শেখ হাসিনাকে যারা পছন্দ করেন তারা যেমন জানেন; যারা করেন না তারাও মানেন তিনি স্পষ্টভাষী। সাহসের সঙ্গে অকপটে কথা বলেন তিনি। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে সোজাসাপ্টা কথা বলতে কখনো পিছপা হতে দেখা যায়নি আওয়ামী লীগ সভাপতি, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে। ‘জীবনের পরোয়া আমি করি না’ এ ঘোষণা দিয়েই রাজনীতিতে এসেছেন তিনি। সেটা মাথায় রেখেই প্রতিদিন এগিয়ে চলেছেন আর স্থির লক্ষ্যের দিকে। সেই লক্ষ্যে পৌঁছতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
১৯৮১ সালে দেশে ফিরে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জানিয়ে দিয়েছেন রাজনীতিতে তার কিছু পাওয়ার নেই, দেওয়ার আছে। দিয়ে যাওয়ার এ শপথ রক্ষা করতে গিয়ে ১৯ বার জীবনহানির মুখোমুখি হয়েছেন। কিন্তু থেমে যাননি তিনি। জৌলুসপূর্ণ সামরিক শাসনামলে তিনিই প্রথম অকপটে বলেন, এ সামরিক শাসন মানি না, মানব না। ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়েও শাসক মহলকে ছেড়ে কথা বলেননি টানা তিনবারের প্রধানমন্ত্রী। তিনি জেলে গিয়েছেন কিন্তু সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার বিরুদ্ধে কথা বলতে ছাড়েননি তিনি।
চলতি মেয়াদের আগের মেয়াদে পদ্মা সেতুর দুর্নীতি নিয়ে দেশে হইচই চলছিল তখন। শেখ হাসিনা সংসদে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট ভাষায় বলেন, সবাইকে কেনা যায় আমাকে ছাড়া। দিন যত যাচ্ছে, তার এ কথার সত্যতাও মানুষ উপলব্ধি করছে।
অকপটে কথা বলতে ছাড়েননি পরাশক্তিগুলোকেও। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের নেতিবাচক অবস্থান, নিষেধাজ্ঞা ও সর্বশেষ ভিসানীতি প্রয়োগের ঘোষণায় কোনো চাপবোধ না করে বরং হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, ‘আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে সে দেশে যাব না।’
সামরিক শাসনে ভীত জাঁদরেল নেতারাও যখন মার্শাল লয়ের ভয়ে দিগি¦দিক ছোটাছুটি করছেন, ১৯৮২ সালে ২৬ মার্চ ছিল শেখ হাসিনার সেই দৃপ্ত উচ্চারণ, ‘সামরিক শাসন মানি না, মানব না।’ সামরিক শাসনামলেই ১৯৮৪ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর পূর্ণ দিবস হরতালের কর্মসূচির পালিত হয়েছিল তার ঘোষণায়।
পদ্মা সেতু ইস্যুতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি পেয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। সেই হুমকিতে ভীত না হয়ে তিনি প্রকাশ্যে বলেছেন, ‘কোনো একজন বিশেষ ব্যক্তির একটি ব্যাংকের এমডি পদে থাকা না থাকা নিয়ে আমাকে সরাসরি হুমকি দেওয়া হয়েছে। আমেরিকার অনেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এসে সরাসরি বলেছেন, এটা না হলে পদ্মা সেতুর টাকা বন্ধ হবে। দুটি বছর যেন আমাদের ওপর আজাব সৃষ্টি হয়েছিল। আমি মুখের ওপর বলে দিয়েছিলাম পদ্মা সেতু নিজেরাই করব।’
২০০১ সালে বিনা রক্তপাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রে ক্ষমতায় আসতে পারেনি। কারণ গ্যাস বিক্রির মুচলেকা দেননি বলে। আসার পথ বন্ধ করা হয়েছে জানিয়ে অকপটে দেশবাসীকে তিনি জানিয়েছেন সে কথা। বলেছেন, ‘ক্ষমতায় না আসার কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত।’ তিনি বলেছেন, ‘আমার কথা ছিল, নিজের দেশের সম্পদ বিক্রির আগে আমার দেশের মানুষের চাহিদা পূরণ হবে। ৫০ বছরের মজুদ থাকবে, তারপর যেটা উদ্বৃত্ত থাকবে সেটা আমি বেচতে পারি। আমার এ অবস্থান যুক্তরাষ্ট্র ও পাশর্^বর্তী দেশ ভারতের পছন্দ হয়নি। কাজেই ২০০১ ক্ষমতায় আসতে পারিনি।’
১৯৮১ সালে দলের দায়িত্ব নেওয়ার পর আওয়ামী লীগের শীর্ষসারির থেকে শুরু করে তৃণমূল নেতাকর্মীরাও সমালোচনা করতেন। সময় যত প্রবাহিত হতে লাগল, সোজাসাপ্টা কথা বলার কারণে দলের নেতাকর্মীদের কাছেই নয়, সারা দেশের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেতে শুরু করলেন শেখ হাসিনা। বুঝিয়ে দিয়েছিলেন কাউকে পরোয়া করে কথা বলার নেতা তিনি নন। এ বিষয়টি প্রথম প্রথম অনেকের অপছন্দ হলেও এখন সবাই স্বীকৃতি দেন বঙ্গবন্ধুকন্যা যা বলেন সত্যই বলেন। জেনেবুঝে বলেন বলেও অনেকের দাবি। শেখ হাসিনার অকপট বলা তার রাজনৈতিক জীবন ও রাষ্ট্রপরিচালনায় একাকার হয়ে গেছে।