দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রকল্প ঈশ্বরদীর রূপপুরে নির্মাণাধীন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে পৌঁছেছে জ্বালানির প্রথম চালান। ‘ফ্রেশ নিউক্লিয়ার ফুয়েল’ বা ইউরেনিয়ামের এ জ্বালানি চালানটি গতকাল শুক্রবার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্য দিয়ে ঢাকা থেকে সড়কপথে রূপপুরে আনা হয়।
দুপুর দেড়টায় বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভেতরে প্রবেশ করে কনটেইনারবোঝাই চারটি গাড়ি। এজন্য ঈশ্বরদী-ঢাকা মহাসড়কে ভোর ৫টা থেকে দুপুর পর্যন্ত সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখা হয়।
জ্বালানিবোঝাই গাড়িবহর বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রবেশ করলে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং শ্রমিকরা দুই দেশের জাতীয় পতাকা ও বেলুন উড়িয়ে স্বাগত জানান। এর আগে গত বৃহস্পতিবার বিকেলে রাশিয়া থেকে বিশেষ বিমানে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আসে ইউরেনিয়াম।
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, আগামী ৫ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে এ জ্বালানি হস্তান্তর হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ভার্চুয়ালি ওই অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন।
প্রকল্প সূত্র জানায়, রূপপুর প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি করপোরেশন রোসাটমের জ্বালানি প্রস্তুতকারী কোম্পানি টেভেলের একটি প্রতিষ্ঠান নভোসিবিরস্ক কেমিক্যাল কনসেনট্রেটস প্ল্যান্ট (এনসিসিপি) রূপপুরের এ জ্বালানি উৎপাদন করেছে। এ জ্বালানি পরিবহনের সময় সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বিশেষ নিরাপত্তার দায়িত্বে পালন করতে দেখা যায়।
‘ফ্রেশ নিউক্লিয়ার ফুয়েল’ বা ইউরেনিয়াম বিমানবন্দর থেকে সড়কপথে ঈশ্বরদীর রূপপুরে প্রকল্প সাইটে আনার সময় সড়কপথে ভিভিআইপি সমমানের নিরাপত্তাব্যবস্থা অনুসরণ করা হয়। ইউরেনিয়াম প্রকল্প এলাকায় পরিবহনে নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য ঢাকা-ঈশ্বরদী-ঢাকা-পাবনা মহাসড়কে বাস চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে ইউরেনিয়াম পৌঁছানোর বিষয়টি নিশ্চিত করে প্রকল্প পরিচালক ও পরমাণু বিজ্ঞানী ড. শৌকত আকবর সাংবাদিকদের জানান, আনুষ্ঠানিকভাবে এই ইউরেনিয়াম জ্বালানি হস্তান্তর করবেন রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি করপোরেশন (রোসাটম) মহাপরিচালক অ্যালেক্সি লিখাচেভ।
সিরাজগঞ্জ মহাসড়কে ৩ ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ : পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানির প্রথম চালান ঢাকা থেকে রূপপুরে নেওয়ার সময় গতকাল সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ঢাকা-ঈশ্বরদী মহাসড়কে সব ধরনের যানবাহন বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে সিরাজগঞ্জ মহাসড়কে তিন ঘণ্টা সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ থাকে। ভোর থেকেই নিরাপত্তার স্বার্থে সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল-বনপাড়া মহাসড়ক এবং বঙ্গবন্ধু সেতু পশ্চিম সংযোগ মহাসড়কে যানবাহন চলাচল সীমিত করা হয়। সকাল ৮টা থেকে যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ সময় মহাসড়কের সঙ্গে সংযুক্ত সব আঞ্চলিক সড়কেও যান ও মানুষের চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। দুপুর ১২টা নাগাদ ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা ইউরেনিয়ামবাহী গাড়িবহর বঙ্গবন্ধু সেতু হয়ে সিরাজগঞ্জ হাটিকুমরুল গোলচত্বর অতিক্রম হওয়ার পর যান চলাচল শুরু হয়। বহরে পুলিশ, র্যাব এবং সেনাবাহিনী পর্যাপ্ত গাড়ি ছিল।
এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু সেতু পশ্চিম থানার ওসি আবদুল কাদের জিলানী জানান, মহাসড়কে নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানসহ পুরো মহাসড়ক জুড়ে মোতায়েন করা হয়েছিল বিপুলসংখ্যক পুলিশ। ইউরেনিয়াম বহনকারী পরিবহনের বহরটি বঙ্গবন্ধু সেতু পার হয়ে সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুলের পাঁচলিয়া নতুন ট্রাক টার্মিনালে ৪০ মিনিট যাত্রাবিরতি করে। এ যাত্রাবিরতি শেষে হাটিকুমরুল গোলচত্বর হয়ে বনপাড়া মহাসড়ক দিয়ে পাবনার দাশুড়িয়া হয়ে রূপপুর রওনা দেয়।
দেশের সবচেয়ে আলোচিত ও বড় প্রকল্প ঈশ্বরদীর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে খরচ হচ্ছে প্রায় ১ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার দিচ্ছে ২২ হাজার ৫২ কোটি ৯১ লাখ ২৭ হাজার টাকা। রাশিয়া থেকে ঋণ সহায়তা পেয়েছে ৯১ হাজার ৪০ কোটি টাকা।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২৪ সালের প্রথমদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করবে দেশের প্রথম পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুর। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে দ্বিতীয় ইউনিট চালু হতে পারে। দুটি ইউনিটে ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে।