প্রবাসীদের বন্ডে বিনিয়োগসীমা প্রত্যাহার দাবি

বাংলাদেশে প্রবাসীদের বিনিয়োগের জন্য যে তিনটি বন্ড রয়েছে, তাতে বিনিয়োগসীমা নির্দিষ্ট করে দেওয়া আছে। বর্তমানে দেশের যে ডলার সংকট রয়েছে, তা দূর করতে প্রবাসী বন্ডে বিনিয়োগসীমা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন প্রবাসীরা। একই সঙ্গে এসব বন্ডের সুদহার বাড়ানোর পাশাপাশি বিডার মাধ্যমে প্রবাসীদের বিনিয়োগ পরিবেশ নিশ্চিত করে সব ধরনের হেনস্তা থেকে মুক্তি দেওয়ার দাবিও তুলেছেন তারা।

গতকাল রবিবার এনআরবি সিআইপি অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত তৃতীয় গ্লোবাল বিজনেস সামিটে এসব দাবি জানান প্রবাসীরা। যেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী ইমরান আহমদ। বিশেষ অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান। এনআরবি সিআইপি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাহতাবুর রহমানের সভাপতিত্বে দুর্যোগ ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ড. মো. এনামুর রহমান, বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আবু ফারাহ নাসের, রূপায়ণ গ্রুপের কো-চেয়ারম্যান ও দৈনিক দেশ রূপান্তরের প্রকাশক মাহির আলী খাঁন রাতুলসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী ইমরান আহমদ বলেছেন, প্রবাসীরা আগে যত ইচ্ছা বন্ড কিনতে পারতেন। পরবর্তীকালে সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় সরকার নির্দিষ্ট করে দিয়েছিল। এখন সুদের হার কম, প্রবাসী বন্ড ক্যাপিং করে রাখার কোনো মানে হয় না।

তিনি বলেন, বন্ড মার্কেট কীসের জন্য। কেউ যাতে বিনিয়োগ করে একটু লাভ করতে পারে। এখানে সুদহার নির্দিষ্ট করে রাখার মানে হয় না। প্রবাসীদের ২ দশমিক ৫ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়া হয়। আগে থেকেই বলে এসেছি এটি অপ্রতুল। বিদেশিরা যখন ফেরত আসবে, তাদের সব সুবিধা যাতে দেওয়া হয়।

আত্মমর্যাদার কথা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, দুঃখজনক হলেও সত্যি, প্রবাসীদের মর্যাদা সেভাবে দেওয়া হয় না। ডলার এনে ব্ল্যাক মার্কেটে বিক্রি না করলে সরকার লাভবান হবে। সঠিক চ্যানেলে ডলার আনুন, দেশের জন্য অন্তত এ ত্যাগটুকু করেন।

তিনি মনে করেন, প্রবাসীদের কর দেওয়ার বিষয়টি আরও ক্লিয়ার কাট হতে হবে। ইতিমধ্যে প্রবাসীদের জন্য পলিসি ড্রাফট করেছি, সবাইকে বলব সেটি স্টাডি করে মতামত দিন। প্রবাসীরা সামাজিক মর্যাদা পান না, এটা দুঃখজনক। কিন্তু এটার দায়িত্ব আমার একার নয়, সিভিল অ্যাভিয়েশনও এগিয়ে আসতে পারে। এ পলিসি বাস্তবায়ন করতে পারলে এসব বৈষম্য থাকবে না। বিমানবন্দরে প্রবাসীরা এলে এক কাপ কফি দিলে সরকারের খুব বেশি ক্ষতি হবে না।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান বলেন, রেমিট্যান্সের ওপর আমরা নির্ভরশীল। তারা আমাদের অর্থনীতির বুস্টার হিসেবে কাজ করেন।

পরে প্যানেল আলোচনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আবু ফারাহ নাসের বলেন, এ বন্ড সম্পর্কে ভুল ধারণা আছে সবার মধ্যে। এগুলো সরকারের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের। প্রবাসী বন্ডের দায়িত্ব বাংলাদেশ ব্যাংকের নয়। এ মুহূর্তে প্রবাসীদের মাধ্যমে রিজার্ভ বাড়ানো ছাড়া কোনো উপায় নেই।

এনআরবি সিআইপি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাহতাবুর রহমান বলেন, সবাই আমাদের সমস্যার কথাগুলো ভলোভাবেই জানেন, কিন্তু মানেন না। মন্ত্রণালয়গুলোতে এমন কিছু লোক আছে যারা শুধু প্যাঁচান। তাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিলেই এসব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়।

দেশ রূপান্তরের প্রকাশক মাহির আলী খাঁন রাতুল বলেন, আমাদের দেশ থেকে অনেক নারী প্রবাসে যান। কিন্তু তাদের ওপর যে ধরনের নির্যাতন করা হয় তা উদ্বেগের। আমি মনে করি এনআরবি সিআইপি অ্যাসোসিয়েশন এসব নির্যাতন বন্ধে উদ্যোগ নেবে। প্রবাসীদের সব ধরনের উদ্যোগের সঙ্গে রূপায়ণ গ্রুপ সবসময় আছে এবং থাকবে বলে জানান তিনি।

এ সময় মাহির আলী খাঁন সিআইপি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাহতাবুর রহমানকে ধন্যবাদ দিয়ে বলেন, তিনি সিআইপি ধারণাই পাল্টে দিয়েছেন। এ সংগঠনের ওয়ানম্যান আর্মি হিসেবে দাঁড়িয়েছেন।

এনআরবিসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান পারভেজ তমাল বলেন, দেশ ছাড়ার সময় অনেক স্বপ্ন নিয়ে যাই, সেই সঙ্গে দেশে ফেরার কথাও চিন্তা করি। দেশে টাকা পাঠাতে গেলে প্রবাসীরা হেনস্তার শিকার হন। তিনি বলেন, প্রবাসীদের বিনিয়োগের জন্য ভালো পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন, তা না হলে এত কষ্টের অর্থ তারা কেন বিনিয়োগ করবে?

দেশে ১৯৮৮ সালে পাঁচ বছর মেয়াদি ওয়েজ-আর্নার ডেভেলপমেন্ট বন্ড এবং ২০০২ সালে তিন বছর মেয়াদি ইউএস ডলার প্রিমিয়াম বন্ড ও ইউএস ডলার ইনভেস্টমেন্ট বন্ড চালু করা হয়। এ তিনটি বন্ডের মুনাফা আয়করমুক্ত। শুরুতে এসব বন্ডে বিনিয়োগের কোনো সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারিত ছিল না। কিন্তু ২০২০ সালের ডিসেম্বরে সরকার তিনটি বন্ডে প্রবাসীদের জনপ্রতি বিনিয়োগের সর্বোচ্চ সীমা ১ কোটি টাকায় বেঁধে দেয়। এ ছাড়া এসব বন্ড কেনার জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র থাকাটাও বাধ্যতামূলক করা হয়।

ওয়েজ-আর্নার ডেভেলপমেন্ট বন্ডে এখন ৯ শতাংশ সুদ পাওয়া যায়, আগে সুদ পাওয়া যেত ১২ শতাংশ। ইউএস ডলার প্রিমিয়াম বন্ডে এখন ৩.৫ শতাংশ সুদ দেওয়া হয়, আগে সুদ দেওয়া হতো ৭.৫ শতাংশ। আর ইউএস ডলার ইনভেস্টমেন্ট বন্ডে এখন ৩ শতাংশ সুদ পাওয়া যায়, আগে পাওয়া যেত ৬.৫ শতাংশ।