ছাত্ররাজনীতির উত্তাপে যুক্ত হচ্ছে নতুন সংগঠন

দলীয় লেজুড়বৃত্তি করতে গিয়ে স্বকীয়তা হারিয়েছে ছাত্ররাজনীতি। টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজিসহ দুষ্কর্মের দ্বারা আক্রান্ত। ছাত্ররাজনীতির নামে ক্যাম্পাসগুলোতে অস্থিরতা তারই প্রমাণ। এবার সে ধারা ভেঙে নির্দলীয় স্বতন্ত্র একটি ছাত্র সংগঠন গঠন করতে যাচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় শিক্ষার্থী। লেজুড়বৃত্তির বাইরে গিয়ে পুরোদস্তুর শিক্ষার্থীদের হয়ে কাজ করতে চায় এ সংগঠন। এমন উদ্যোগ সফল হলে ছাত্র রাজনৈতিক চর্চা আবার ফিরে আসবে বলে মনে করেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। এটিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরাও। এর মাধ্যমে বর্তমান প্রজন্মের ‘আই হেট পলিটিকস’ জুজুও কাটবে বলে আশা করছেন তারা।

জানা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাবেক সমাজসেবা সম্পাদক আখতার হোসেনকে আহ্বায়ক এবং সংগঠক নাহিদ ইসলামকে সদস্য সচিব করে আজ বুধবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিন থেকে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে নতুন এ স্বতন্ত্র ছাত্র সংগঠন। লেজুড়বৃত্তিক অবস্থানের বিষয়ে অভিযোগ তুলে ছাত্র অধিকার পরিষদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার পদত্যাগ করা নেতাকর্মীরাই মূলত এ সংগঠনের নেতৃত্ব দেবেন।

সংগঠকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সংগঠনের মূলনীতি হিসেবে থাকবে শিক্ষা-শক্তি-মুক্তি, আদর্শ হবে দায়, দরদ ও মানবিক মর্যাদার ভিত্তিতে রাজনৈতিক সমাজ এবং রাজনৈতিক অবস্থান হবে মধ্যমপন্থা ও জাতীয় সংহতি। দেশগঠন ও চিন্তা-পদ্ধতি গঠন লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্রদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া আদায়ে সক্রিয় ভূমিকায় থাকবে সংগঠনটি। তারা জানিয়েছেন, গণতান্ত্রিক ছাত্র শক্তি ও জাতীয় ছাত্র সমষ্টিÑ এ দুটি নাম প্রস্তাব করা হয়েছে।

আখতার হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দলমতের বাইরে গিয়ে ছাত্রদের নিয়ে কথা এমন একটি সংগঠন থাকা দরকার। সে চিন্তাভাবনা থেকেই আমরা নতুন ছাত্র সংগঠনের ঘোষণা দিচ্ছি। প্রচলিত ছাত্ররাজনীতির যে পরিস্থিতি এবং অবস্থান, আদর্শ ছাত্ররাজনীতি যেমন হওয়ার কথা ছিল, এখানে সেটা নেই। আমরা মনে করছি, বাংলাদেশে ছাত্রদের পক্ষে সবসময় একটা ভয়েস থাকা প্রয়োজন। যারা অন্যায় ও অন্যায্যতার বিরুদ্ধে এবং দেশ গঠনে কাজ করে যাবে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি হবে এবং বিমুখতা কেটে যাবে।’

আরেক সংগঠক আসিফ মাহমুদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চিন্তাগত দিক থেকে আমাদের রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশে এটাই প্রথম। দায়, দরদ এবং মানবিক মর্যাদার ভিত্তিক রাজনৈতিক সমাজ ও সভ্যতাগত রাষ্ট্রের ভিশনই আমাদের আদর্শ। এ ছাড়া শিক্ষাব্যবস্থার পুনর্গঠন, রাজনৈতিক পরিসর ও সংস্কৃতি নির্মাণ, রাজনৈতিক ব্যক্তি ও নেতৃত্ব তৈরী, ছাত্র-নাগরিক রাজনীতি নির্মাণের মতো কর্মসূচি নিয়ে আমরা দীর্ঘমেয়াদে দেশগঠন ও চিন্তা-পদ্ধতি গঠনের লক্ষ্যে কাজ করে যাব।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী নিশিতা জামান নিহা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের পক্ষে কাজ করার জন্য বর্তমানে কোনো রাজনৈতিক সংগঠন প্রকৃত অর্থে সফল নয়। প্রতিটি ক্ষেত্রে দলীয় লেজুড়বৃত্তিক কারণে শিক্ষার্থীরা শুধু মূল দলের এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। এজন্য বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থীদের দাবি নিয়ে কাজ করার জন্য আমরা সুসংগঠিত কোনো প্রচেষ্টা আমরা দেখতে পাই না। শিক্ষার্থীদের জন্য এমন একটি সংগঠন সফল হয়, তাহলে প্রকৃত ছাত্র রাজনৈতিক চর্চা আবার ফিরে আসবে বলে মনে করি।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ আইনুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ছাত্র সংগঠনগুলোর মূল যে কাজ ছাত্রদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় দেখা, সেটা এখন আমরা সেভাবে দেখতে পাচ্ছি না। সত্যিকার অর্থে যদি এমন সংগঠন কাজ করতে পারে যারা লেজুড়বৃত্তিক না, তাহলে তাদের কাছে শিক্ষার্থীদের স্বার্থ গুরুত্ব পাবে। তাদের দাবি-দাওয়া নিয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ডিল করা সহজ হবে, যদি রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি না থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংগঠন থাকার পেছনে যে যুক্তি, এটাই ছিল মূল লক্ষ্য। এটা সফল হলে ভালো ইনিশিয়েটিভ হবে।’

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. তানজিম উদ্দিন খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা সবসময় দলীয় ছাত্র সংগঠনই দেখে আসছি। এর বাইরে তেমন একটা সফল হয়নি। বর্তমান ছাত্র সংগঠনগুলো অভিভাবক সংগঠনের ছত্রছায়ায় থাকতে হয়, স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারা। শিক্ষার্থীদের জন্য যেভাবে কাজ করা উচিত, সাধারণত সেভাবে কাজ করতে পারে না তারা। সে ক্ষেত্রে এ ধরনের ভাবনা আশার সঞ্চার করতে পারে। এটি সফল হবে কি না, তার চেয়ে বড় বিষয় আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এমন প্রক্রিয়া সফল হতে পারে কি না, সেটা বোঝা যাবে। বিষয়টি ইতিবাচক বলে আমি মনে করছি।’