‘মালিকের বাসায় কাজ করতাম। যখন যে কাজ বলত তা-ই করতে হতো। ওই বাসার কেউ আমাকে আদর করত না। কোনো ভুল করলেই ম্যাডাম আমাকে গালাগালি করত। একদিন রাতে ঠান্ডা লাগে। তারপর জ¦র আসলে একজনকে দিয়ে আমাকে ডাক্তারের কাছে পাঠিয়ে দেয়। এখানে আমাকে যে নিয়ে আসছিল, তাকে আর পাইনি। আমার খুব ভয় লাগছিল, হাসপাতালে একা একা প্রতিদিন কান্নাকাটি করতাম। আম্মারে কেউ জানায়নি।’ রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আটতলার শিশু ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন ১০ বছরের সুমি এভাবেই বলছিল তার দুর্দশার কথা।
সুমি কথা বলতে পারছিল না। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। কেবল ফ্যালফ্যাল করে তাকাচ্ছিল আর চোখ দিয়ে পানি পড়ছিল। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর স্বজনদের সহানুভূতি পেলেও শিশুটির জন্য মায়া হয়নি তার গৃহকর্তা নুরুদ্দীন ইমরান ও তার স্ত্রী আশার। তাদের বাসা রাজধানীর কমলাপুর এলাকায়।
গতকাল শুক্রবার বিকেল ৪টার দিকে সরেজমিনে হাসপাতালে গিয়ে জানা যায়, গত রবিবার অভিভাবকহীন শিশু হিসেবে হাসপাতালে রেখে যায় শিশু সুমিকে। এরপর নুরুদ্দীন-আশা দম্পতির বাসার কাজের ছেলে আজিজুল তাকে হাসপাতালে ভর্তি করে রেখে চলে যায়। কিন্তু ভর্তির কাগজপত্রে কোনো ঠিকানা উল্লেখ করা হয়নি। তার অভিভাবক হিসেবে নাম লেখানো হয় রুহুল আমিন, যাকে সুমি চেনে না। ফলে হাসপাতাল থেকেও শিশুটির অভিভাবকের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে সুমিও তার বাবার নাম কিংবা গ্রামের ঠিকানা বলতে পারছিল না। ভর্তি হওয়ার পর সুমির স্থান হয় হাসপাতালের মেঝেতে। দুদিন মেঝেতেই পড়েছিল সে।
এরপর বুধবার শিশুটির জায়গা হয় হাসপাতালের শয্যায়। হাসপাতালে ভর্তির সময় সুমির সঙ্গে কোনো জামাকাপড় দেওয়া হয়নি। শয্যায় আসার পর সুমির প্রতি নজর পড়ে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর স্বজন নার্গিস বেগমের। তিনি সুমির জন্য খাবার ও নতুন জামা কিনে আনেন। মায়ের মতো যত্ন করতে শুরু করেন।
নার্গিস দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মানুষ কতটা খারাপ হয়। এটুকু একটা মেয়েকে হাসপাতালে ফেলে রেখে চলে যায়, মালিক এসে একবার দেখেও না। অনেক কষ্ট হচ্ছে মেয়েটার। একটা মাত্র জামা পরে থাকতে দেখে আমি নতুন জামা কিনে দিয়েছি। খাবার কিনে এনে খাওয়াইছি। মেয়েটার জন্য খুব খারাপ লাগছে। তাকে অক্সিজেন দিতে হচ্ছে দিনে কয়েকবার করে।’
চিকিৎসকরা জানান, সুমি ডেঙ্গু জ¦রে আক্রান্ত। তার চিকিৎসা চলছে। এখন কিছুটা ভালো। শ্বাসকষ্ট থাকায় তাকে অক্সিজেন দিতে হচ্ছে। তার চিকিৎসার খরচ দেওয়া হচ্ছে সমাজকল্যাণ তহবিল থেকে।
সুমিকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে নিয়ে আসেন আজিজুল হক। তাকে হাসপাতালে ভর্তি রেখে তিনি বাসায় চলে গেলেও আজ সকালে সুমির বাবাসহ হাসপাতালে আসেন আজিজুল। তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সুমি যে বাসায় কাজ করে তার মালিকের নাম নুরুদ্দীন ইমরান। যিনি মানবাধিকার কমিশনের প্রতিবেদক হিসেবে কাজ করেন বলে দাবি তার। তার স্ত্রীর নাম আশা। নুরুদ্দীন-আশা দম্পতির তিন মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে।
আজিজুল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সুমি অসুস্থ হলে আমাকে হাসপাতালে নিয়ে আসতে বলেন মালিক নুরুদ্দীন। প্রথম দিন রাতে আমিও হাসপাতালে সুমির সঙ্গে ছিলাম। মালিকের দাদার মৃত্যুবার্ষিকী থাকার কারণে এরপর আমি বাসায় চলে যাই। সেখানে বিভিন্ন কাজ করি, তারপর আজ আবারও হাসপাতালে আসি।’
তিনি বলেন, ‘মালিক আমাকে সুমির বাবার নাম যা বলেছেন তাই লিখিয়েছি। বাসায় মালিকের স্ত্রী অসুস্থ থাকার কারণেই আমাকে দিয়ে হাসপাতালে পাঠান।’
জামালপুর থেকে খবর পেয়ে শিশুটির বাবা হজরত আলী শুক্রবার হাসপাতালে আসেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, তার চার মেয়ে ও দুই ছেলে। বড় মেয়ে জনি বেগম ওই মালিকের বাসায় আগে কাজ করত। দুই মাস আগে জনি কাজের কথা বলে সুমিকে নিয়ে এসে ওই বাসায় দেন। সুমির মজুরি হিসেবে প্রতি মাসে ১ হাজার টাকা তাকে বিকাশে পাঠানো হতো।
হজরত আলী বলেন, ‘আমি নিজেও অসুস্থ, কোনো কাজ করতে পারি না। বড় মেয়ের বিয়ে হলেও বাকি পাঁচ ছেলেমেয়েকে নিয়ে কষ্টের সংসার। একদিন মালিকের বউ কল দিয়ে জানান, সুমির জ্বর আসছে। আমি বলি ডাক্তার থেকে ওষুধ নিয়ে খাওয়াতে। এর দুদিন পর তিনি আবার জানান, সুমি সুস্থ হয়েছে। কিন্তু আমার মেয়ে যে এত অসুস্থ তা আমাকে জানানো হয়নি। এরপর গতকাল রাতে আমাকে মালিকের বউ জানান সুমি হাসপাতালে।’
হাসপাতালে দেখতে না এলেও তাকে আবারও কাজে নিতে চান বলে সুমির বাবা জানান।