ভারত-কানাডা সুসম্পর্কে হঠাৎ ফাটল

শিখ নেতা হারদিপ সিং নিজার হত্যাকাণ্ডের ঘটনার জের ধরে ভারত ও কানাডার মধ্যে সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। হত্যাকাণ্ডে দিল্লির হাত আছে বলে প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো অভিযোগ করেছেন। এরমধ্যে ভারতীয় এক কূটনীতিককেও বহিষ্কার করা হয়েছে। এর পাল্টায় কানাডার এক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিককে বহিষ্কার করেছে ভারত।

বিবিসি বলছে, কানাডার শিখ নেতা হারদিপ সিং নিজার হত্যার জেরে গত সোমবার ভারতের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইংয়ের (র) প্রধান পবন কুমার রাইকে বহিষ্কার করেছে অটোয়া। অটোয়ার এই কূটনীতিক বহিষ্কারের পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে এবার কানাডীয় কূটনীতিককেই বহিষ্কার করল নয়াদিল্লি। গতকাল ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, এই সিদ্ধান্ত আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কানাডীয় কূটনীতিকদের হস্তক্ষেপ এবং ভারতবিরোধী কার্যকলাপে তাদের জড়িত থাকার বিষয়ে ভারত সরকারের ক্রমবর্ধমান উদ্বেগকেই প্রতিফলিত করে।

গত জুনে কানাডায় হারদিপকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ হত্যায় ভারত সরকারের হাত থাকার অভিযোগ এনেছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো। সোমবার কানাডার পার্লামেন্টে ট্রুডো বলেন, হারদিপ হত্যায় ভারত সরকার জড়িত থাকার বিষয়ে কানাডার গোয়েন্দা সংস্থার হাতে ‘বিশ্বাসযোগ্য’ সূত্র রয়েছে। ট্রুডোর এ অভিযোগকে ‘অযৌক্তিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে ভারত সরকার।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্রিটিশ কলম্বিয়ার পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশের একজন বিশিষ্ট শিখ নেতা ছিলেন হারদিপ সিং। খালিস্তানের পক্ষে তিনি প্রকাশ্যে প্রচারণা চালিয়েছেন। খালিস্তানের পক্ষে সক্রিয়তার কারণে তাকে বেশ কয়েকবার হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছেন তার সমর্থকরা। ভারতও তাকে এর আগে বর্ণনা করেছে বিচ্ছিন্নতাবাদী জঙ্গি গোষ্ঠীর নেতৃত্ব দেওয়া সন্ত্রাসী হিসেবে। ভারতের এসব অভিযোগ হারদিপের সমর্থকরা ‘ভিত্তিহীন’ বলে উড়িয়ে দিয়েছিল।

গতকাল মঙ্গলবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি জানিয়েছে, তাদের দেশে কানাডার এক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিকে ভারত ছাড়ার জন্য পাঁচ দিন সময় দেওয়া হয়েছে।

এদিকে ভারত-কানাডা এ দ্বন্দ্বে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউজ মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে বলেছে, ভারতের বিরুদ্ধে ট্রুডোর তোলা অভিযোগের বিষয়ে তারা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। হোয়াইট হাউজের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের মুখপাত্র অ্যাড্রিয়েন ওয়াটসন বলেন, আমরা কানাডীয় সহযোগীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি। কানাডার তদন্ত যেন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয় এবং দোষীরা বিচারের আওতায় আসে, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

যুক্তরাজ্য সরকারের মুখপাত্রও জানিয়েছেন, হারদিপ সিং নিজার হত্যাকাণ্ডের গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে কানাডীয় অংশীদারদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রাখছে ব্রিটিশ সরকার।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারত ও কানাডার মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে খুবই ভালো বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু এখন এই সম্পর্ক যে জায়গায় পৌঁছে গেল, তার প্রভাব দুই দেশের বাণিজ্যতে পড়তে পারে। ভারতের সাবেক আইপিএস অফিসার ও সুরক্ষা বিশেষজ্ঞ শান্তনু মুখোপাধ্যায় জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়েচে ভেলেকে বলেছেন, কানাডা যেভাবে ভারতীয় কূটনীতিককে বের করে দিল, তাতে বোঝা যাচ্ছে, দুই দেশের সম্পর্ক এখন কতটা খারাপ। তিনি বলেন, আমাদের (ভারত) কড়া নীতি নিয়ে চলতে হবে। তাতে যদি দুই দেশের বাণিজ্য-সম্পর্ক খারাপ হয়ে যায় তো হবে। আমাদের কিছু করার নেই। একটা কথা বুঝতে হবে, কানাডা যা করেছে, তা করে ভালো সম্পর্ক রাখা যায় না।

প্রবীণ সাংবাদিক ও কূটনীতি বিশেষজ্ঞ প্রণয় শর্মা সংবাদমাধ্যমটিতে বলেন, সব দেশই এখন ভারতের বাজারকে ধরতে চাইছে। কারণ, ভারতের অর্থনীতির দ্রুত বৃদ্ধি হচ্ছে। তারপরেও ট্রুডো ভারতের সঙ্গে ফ্রি ট্রেড চুক্তি নিয়ে আলোচনা স্থগিত করে রেখেছেন। এখন এটাই কাম্য যে, দুই দেশ সমস্যা কাটিয়ে আবার বন্ধুত্বের পথে চলুক।

উইলসন সেন্টারের সাউথ এশিয়া ইনস্টিটিউটের মাইকেল কুগেলম্যান এএনআইকে বলেছেন, আমি রীতিমতো অবাক হয়েছি। ভারতের সঙ্গে কানাডার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল, সেখানে কূটনৈতিক সম্পর্কের এই জটিলতা অবাক করার মতো।

২০২২ সালে ভারত ও কানাডার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১০ দশমিক পাঁচ বিলিয়ন ডলার। ভারত ছয় দশমিক চার বিলিয়ন ডলারের জিনিস পাঠিয়েছে, আর কানাডার জিনিস ভারতে এসেছে চার দশমিক এক বিলিয়ান ডলারের। এছাড়া কানাডার পেনশন ফান্ড এবং অন্টারিও টিচার্স পেনশন প্ল্যান ভারতের বাজারে প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করেছে।