দেশে প্রজননক্ষম প্রতি ১০ নারীর একজন প্রজননে অক্ষম। তারা পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (পিসিওএস) রোগে আক্রান্ত বলে জানিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। তারা বলেছেন, এ রোগে নারীদের গর্ভধারণে জটিলতা, ডায়াবেটিস, হৃদনালি সংক্রান্ত রোগ, রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইড, কোলেস্টেরল বাড়া, রক্তচাপ বাড়া, বিষণ্নতা, জরায়ু থেকে রক্তপাত, তলপেটে তীব্র ব্যথা ও যকৃতে প্রদাহ হতে পারে।
গতকাল মঙ্গলবার পিসিওএস রোগের সচেতনতা মাস সেপ্টেম্বর উদযাপন উপলক্ষে অনুষ্ঠিত শোভাযাত্রায় এ তথ্য জানানো হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের রিপ্রোডাকটিভ অ্যান্ডোক্রাইনোলজি অ্যান্ড ইনফার্টিলিটি বিভাগ এ শোভাযাত্রার আয়োজন করে।
সবাইকে সতর্ক করে বিএসএমএমইউ উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ বলেন, দেশের রোগীরা যেসব ব্যয়বহুল রোগের চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান, তার মধ্যে নারীদের বন্ধ্যত্ব অন্যতম। এর ফলে দেশের মুদ্রা বিদেশে চলে যায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের রিপ্রোডাকটিভ অ্যান্ডোক্রাইনোলজি অ্যান্ড ইনফার্টিলিটি বিভাগে বন্ধ্যত্ব রোগের উন্নত চিকিৎসা শুরু হয়েছে। সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে বন্ধ্যত্ব রোগের বিশ্বমানের চিকিৎসা নিশ্চিত করা হবে। এর ফলে দেশের বন্ধ্যা নারী মাতৃত্ব ও পুরুষ পিতৃত্বের অনুভূতি পেতে সক্ষম হবেন।
অনুষ্ঠানে রোগ থেকে রক্ষা পেতে আক্রান্ত নারীদের ওজন কমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। বক্তারা বলেন, পিসিওএস আক্রান্তদের শরীরচর্চা ও ওজন কমানো জরুরি। ওজন পাঁচ শতাংশ কমাতে পারলে পিরিয়ড নিয়মিত শুরু হতে পারে। আর ওজন ১০ শতাংশ কমাতে পারলে ডিম্বাশয়ের কার্যক্রম স্বাভাবিক এবং বন্ধ্যত্বের সমস্যা দূর হবে। সুষম খাবারসহ প্রচুর পানি বা মিষ্টিহীন জলীয় খাদ্য গ্রহণ করতে হবে। নির্ধারিত সময়ই দৈনন্দিনের খাবার গ্রহণ করা জরুরি। একই সঙ্গে ডায়াবেটিস প্রতিরোধ বা নিয়ন্ত্রণ, উচ্চ রক্তচাপ কমানো, কোলেস্টেরলের মাত্রা কমানোর মাধ্যমে পিসিওএস প্রতিরোধ করা সম্ভব।
এ রোগের লক্ষণ তুলে ধরে চিকিৎসকরা জানান, পিসিওএস প্রজননক্ষম নারীদের হরমোন ও বিপাকজনিত সমস্যা। মাসিক শুরু হওয়ার পর কিশোর বয়স থেকেই এর লক্ষণ প্রকাশ পেতে শুরু করে। এ রোগে আক্রান্ত নারীদের ওজন বৃদ্ধি পাওয়াসহ বিভিন্ন অংশে অপ্রয়োজনীয় চুল গজানো, প্রতিনিয়ত চুল পড়া বা চুলের ঘনত্ব কমা, ত্বক অতিরিক্ত তেলতেলে বা ব্রণ হওয়া, শরীরের বিভিন্ন অংশের ত্বক কালো হওয়া (যেমন হাত কিংবা স্তনের নিচের ত্বকে, গলার পেছনের অংশে, কুঁচকিতে কালো দাগ ইত্যাদি), ঘুমে সমস্যা, সারাক্ষণ দুর্বলতা অনুভব, মাথাব্যথা, অনিয়মিত পিরিয়ড (মাসিক), পিরিয়ডকালীন অতিরিক্ত রক্ত যাওয়ার ফলে গর্ভধারণে সমস্যা প্রভৃতি।
শোভাযাত্রায় বিশ্ববিদ্যালয়ের রিপ্রোডাকটিভ অ্যান্ডোক্রাইনোলজি অ্যান্ড ইনফার্টিলিটি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. জেসমিন বানু, ডা. শাকিলা ইসরাত, ডা. ফারজানা দীবা, ডা. নূরজাহান বেগম, ডা. শাহীন আরা আনওয়ারীসহ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও অন্যান্য শিক্ষক, চিকিৎসক, রেসিডেন্ট, কর্মকর্তা নার্স ও কর্মচারীরা অংশ নেন।
৭০ শতাংশ নারীর রোগ নির্ণয় হয় না : দিবসটি উপলক্ষে গতকাল রাজধানীর ঢাকা ক্লাবের স্যামসন এইচ চৌধুরী সেন্টারে অ্যাসোসিয়েশন অব ক্লিনিক্যাল ডায়াবেটোলজিস্ট অ্যান্ড অ্যান্ডোক্রাইনোলজিস্ট অব বাংলাদেশ (এসেডবি) এক বৈজ্ঞানিক সেমিনারের আয়োজন করে। সেমিনারে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলেন, ৭০ শতাংশ নারীর পিসিওএস রোগটি নির্ণয়ই হয় না। এ রোগের ভয়াবহতা থেকে বাঁচতে সবার অবগত হওয়া প্রয়োজন।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন এসেডবির প্রেসিডেন্ট ও বিএসএমএমইউ অ্যান্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. ফরিদউদ্দিন ও বিশেষজ্ঞ আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন অবস্টেটিক্যাল অ্যান্ড গাইনিকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশ (ওজিএসবি)-এর সভাপতি অধ্যাপক ডা. ফিরোজা বেগম।