রসিদ হাত বদলায় দাম বাড়ে

দেশে আলু উৎপাদনের শীর্ষে থাকা জেলা মুন্সীগঞ্জ। রাজধানীর উপকণ্ঠের এ জেলায় উৎপাদিত আলু স্থানীয় চাহিদা মিটিয়েও দেশের বড় একটি অংশের জনগোষ্ঠীর চাহিদা পূরণে ভূমিকা রেখে আসছে। বিগত বছরে বর্ষা ও বর্ষা শেষের মৌসুমে আলুর দাম ক্রেতার হাতের নাগালে থাকলেও এ বছর খুচরা বাজারে দাম নিয়ে নৈরাজ্যের সৃষ্টি হয়েছে। আর দাম নিয়ে বাজারে এ অস্থিরতার অন্যতম কারণ হিসেবে হিমাগারে সংরক্ষিত আলু পাইকারি দরে বিক্রির সময় রসিদ হাত বদলের চিত্র উঠে এসেছে।

পাকা রসিদ ছাড়াই হিমাগারগুলোতে ব্যবসায়ীরা আলু বেচাকেনা করে থাকেন। আবার হিমাগারের ভেতরেই একজন আরেকজনের কাছে রসিদ ছাড়া আলু বিক্রি করে থাকে। আর এভাবেই বেশি মুনাফার লোভে এক ব্যবসায়ী থেকে আরেক ব্যবসায়ী বিকিকিনির কারণে আলুর দাম চড়েছে বলে দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

জেলার বিভিন্ন হিমাগারে আলু সংরক্ষণ করে থাকেন এমন বড় ব্যবসায়ী রয়েছেন শতাধিক। তাদের মধ্যে এমনও ব্যবসায়ী রয়েছেন যারা একেক জন ১০ হাজার থেকে লাখ বস্তা আলু সংরক্ষণ করেছেন। তাদের কাছ থেকে রসিদের হাত বদলের মধ্য দিয়ে আলুর দাম বেড়ে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। জেলা শহরের উপকণ্ঠ মুক্তারপুর এলাকার মাল্টি পারপাস কোল্ড স্টোরেজ ও রিভারভিউ কোল্ড স্টোরেজের মালিক হচ্ছেন পঞ্চসার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাজি গোলাম মোস্তফা। তিনি একই সঙ্গে আলুর একজন মজুদদার। এই জনপ্রতিনিধি তার মালিকানাধীন হিমাগারে নামে-বেনামে হাজার হাজার বস্তা আলু সংরক্ষণ করে থাকেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে চেয়ারম্যান হাজি গোলাম মোস্তফা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি শুধু কোল্ড স্টোরেজের মালিক। আমি আলু মজুদ করি না। আমার আলু মজুদের কথা মিথ্যা।’

গত ১৬ সেপ্টেম্বর রিভারভিউ কোল্ড স্টোরেজে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর অভিযান চালায়। এ সময় সেখানে পাকা রসিদ ছাড়া মোবাইল ফোনের মাধ্যমে দরদাম ঠিক করে আলু বিক্রির অভিযোগে রসরাজ নামে এক বড় ব্যবসায়ীকে আটক করা হয়। পরে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হলে মুচলেকা দিয়ে তিনি ছাড়া পান। আটক রসরাজ হিমাগার পর্যায়ে সরকার নির্ধারিত ২৭ কেজি দরে আলু বিক্রি করবেন বলে মুচলেকা দেন। আটকের পর রসরাজ রিভারভিউ কোল্ড স্টোরেজে তার ১০ হাজার বস্তা আলু মজুদ থাকার কথা স্বীকার করেন।

রসরাজের মতোই পাকা রসিদ ছাড়াই আলু বিক্রি করেন আরও অনেকেই। যদিও সরকার দাম বেঁধে দেওয়ার পর প্রশাসন ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানের কারণে এখন আর কেউ রসিদ ছাড়া আলু বিক্রি করছেন না বলে ব্যবসায়ীরা দাবি করছেন। শহরের উপকণ্ঠের পঞ্চসার ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য (মেম্বার) পশ্চিম মুক্তারপুর এলাকার মো. দেলোয়ার হোসেন বেশ কয়েকটি হিমাগারে আলু সংরক্ষণ করে থাকেন। জেলা আলুচাষি ও ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি এই দেলোয়ার হোসেন লাখ বস্তা আলু সংরক্ষণ করেন বলে লোকমুখে শোনা যায়।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় এ বছর আলুর চাহিদা রয়েছে ৯৫ হাজার ৮৮ টন। সেখানে উৎপাদন হয়েছে ১০ লাখ ৫৬ হাজার ৪৬৩ টন। জেলার হিমাগারগুলোতে এখনো মজুদ রয়েছে ২ লাখ ৬৯ হাজার ২৩২ টন আলু।

সারা দেশে ২০২২-২৩ অর্থবছরে আলুর উৎপাদন ছিল ১ কোটি ১১ লাখ ৯১ হাজার ৫০০ টন। দেশে আলুর চাহিদা ৮৯ লাখ ৯২ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৯১ লাখ ৯ হাজার টন। সে হিসাবে উদ্বৃত্ত থাকে অন্তত ২০ লাখ টনের বেশি আলু। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মুন্সীগঞ্জ জেলায় ৬২টি হিমাগার রয়েছে। যেখানে প্রতি বছর ৫ লাখ ৪৫ হাজার ৪৬০ টন আলু রাখা হয়। স্থানীয় আলুর পাশাপাশি রংপুর থেকেও এনে রাখা হয় আলু। এসব আলু ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, সিলেট, বরিশাল, বরগুনা, চট্টগ্রামের বিভিন্ন আড়তে বিক্রি হয়। মৌসুমের শুরুতে হিমাগারগুলোতে ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি কৃষকরা আলু রাখলেও জুলাইয়ের আগে কৃষকের এসব আলু কিনে নেন ব্যবসায়ীরা। এরপরই আলুর বাজার ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।

শ্যামল সরকার নামে এক আলু ব্যবসায়ী বলেন, ‘হিমাগারগুলোতে  প্রতিদিন যেমন শতশত বস্তা আলু বিক্রি হচ্ছে। তেমনই আলুর মালিকানার দলিল বিক্রি হচ্ছে। এসব দলিল আমাদের মতো ব্যবসায়ীরা একজন আরেকজনের কাছ থেকে কিনছেন। এমনও হয়েছে দুই মাস আগে ৫০ কেজির বস্তার যে দলিল ১৩০০ টাকায় বিক্রি করেছিলাম, সেই দলিল ১৪০০ থেকে ১৫০০ টাকায় কিনেছি। গত ১৫ দিন ধরে একই দলিল ১৬০০ থেকে ১৭০০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। প্রতিবার হাত বদল হলেই ৫০-১০০ টাকা করে দাম বাড়ছে।’

এ প্রসঙ্গে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর মুন্সীগঞ্জ জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আব্দুস সালাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা কোল্ড স্টোরেজগুলোতে তদারকি করছি। রসিদের মাধ্যমে এখন ব্যবসায়ীরা আলু বিক্রি করছেন। তবে সন্দেহ দেখা দিলে আমরা তারও খোঁজখবর নিচ্ছি। সেক্ষেত্রে আমরা হাতবদল কিংবা রসিদ ছাড়া আলু বিক্রির প্রমাণ পাচ্ছি না।’

তবে প্রশাসনের এসব পদক্ষেপের পরও সরকার নির্ধারিত দাম উপেক্ষা করে মুন্সীগঞ্জের বিভিন্ন হাটবাজারে আলু বিক্রি হচ্ছে। খুচরা বাজারে সরকার ৩৫ থেকে ৩৬ টাকা কেজি দরে আলুর দাম নির্ধারণ করে। তবে হাটবাজারগুলোতে বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৪৫ টাকা কেজি দরে। আবার হাটবাজারগুলোতে আলুর সরবরাহ কমে গেছে। প্রশাসনের পক্ষে অভিযানে নামলেই হাটবাজারে ৩৬ টাকা দরে আলু বিক্রি করা হচ্ছে। কিন্তু প্রশাসনের লোকজন চলে যাওয়া মাত্রই বাড়তি দামে আলু বিক্রি করছেন খুচরা বাজারের ব্যবসায়ীরা।

আলুর বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে ইতিমধ্যে খোলাবাজারে ৩৬ টাকা কেজি দরে আলু বিক্রি শুরু হয়েছে। গত ২১ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসনের তদারকিতে সরকার নির্ধারিত দামে এ আলু বিক্রি কার্যক্রম শুরু করে জেলা আলুচাষি ও ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতি। ওই দিন বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের মাঠ প্রাঙ্গণে আলু বিক্রি কার্যক্রম উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক মো. আবু জাফর রিপন। গত দুই দিনে জেলার বাকি পাঁচ উপজেলাতেও প্রশাসনের তদারকিতে ট্রাকে করে ৩৬ টাকা কেজি দরে আলু বিক্রি করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জেলা আলুচাষি ও ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘জেলা সদরে ১৫ টন আলু নিয়ে খোলাবাজারে ভোক্তাপর্যায়ে ৩৬ টাকা কেজি দরে আলু বিক্রির কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। প্রতিদিন পিকআপ ভ্যানে করে জেলা শহর ও শহরতলীর বিভিন্ন হাটবাজার ও গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে আলু বিক্রি করা হবে। একজন ভোক্তা সর্বোচ্চ পাঁচ কেজি আলু কিনতে পারবে।’