আমরা কি জানি আড়ালের কথা? আমাদের শৈশব-কৈশোর যৌবনের যে কত কত আড়াল থাকে, সে আড়ালে কত কত খবর থাকে, তা কি সব জানা যায়? আজ আমি আপনাদের একটা আড়ালের গল্প বলতে চাই। যা আমি কখনো বলতে চাইনি কাউকে।
হাঁটি-হাঁটি পা-পা করে আমি বড় হচ্ছিলাম। বড় হচ্ছিল আমার শরীর-মন। একবার একটু বড় হওয়ার পর ঘটল এক ঘটনা। বয়স আর কত হবে। এই ধরুন, নয়-দশ বছর। আমার দাদাবাড়ির সামনে দক্ষিণ পাশে এক পুকুর ছিল। সেই পুকুরের ওই পাড়ে বিশাল ধানিজমির সঙ্গে লাগানো গাছগাছালি দিয়ে ঘেরা এক ছোট্ট হাঁটা-মতো রাস্তা। সেই রাস্তায় যেতে হলে আগে একটা মাঠ পেরুতে হয়। মাঠটা খুব বড় নয়, আবার ছোটও নয়। পুকুরের এক পাশে সারি সারি বাড়ি। অন্য দিকগুলো খালি। খালি বলতে ফসলাদির জমি, মাঠ। হ্যাঁ, ওই রাস্তার শেষ মাথায় ছিল নদী। নদী হলে কী হবে তার নাম হুরা সাগর।
গরমের দিনে এমনকি শীতের দিনেও হাওয়া খাওয়া কিংবা রোদ পোহানোর জন্য ওখানে ভিড় জমাত মানুষ। দূরদূরান্তের নয় কাছের সারি সারি বাড়ির মানুষগুলো কী সকাল, কী বিকেল ওখানে বসে থাকত। দুপুর বেলায় কাউকে তেমন পাওয়া যেত না। কারণ, ওটা গা-গোসল ও খাওয়ার সময়। বিশ্রাম নেওয়ার সময়। ছোটবেলা থেকেই আমার একটা খারাপ অভ্যাস কী আমি বিশ্রাম নিতে পারি না। মনে হয়, যে সময়টা শুয়ে থাকব ওই সময়টাই জীবন থেকে হারিয়ে গেল। এর চেয়ে কাজ বা বিনোদন করা ভালো। মরে গেলে কি আর এসব করতে পারব। তখন তো অফুরন্ত বিশ্রাম!
যা হোক, একদিন দুপুর বেলা। যার যার বাড়িতে সে সে কাজ করছে বা বিশ্রাম নিচ্ছে। আমি স্কুল থেকে ফিরে বিকেলের জন্য অপেক্ষা না করে ধীর পায়ে যেতে লাগলাম কাচার ওপর। ও, জায়গাটাকে সবাই কাচার ওপর বলত। কাচারি থেকে হয়তো কাচার ওপর নামটি এসেছে। কিন্তু মানুষ ওখানে কোনো বিচার-আচার করেছে বলে মনে পড়ে না।
আমি, আমার বয়সের চেয়ে সাহসী ছিলাম। দুপুর বেলায় কাচার ওপর একা একা কোনো ছেলেমানুষ যেতেও সাহস পেত না। আমি দিব্যি চলে গেলাম। একটা বরই গাছ ছিল সেখানে। বরই গাছের নিচে বসার মতো উঁচু-নিচু জায়গা। আম, কাঁঠালসহ নাম না জানা অনেক গাছ। প্রকৃতির সঙ্গে কথা বলা আমার নেশা। এ নেশার চেয়ে বড় নেশা আর কিছুতে নেই। থাক, এত কথা বাড়িয়ে লাভ নেই।
হঠাৎ, বরই গাছের আড়াল থেকে একটা বড়মতো অজগর সাপ আমার ছোট পা দুটোকে পেঁচিয়ে ফেলল চোখের পলকে। আমার গলা থেকে কোনো আওয়াজ বের হচ্ছে না। পা দুটোকে পেঁচিয়ে ধরে এবার হাত দুটোকে প্যাঁচানোর চেষ্টা। আমি সাহসী মেয়ে তাই মুখে কোনো আওয়াজ নেই। চিৎকার করে কাউকে ডাকার প্রয়োজন মনে করছি না। দুহাতে কেবল সাপের সঙ্গে যুদ্ধ করছি। হাতাহাতির চরম পর্যায়ে সাপটি আমাকে শুইয়ে ফেলল। আমার হাত এখন সাপ নয়, খুঁজছে অন্য কিছু। হাতের কাছে একটা ছুরি পেলে সাপের চোখ পেট ফুটো করে দিতাম। ছুরি কোথা থেকে আসবে এমন জঙ্গল-জায়গায়।
সাপ আমাকে নিচের দিকে নামাতে চাইছে। পুকুরের তলদেশে নিয়ে যেতে চাইছে। আর আমি প্রাণপণে বরই গাছের একটা ডাল ধরে ওপরে উঠতে চাইছি। বরই গাছটার হঠাৎ মায়া হলো। প্রায় দেড় ইঞ্চি সাইজের বড় একটা কাঁটা আমার হাতে তুলে দিল। আমি এক মুহূর্ত দেরি না করে বড় শক্ত কাঁটাটি দিয়ে শরীরের সমস্ত শক্তি খাটিয়ে দিলাম খোঁচা সাপটির বাম চোখে। আঘাতে সাপের পা নরম হয়ে আসছে। পেঁচিয়ে রাখা আমার পা এবং কোমর থেকে বেয়ে ধীরে ধীরে পুকুরের দিকে নেমে যেতে থাকল। আমি আহত পাখির মতো হাত ঝাপটাই, পা ঝাপটাই। সমস্ত শরীর ঝাপটাতে থাকি। পৃথিবীর সব রস শুষে নিয়ে ভরপুর সূর্য ডুবে যেতে থাকে পশ্চিম আকাশে।
এখন আমার বয়স চল্লিশ। এখন আমি সাপের সঙ্গে খেলা করি। সেদিন যখন সাপলুডু খেলছিলাম, সবচেয়ে বড় সাপটি আস্ত আমাকে খেয়ে নিল। আমি কিছুই বললাম না। আমি সাপের সঙ্গে এক প্লেটে খাবার খাই। ওই যে, আমার বস! তিনিই আমাকে শিখিয়েছেন সাপের সঙ্গে এক প্লেটে কীভাবে খাবার খেতে হয়। আগে তিনি একাই খেতেন সাপের সঙ্গে। এখন আমাকেও সঙ্গে নিয়ে বসেন। আমি প্রথম দিকে চাইতাম না খেতে। এখন অভ্যাস হয়ে গেছে। যেদিন খাই না সেদিন রাতে ঘুম আসে না। কী যে এক নেশা! ভালোবাসা হয়েছে সাপের সঙ্গে। অথচ, সেই সাপটি যার চোখ আমি ফুটো করে দিয়েছিলাম নিতান্ত নির্বোধ এক সাপ! ঘুমিয়ে আছে কাচার ওপর।
শুনছি, কেউ কেউ এখন সাপ খাওয়াও শুরু করেছেন। সাপ না খেলে তাদের রক্ত পানি হয়ে যায়। জানেন তো, এখন সাপের চাষ হয়। লম্বা-খাটো, চিকন-মোটা ঢোঁড়া-গোখরা সাপ। এখন সর্বত্র সাপ। সর্বত্র শাপ।