশ্ববিদ্যালয়টির এ কর্মকর্তা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ‘কম রেজাল্টধারী শিক্ষকদের নিয়ে প্রশাসন বিপদে আছে, তাই জিপিএ বাড়ানো হয়েছে।’

কলা অনুষদের একাধিক শিক্ষক বলেন, সম্প্রতি কলা অনুষদভুক্ত একটি বিভাগের শিক্ষক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে এসএসসি ও এইচএসসির যে রেজাল্ট চাওয়া হয়েছে, তা নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। নিয়োগে এইচএসসি ও এসএসসি কেন গুরুত্ব পাবে? গুরুত্ব পাওয়ার কথা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অর্জিত ফলের। এমন শর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বা এ বিশ^বিদ্যালয়ের বাইরের কোনো শিক্ষার্থী যত ভালোই করুক, শিক্ষক হতে পারবে না।’

বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক শ্রেণিতে ভর্তির জন্য কলা অনুষদগুলোতে এসএসসি ও এইচএসসির সম্মিলিত জিপিএ ৭ বা সাড়ে ৭ চাওয়া হয়। এ জিপিএ নিয়ে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম নয়। কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েও শিক্ষক নিয়োগে এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ বাড়িয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রশাসন। তবে উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তে সরে আসতে হয় তাদের। জিপিএ সর্বনিম্ন ৩ থাকলেই বিশ্ববিদ্যালয়টিতে চাকরির আবেদন করতে পারেন প্রার্থীরা।

একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তের কারণেই শিক্ষক নিয়োগে এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ ৩-এর বেশি চাইতে পারে না বিশ্ববিদ্যালয়টি।

একই জটিলতায় পড়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও আইনি কার্যক্রম চালাচ্ছেন একাধিক চাকরিপ্রত্যাশী শিক্ষার্থী। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েরও একাধিক শিক্ষার্থী রিট করেছেন উচ্চ আদালতে। চূড়ান্ত শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে গাজী ইব্রাহিম আল মামুনের রিট। আরেক রিটকারী আল-আমিন হোসেন নামে এক শিক্ষার্থী।

নাম প্রকাশ না করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়য়ের ২০০৪-০৫ শিক্ষাবর্ষের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘বর্তমানে যে নিয়োগ প্রক্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চলছে তাতে শিক্ষার্থীদের অধিকার ক্ষুণœ হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো রেজাল্ট করার পরও এসএসসি ও এইচএসসির রেজাল্ট ভালো না থাকায় আবেদনই করা যাচ্ছে না। বিশ্বের কোথাও প্রিলিমিনারি পর্যায়ের রেজাল্ট বিবেচ্য হয় না। স্নাতক ও স্নাতকোত্তরের রেজাল্টের পাশাপাশি রিসার্চ ওয়ার্ক প্রাধান্য পেয়ে থাকে। ইউজিসিকে এর সমাধান বের করতে হবে। না হলে আইনের আশ্রয় নেওয়া ছাড়া আমাদের উপায় থাকবে না।’