চট্টগ্রামে জাহাজভাঙা কারখানার এক শ্রমিকের মৃত্যু নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে। ওই শ্রমিকের বাবা মো. ইউনুচের অভিযোগ, মর্গে গিয়ে শনাক্তের পরও নৌপুলিশ তার ছেলে রাসেলের লাশ বেওয়ারিশ হিসেবে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের কাছে হস্তান্তর করেছে। ৩ সেপ্টেম্বর স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাটি ওই শ্রমিকের মরদেহ চট্টগ্রাম নগরীর চৈতন্যগলি করবস্থানে দাফনও করে ফেলেছে।
এর আগে ২ সেপ্টেম্বর রাতে সীতাকুণ্ড থানা এলাকার বাড়বকুণ্ড বেড়িবাঁধ থেকে ২৮-৩০ বছর বয়সী অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করে কুমিরা নৌপুলিশ ফাঁড়ির একটি দল। পরদিন এই লাশের ময়নাতদন্ত করা হয় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের মর্গে।
ইউনুচের অভিযোগ, গত ২৬ আগস্ট সকালে সীতাকুণ্ড থানা এলাকার মাদামবিবির হাট নেভি গেট এলাকার বাসা থেকে কর্মস্থল ‘ববিতা ফিল্ড’ (জাহাজ কাটার স্থান)-এ যান তার ছেলে মো. রাসেল। রাতে ফিরে না আসায় পরের দিন সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে যান সীতাকুণ্ড থানায়। কিন্তু থানা কর্র্তৃপক্ষ তার থেকে জিডি নেয়নি। এর পরের দিন (২৮ আগস্ট) পুনরায় থানায় গেলেও জিডি না নেওয়ায় তিনি হতাশ হয়ে পড়েন। এ সময় থানার সেকেন্ড অফিসার মুকিব হাসান তার সঙ্গে দুর্ব্যবহারও করেন। শেষে ২৯ আগস্ট পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজির কাছে সীতাকুণ্ড থানা পুলিশের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দেন। এতে তিনি তার ছেলে রাসেলকে পরিকল্পিত হত্যার অভিযোগ আনেন।
জানা গেছে, আসাদুজ্জামান স্বপন নামে এক ব্যক্তির মালিকানাধীন সাউদার্ন স্যালভেজ অ্যান্ড শিপিং করপোরেশনে ‘কাটার মাস্টার’ হিসেবে কর্মরত ছিলেন রাসেল। এই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মো. ফারুকের দাবি, রাসেল দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন। ঘটনার দিন (২৬ আগস্ট) বেলা আড়াউটা বা তিনটার দিকে জোয়ার আসার আগ মুহূর্তে বার্জ থেকে খালি গায়ে নেমে পড়েন রাসেল। এরপর থেকে তার আর হদিস পাওয়া যায়নি। পরিকল্পিত হত্যার অভিযোগ নাকচ করে ফারুক বলেন, নৌপুলিশ যে লাশটি উদ্ধার করেছে, সেটি যে রাসেলের তা এখনো কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছে না।
নৌপুলিশের কুমিরা ফাঁড়ির ইনচার্জ মো. নাসির উদ্দিনের দাবি, উদ্ধারের পর লাশ শনাক্তের জন্য ইউনুচকে ডাকা হয়েছিল। তিনি আসেননি। ফলে অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে মরদেহ আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের কাছে হস্তান্তর করা হয়। মরদেহটি কঙ্কালসার হয়ে গিয়েছিল। মুখমণ্ডল ঝলসানো ছিল। চেনার উপায় ছিল না। তবু পরিচয় শনাক্ত করতে মরদেহের ডিএনএ স্যাম্পল নেওয়া হয়েছে।
ইউনুচের দাবি, ২ সেপ্টেম্বর রাত ১১টার দিকে লাশ উদ্ধারের খবর তাকে প্রথম জানান সাউদার্ন স্যালভেজ অ্যান্ড শিপিং করপোরেশনের কর্মচারী ফারুক। ছেলের লাশ শনাক্তের জন্য প্রথমে তাকে নৌপুলিশ ফাঁড়িতে যেতে বলেন ফারুক। পরে আবার মোবাইল ফোনে কল করে ফারুক বলে, ‘আপনি বৃদ্ধ মানুষ। এত রাতে এসে লাভ নেই।’ পরের দিন ৩ সেপ্টেম্বর বেলা ১১টার দিকে চমেক হাসপাতালের মর্গে যান তিনি (ইউনুচ)। এ সময় বাম পায়ের হাঁটুর নিচে পুরনো ক্ষতচিহ্ন দেখে ছেলের লাশ শনাক্ত করেন। পুলিশের কাছে ছেলের লাশ চেয়েও পাননি। এখন ডিআইজির কাছে দেওয়া অভিযোগও প্রত্যাহার করে নিতে চাপ দিচ্ছে সীতাকুণ্ড থানা পুলিশ।
ইউনুচের দাবি, শুরু থেকেই ঘটনা ধামাচাপা দিতে তৎপর হয়ে ওঠেন সাউদার্ন স্যালভেজ অ্যান্ড শিপিং করপোরেশনের মালিক আসাদুজ্জামান স্বপন। নিছক দুর্ঘটনায় তার ছেলের মৃত্যু হয়েছে এবং ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনানুগ কোনো পদক্ষেপের দিকে তিনি (ইউনুচ) যাবেন না মর্মে সাদা কাগজে একটি অঙ্গীকার নেন আসাদুজ্জামান। একই সঙ্গে ক্ষতিপূরণ হিসেবে তাকে টাকা দেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়। এযাবৎ দুই দফায় তাকে দুই লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে বলে জানান ইউনুচ। আরও চার লাখ টাকা দেওয়ার কথা থাকলেও তা দেননি আসাদুজ্জামান। রাসেলকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা না করলে আসাদুজ্জামান স্বপন ঘটনা ধামাচাপা দিতে এত তৎপর কেন, প্রশ্ন ইউনুচের।
এ প্রসঙ্গে বক্তব্য জানতে গত দুদিন স্বপনের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়েও সাড়া মেলেনি।
এদিকে চমেক হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের একটি সূত্র জানিয়েছে, ২ সেপ্টেম্বর বাড়বকুণ্ড বেড়িবাঁধ থেকে উদ্ধার করা পরিচয় শনাক্ত না হওয়া মরদেহের মাথায় আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে।
রাসেলের নিখোঁজ হওয়ার ডায়েরি না নেওয়া প্রসঙ্গে সীতাকুণ্ড থানার ওসি তোফায়েল আহমদ বলেন, ‘ইউনুচ একেক সময় একেক কথা বলছেন। তার ছেলে নিখোঁজের পর কর্ণফুলী নদী থেকে নৌপুলিশ একটি লাশ উদ্ধারের পর বলেছেন, সেটি তার ছেলের। পরের দিন থানায় এসে বলেছেন, সেটি তার ছেলের লাশ নয়। পুলিশের অসহযোগিতা এবং ডিআইজির কাছে করা অভিযোগ প্রত্যাহার করে নিতে ইউনুচকে চাপ দেওয়ার অভিযোগ সঠিক নয়।’
আর ইউনুচের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সীতাকুণ্ড থানার এসআই মুকিব হাসান।