সহকর্মীদের সাড়া না পাওয়া তৌফিকুল পাচ্ছেন গবেষণায় স্বর্ণপদক

২০১২ সালে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যুক্ত হওয়ার সময়েও ছিল না নিজের নামে প্রকাশিত কোনো গবেষণা। বারবার নিজের সহকর্মীদের গবেষণার কাজে সাথে নেয়ার জন্য বললেও পাননি তাদের সাড়া। বর্তমানে সেই শিক্ষকই কি না গবেষণার জন্য পাচ্ছেন ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া ১২তম আন্তর্জাতিক স্বর্ণপদক।

'সায়েন্টিস্ট সেক্টর' গবেষণায় বিশেষ অবদানের জন্য এবার এ আন্তর্জাতিক সম্মাননা পাচ্ছেন তিনি।২০১৭ সালেও যার বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা ছিল মাত্র ৯-১০ টি ২০২৩'এ এসে তা ৩০০ ছাড়িয়েছে। নিজের নামের পাশে প্রতিনিয়ত যুক্ত করছেন নতুন মাত্রা।

বলছিলাম রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইফ অ্যান্ড আর্থ সায়েন্স অনুষদের ডিন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আবু রেজা মোহাম্মদ তৌফিকুল ইসলামের কথা।

তৌফিকুল ইসলামের বেড়ে উঠা রংপুরের তারাগঞ্জে। প্রাথমিক জীবন শেষ করেছেন তারাগঞ্জের শেরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে। মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন তারাগঞ্জ হাইস্কুল ও উচ্চ মাধ্যমিক করেন সৈয়দপুর সরকারি কারিগরি মহাবিদ্যালয় থেকে। ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এবং ২০১৭ সালে চীনের ন্যাঞ্জিং ইউনিভার্সিটি অফ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি থেকে জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন এবং পরে খরার ওপর জলবায়ুর প্রভাব নিয়ে পোস্টডগ করেন।

২০১২ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে যুক্ত হওয়ার পর নিজের কোনো গবেষণা ছিল না। বিভিন্ন সময়ে নিজের সহকর্মীদের সাথে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করে তাদের জানালেও তারা তাকে সাথে নেয়নি। পরে সেল্ফ মোটিভেটেড হয়ে শুরু করেন গবেষণার কাজ তখন মাসুম আহমেদ পাটোয়ারী নামে একজন সহকর্মী তাকে অনুপ্রাণিত করেন।

সে বছর ৫-৬টা গবেষণা করে ২০১৪ সালে স্কলারশিপ নিয়ে চীনে গিয়ে পিএইচডি সম্পন্ন ২০১৭ সালে। পিএইচডি চলাকালীন তার সুপারভাইজারের সহায়তায় ৯ টি আর্টিকেল প্রকাশ করেন এবং সে বছর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে 'আউটস্ট্যান্ডিং ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট অ্যাওয়ার্ড' প্রদান করা হয়। যা কি না ৩০ দেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে শুধুমাত্র তিনজনকে দেয়া হয়।তার কর্মদক্ষতা ও রিসার্চের কাজ দেখে তাকে এ অ্যাওয়ার্ড' প্রদান করেন বিশ্ববিদ্যালয়টি।

পিএইচডি সম্পন্ন করে দেশে ফিরে বিশ্ববিদ্যালয়ে যুক্ত হয়ে তিনি পুরোদমে শুরু করেন গবেষণার কাজ। বদলে দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা চিত্র। যে বিশ্ববিদ্যালয় কখনও সিমাগো ব্যাংকিং এ আসতেই পারেনি সেই বেরোবিই এবার গবেষণা র‍্যাংকিং'এ দেশের ৩য়।যেখানে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছেন এই গবেষক। বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক-স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী,শিক্ষকদের মাঝে ছড়িয়ে দেন গবেষণার তাৎপর্য। তার এই প্রচেষ্টার ফলেই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিবছরই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্কলারশিপ পেয়ে পড়তে যাচ্ছে বিভিন্ন শিক্ষার্থী। বিভিন্ন সময়ে তিনি নিজেই তার শিক্ষার্থীদের আইএলটিএস পরীক্ষার ফি প্রদান করেন। অনুপ্রাণিত করেন গবেষণা করে বহির্বিশ্ব থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশকে কিছু দিতে।

তিনি মনে করেন,দেশের, বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নে গবেষণার বিকল্প নেই আর এই গবেষণার মানোন্নয়ন করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যেক শিক্ষককেই অন্তত একবার হলেও দেশের বাইরে গিয়ে পড়াশোনা করে আসা উচিত।

এ শিক্ষক ও গবেষক পিএইচডি শেষ করে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৭ সালে ফিরে এসে জয়েন করলে সে বছর স্কোপাস ইনডেক্স-হাই কোয়ালিটি জার্নালে ২৫টা পেপার পাবলিশ হয়েছিল যার মধ্যে তার ১০টা, ২০১৮ সালে ৪৯টা পাবলিশ হয় তার ছিল ১২টা। ২০১৯ সালে যখন স্কোপাস ইনডেক্সে ৭৫টার মধ্যে ১০টা,২০২০ সালে ১০০টার মধ্যে ২৫টা, ২০২১ সালে ১৩০টার মধ্যে ৭০টা,২০২২ সালে ১৪৯টা পাবলিশ হয় যার মধ্যে তারই ১০০টা। চলতি বছরে ৯ মাসে তার নিজের গবেষণা ৯০টি প্রকাশিত হয়েছে যা বছর শেষে ১২০ ছাড়িয়ে যাবে বলে আশাবাদী তিনি।

গবেষণায় এমন অবদানের জন্য পুরস্কারপ্রাপ্ত হয়েছেন নানা সময়ে। তবে বিশ্বের ২% গবেষকদের তালিকা প্রকাশ করলে তাদের মধ্যে তিনি একজন এই প্রাপ্তি এবং এ বছর এই স্বর্ণপদক প্রাপ্তি তাকে নতুনরূপে জাগিয়ে তুলতে অনুপ্রাণিত করছে বলে জানান তিনি।

এই গবেষকের সাথে কথা বললে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২০১৪ সালে গবেষণার জন্য চাইনিজ গভমেন্ট স্কলারশিপ পেয়ে চায়নায় চলে যাই। যেখানে তিন বছরে পিএইচডি করা কঠিন সেখানে আমি দুই বছর ১০ মাসে পিএইচডি শেষ করি। আমার কাজই ছিল গবেষণা করা, সারাদিন রাত গবেষণা নিয়ে পড়ে থেকেছি। প্রতিদিন ১৫-১৬ ঘণ্টা ডাটা ক্যালকুলেশন করেছি।

তিনি বলেন,দেশে ফিরে এসে গবেষণায় নিজেকে নিয়োজিত করেছি।সবচেয়ে গবেষণায় কাজ করেছি করোনাকালে,সবাই যখন বাঁচার চিন্তায় ঘর বন্দী ছিল আমি তখন গবেষণার কাজে ১৫-১৭ ঘণ্টা করে নিয়োজিত ছিলাম।যার সুফল এখন পাচ্ছি।

জলবায়ু পরিবর্তনের উপর গবেষণা করে এবং সোশ্যাল সায়েন্স সম্পর্কিত বিভিন্ন গবেষণায় এই গবেষকের ৩০০টিরও বেশি আর্টিকেল বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে,সাইটেশন প্রায় ১০হাজার। গবেষণায় নিজের বিশ্ববিদ্যালয়কে চিনিয়েছে ভিন্ন মাত্রায়।