গর্ভে কন্যাশিশু, জীবন বাঁচাতে ওসির দ্বারে নারী

কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার চর বাঘমারা এলাকায় জীবন বাঁচানোর তাগিদে রৌমারী থানার ওসির দরজায় আমেনা বেগম নামের এক নারী। প্রযুক্তির সহায়তায় এই নারী আগেই জানতে পেরেছেন ভূমিষ্ঠ হতে যাওয়া সন্তান কন্যাশিশু। আর এতেই আমেনা বেগমের ওপর নেমে আসে স্বামীর নির্যাতন। স্বামী আমিনুল ইসলামসহ তার পরিবার নানাভাবে হত্যার হুমকি দিয়ে আসছিল ওই নারীকে।

ওই নারীর ১২ বছরে দাম্পত্যজীবন। এই সময়ে তাদের সংসারে তিন সন্তানের জন্ম হয়েছে। এর মধ্যে বেঁচে আছে দুই মেয়ে আর জন্মের পরে মারা গেছে পুত্রসন্তান। এখন তিনি আরেকটি সন্তানের জন্ম দিতে যাচ্ছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সোমবার সকালে ওই নারী প্রসব ব্যথা শুরু হতেই যান স্থানীয় একটি ক্লিনিকে। সেখানে এসেও আমিনুল গর্ভে থাকা নবজাতক ও প্রসূতি নারীকে হত্যার হুমকি দেন। চিকিৎসক অস্ত্রোপচারের (সিজার) প্রস্তুতি নেন। কিন্তু গর্ভের সন্তান ও নিজের জীবন বাঁচাতে ছুটে যান রৌমারী থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রূপ কুমার সরকারের কাছে।

পেটের সন্তান ও নিজের জীবনহানির আশঙ্কা করছেন তিনি। হুমকি দিচ্ছেন সন্তানের জন্মদাতা পিতা নিজেই। এরপরই ওসি রূপ কুমারের হস্তক্ষেপে নারীকে ফেরানো হয় হাসপাতালে আর তার স্বামীকে নেওয়া হয় থানায়। কাউন্সেলিংয়ের পাশাপাশি স্ত্রী ও সন্তানের কোনো ধরনের ক্ষতি হয় এমন কাজ করতে নিষেধও করা হয়।

ভুক্তভোগী নারী অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতাল থেকে থানায় গেছেন উল্লেখ করে উপজেলা সদরের নিরাময় হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তৌহিদুর রহমান বলেন, ওই নারী একাই প্রসবব্যথাসহ হাসপাতালে আসেন। এরপর তার স্বামীসহ কয়েকজন স্বজন আসেন। কিন্তু মেয়ে সন্তান হওয়ার কথা আগেই জেনে যাওয়ায় তাদের দ্বন্দ্ব শুরু হয়। তখন আমরা তাদের পারিবারিক বিষয় নিজেদের মেটাতে বলি। পাশাপাশি তাদের স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ডাকতে বলি। এরই মধ্যে সবার চোখ এড়িয়ে ওই নারী অসুস্থ অবস্থায় থানায় চলে যান। পরে পুলিশ এসে বিষয়টি সমাধান করে।’

ক্লিনিকের পরিচালক আরও বলেন, ‘এই নারী ভর্তি হওয়ার পরেই সিজারের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। পরে এই সব কারণে এখানে আমরা রাখিনি। কারণ শুরুতে সিজার হলে এখানেই হতো। কিন্তু গর্ভবতী নারীর আশঙ্কা ছিল তার স্বামী ক্ষতি করতে পারেন। কিন্তু থানা পুলিশসহ বিভিন্ন পক্ষকে বিষয়টি জানিয়ে সমাধান করতে ৯ ঘণ্টা দেরি হয়ে যায়। ফলে পেটে থাকা নবজাতকের হার্ডবিট কমে যাচ্ছিল। আমরা অন্য হাসপাতালে পাঠিয়ে দিই। যাতে এখানে ঝামেলা না হয়। তাই অন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। সেখানে তার সিজার হয়েছে।’

ওসি রূপ কুমার সরকার বলেন, ‘ওই নারী আমার কাছে এসে বলেন, বারবার মেয়ে সন্তান হওয়ায় তার স্বামী তাকে ও তার সন্তানকে হত্যার চেষ্টা করছে। বিষয়টি আমলে নিয়ে ওই নারীর অভিযোগ শুনি। তখন জানতে পারি এই নারী নাকি হাসপাতাল থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার হেঁটে থানায় এসেছেন স্বামী ও তার পরিবারের হাত থেকে বাঁচতে।’

বিষয়টি অত্যন্ত মর্মান্তিক হওয়ায় থানা থেকে নারী পুলিশসহ ওই নারীকে হাসপাতালে পাঠানো হয়। স্বামীকে থানায় আনা হয়। পরে বলা হয়, বারবার কন্যাসন্তান হওয়ার পেছনে মায়ের কোনো ভূমিকা নেই। এ ক্ষেত্রে বাবার শুক্রাণুর ক্রোমোজম দায়ী উল্লেখ করে এ সম্পর্কে বিজ্ঞানভিত্তিক বিভিন্ন তথ্য দিয়ে কাউন্সেলিং করা হয়। এরপর ওই বাবা তার ভুল বুঝতে পেরে এ ধরনের কাজ না করার প্রতিশ্রুতি দেন।’

ভুক্তভোগী ওই নারীর স্বামী আমিনুল ইসলাম বলেন, শুরুতে বিষয়টি আমি বুঝিনি। ওসি স্যার বোঝানোর পর এখন বুঝছি। মাইয়া বাচ্চা হইছে আমি খুশি। আমি আর আমার স্ত্রীরে কিছু বলব না।’

ভুক্তভোগী নারী আমেলা বেগম বলেন, ‘আমার সুস্থ মেয়ে বাচ্চা হয়েছে। আমি খুব খুশি।’