যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কভিত্তিক সাপ্তাহিক সাময়িকী ‘নিউজ উইক’-এর ১১ মে, ১৯৮১ সংখ্যায় বিদেশে অবস্থানরত বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে নিয়ে একটি সাক্ষাৎকার প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। ওই সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘জীবনে ঝুঁকি নিতেই হয়। মৃত্যুকে ভয় করলে জীবন মহত্ত্ব থেকে বঞ্চিত হয়।’
এর ছয় দিন পর ১৯৮১ সালের ১৭ মে শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আসেন আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব নিয়ে। তখন রাষ্ট্রক্ষমতায় জিয়াউর রহমান। পঁচাত্তরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু
শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর আওয়ামী লীগ তখন ক্ষমতাসীনদের দাপটে ছত্রভঙ্গ। ছেলেমেয়ে ও স্বামীকে বিদেশে রেখেই দেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর অভিপ্রায় নিয়ে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নানা বাধাবিপত্তি মোকাবিলা করে সেদিন শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরতে হয়েছে।
নিউজ উইককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, নিহত হওয়ার আশঙ্কায় শঙ্কিত নন তিনি। এমনকি যে সরকারের মোকাবিলা করবেন, তার শক্তিকে তিনি বাধা বলে গণ্য করবেন না। লক্ষ্য সম্পর্কে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘যেসব কাজ অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য বলে আমি বিবেচনা করি, তার মধ্যে থাকবে দেশের প্রতিটি মানুষের পূর্ণ গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।’
এমন অনড় অবস্থানের জানান দিয়ে ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফেরেন শেখ হাসিনা। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে গণসংবর্ধনায় বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু ঘোষিত দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি বাস্তবায়ন ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আমি জীবন উৎসর্গ করে দিতে চাই। আমার আর কিছু পাওয়ার নাই।’
সেই থেকে আজ পর্যন্ত দীর্ঘ পথচলায় তিনি প্রমাণ করেছেন যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে অনড় থাকার নাম শেখ হাসিনা। একনাগাড়ে ৪২ বছর আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন দৃঢ়তার সঙ্গে। এই দীর্ঘ সময়ে তার দূরদর্শী নেতৃত্ব দলকে যেমন শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছে, তেমনি চারবার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন করেছে। দুই দফায় সংসদে বিরোধী দলের নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
দেশের জন্য, জনগণের জন্য ও দলের জন্য যেখানে যেমন অবস্থান নিতে হয়েছে, তেমনি নিয়েছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। লক্ষ্যে পৌঁছাতে একাগ্রতা নিয়ে এগিয়ে গেছেন সব সময়।
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালের ৩০ মে সেনাবাহিনীর সদস্যদের হাতে নিহত হন। এরপর ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। সামরিক আইন জারি করে রাজনৈতিক কার্যকলাপ, বিক্ষোভ, সভা-সমাবেশ ও ধর্মঘট বেআইনি বলে ঘোষণা করেন। ঠিক দুদিন পরে ২৬ মার্চ জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সামরিক আইন জারি থাকলেও সেদিন স্মৃতিসৌধ জনসমাবেশে পরিণত হয়। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে স্মৃতিসৌধের পাদদেশে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, ‘এই সামরিক আইন মানি না, মানব না।’
রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দলাদলি ও সংঘর্ষ এড়ানোর অজুহাতে উপজেলা পরিষদ নির্বাচন স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেন সেনাশাসক এরশাদ। বঙ্গভবনে এ নিয়ে আলোচনাকালে এরশাদকে উদ্দেশ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘সিএমএলএ (চিফ অব মার্শাল ল অ্যাডমিনিস্ট্রেটর) সাহেব অস্ত্র দিয়ে ক্ষমতা দখল করেছেন। অবৈধ ক্ষমতাকে তিনি এখন বৈধ করার চেষ্টা করছেন। আমি বাংলার মাটিতে এটা হতে দেব না।’ তার এ বক্তব্য তৎকালীন ১০ কোটি মানুষের মনের অভিব্যক্তি ছিল। সামরিক শাসনামলে ভয়ভীতির পরোয়া না করেই এভাবে অনড় অবস্থান প্রকাশ করেছেন শেখ হাসিনা।
স্বৈরশাসকের যুগে যেমন আপস করেননি, তেমনি ওয়ান-ইলেভেনের সেনাসমর্থিত ‘ফখরুদ্দীন-মঈনুদ্দিন’ সরকারের অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও আপস করেননি। সে কারণে তত্ত্বাবধায়ক সরকার তাকে প্রায় এক বছর শুধু কারাবন্দি করেই রাখেনি, একের পর এক দুর্নীতির মামলা দিয়েছে। সে সময় চিকিৎসার জন্য বিদেশে গিয়ে ফেরার সময় লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে তাকে আটকে দেওয়া হয়। সেখানে তিনি সংবাদ সম্মেলন করে জনমত সংগঠিত করার মাধ্যমে দেশে ফিরে আসেন। জেল-জুলুম, অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করেও সিদ্ধান্তে অনড় থেকে ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে জাতীয় নির্বাচন দিতে বাধ্য করেছেন।
আপসকামী রাজনীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকা বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা টানা তিনবারের প্রধানমন্ত্রী। শুধু রাষ্ট্রক্ষমতাই নয়, শক্ত হাতে দল পরিচালনা করতে গিয়ে দলের প্রয়োজনে, সময়ের প্রয়োজনে অনড় অবস্থান গ্রহণ করেছেন। সেখান থেকে তার দল আওয়ামী লীগকে বিচ্যুৎ হতে দেননি। এমন চারিত্রিক দৃঢ়তার কারণে তিনি জননেত্রী, দেশরতœ, রাষ্ট্রনায়ক ও ভিশনারী নেতার খ্যাতিও কুড়িয়েছেন।
রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ ভূমিকা ও আন্দোলন পরিচালনায় তার বিচক্ষণতায় ‘ক্ষমতা চিরস্থায়ী’ করার বিএনপি-জামায়াত সরকারের অপচেষ্টা নস্যাৎ হয়ে যায়। ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি-জামায়াত সরকার ভুয়া ভোটার তালিকা করে, যা নিয়ে তখন সংবাদমাধ্যমেও খবর প্রকাশিত হয়। আন্দোলনের মাধ্যমে সেই ভুয়া ভোটার তালিকা বাদ দিতে সেনাসমর্থিত সরকারকে বাধ্য করে আওয়ামী লীগ ও তার মিত্র দলগুলো। ছবিযুক্ত ভোটার তালিকার দাবিতে অটল থাকে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে তৎকালীন বিরোধী দলগুলো। শুধু তা-ই নয়, বিচারপতি কে এম হাসানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করতে বিএনপির নীলনকশা ব্যর্থ করে দিয়েছিল বিরোধীরা।
এর আগে ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারবিরোধী তিন জোটের যুগপৎ আন্দোলনের অগ্রভাগে ছিলেন শেখ হাসিনা। আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ওই বছর ডিসেম্বরে সেনাশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ক্ষমতাচ্যুত হন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারাবাহিকতায় ছেদ টেনে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন করে ক্ষমতায় থাকার যে অভিপ্রায় ছিল বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার, মাত্র ২৮ দিনের মাথায় তা ব্যর্থ হয় আওয়ামী লীগ ও বিরোধীদের আন্দোলনের মুখে। এরপর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ২১ বছর পর ক্ষমতায় আসে ১৯৯৬ সালে। পাঁচ বছর সরকারের দায়িত্ব পালন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারে হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে নির্বাচনে যায় তার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ। ওই নির্বাচনে ক্ষমতায় আসতে না পারলেও দেশের ইতিহাসে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতার পালাবদলের সেটাই ছিল একমাত্র দৃষ্টান্ত।
ওই সময় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গ্যাস বিক্রি করার চুক্তিতে রাজি হলে ক্ষমতায় আসতে পারত আওয়ামী লীগ, যা পরে বঙ্গবন্ধুকন্যার মুখে শোনা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে দেশে-বিদেশে জানান দিয়েছেন জনগণের ম্যান্ডেটে ক্ষমতায় গিয়ে জনগণের সম্পদ বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়া অনৈতিক।
বাঙালির স্বপ্নের পদ্মা সেতু নির্মাণ পরিকল্পনার শেষ দিকে এসে দুর্নীতির চেষ্টার অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন বাতিল করে দেয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বব্যাংককে চ্যালেঞ্জ করেন, দাবি করেন দুর্নীতির চেষ্টার অভিযোগ মিথ্যা। তিনি ঘোষণা করেন নিজেদের টাকায় পদ্মা সেতু করবেন। তিনি সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছেন বাংলাদেশ চাইলে সবই পারে। রাজনীতির বাঁক-মোচড়ের প্রতি পদে অবিচল থেকে শেখ হাসিনা প্রমাণ করেছেন তিনিই সঠিক।