রিজেন্সি হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট লিমিটেডের বাংলাদেশি তিন পরিচালকের বিরুদ্ধে কক্সবাজারে হোটেল নির্মাণের জন্য জমি কেনার নামে বড় ধরনের জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদের সাবেক চেয়ারম্যান মুসলেহ উদ্দিন আহম্মেদসহ বাংলাদেশি তিন পরিচালক কোম্পানির তহবিল থেকে ৮ কোটি টাকা নিয়ে কক্সবাজারে হোটেল নির্মাণের জন্য ২৪ শতাংশ জমি কেনেন। সেই জমি কোম্পানির নামে রেজিস্ট্রি (নিবন্ধন) করার কথা থাকলেও তা না করে নিজেদের নামে নিবন্ধন করেন তারা তিনজন। অবশ্য বিষয়টি জানাজানির পর ওই জমি কোম্পানির কাছে ১৩ কোটি টাকায় বিক্রি করেন তারা। ইতিমধ্যে জমি বিক্রির ৮ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে কোম্পানি। বাকি ৫ কোটি টাকা পরিশোধের কথা রয়েছে।
তিন পরিচালক মূলত ক্ষমতার অপব্যবহার ও জালিয়াতির মাধ্যমে কোম্পানির টাকায় জমি কিনে সেই জমি ফের কোম্পানির কাছে বিক্রির নামে বিপুল অঙ্কের টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এ ছাড়া তারা কোম্পানি থেকে মাসে বেতন নেন ২১ লাখ ৮৮ হাজার টাকার বেশি। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে এসব তথ্য উঠে এসেছে। দুদকের অনুসন্ধান কর্মকর্তা এসব বিষয়ে বিস্তৃত অনুসন্ধানের জন্য হোটেলের নামে থাকা হিসাবগুলোর নথিপত্র চেয়ে সিটি ব্যাংকের নিকুঞ্জ শাখার ব্যবস্থাপকের কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন। গতকাল বুধবার সকালে দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে এ চিঠি পাঠানো হয়।
দুদকের উপপরিচালক ও অনুসন্ধান কর্মকর্তা মো. মশিউর রহমান স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, ‘ঢাকা রিজেন্সি হোটেলের সাবেক চেয়ারম্যান মুসলেহ উদ্দিন আহম্মেদসহ অন্যদের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ গ্রহণসহ হোটেলের অর্থ ও সম্পত্তি আত্মসাতের একটি অভিযোগের অনুসন্ধান চলছে। অভিযোগের সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে সিটি ব্যাংকের নিকুঞ্জ শাখার বিভিন্ন রেকর্ডপত্র পর্যালোচনা করা একান্ত প্রয়োজন। তাই দুদকের চাহিত (চাওয়া) রেকর্ডপত্র জরুরি ভিত্তিতে অনুসন্ধান কর্মকর্তার কাছে দাখিলের জন্য বলা হলো।’ এ চিঠির বিষয়ে জানতে চাইলে দুদকের উপপরিচালক মো. মশিউর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঢাকা রিজেন্সি হোটেলের বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ চলছে। অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে তথ্য-উপাত্ত চেয়ে ব্যাংকে চিঠি পাঠানো হয়েছে।’ এ বিষয়ে তিনি আর কিছু বলতে রাজি হননি।
চিঠিতে যেসব নথিপত্র চাওয়া হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে সিটি ব্যাংকের নিকুঞ্জ শাখায় হোটেলের নামে থাকা হিসাবগুলোর শুরু থেকে এখন পর্যন্ত লেনদেনের বিস্তারিত তথ্য। এ ছাড়া প্রাইম ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে পাঠানো ২০১৩ সালের ২১ অক্টোবরের আড়াই কোটি এবং ১ ডিসেম্বর ২ কোটি টাকার চেকের রেকর্ডপত্র। দ্বিতীয়ত, সংশ্লিষ্ট শাখায় রিজেন্সি হোটেলের নামে ঋণ হিসাবসহ যত হিসাব রয়েছে তার রেকর্ডপত্র। তৃতীয়ত, হোটেলের পরিচালনা পর্ষদের মুসলেহ উদ্দিন আহম্মেদ, জেবুন্নেছা, আরিফ মোতাহার, নাজমা আরিফ মোতাহার, দিলখোশ বেগম, কবির রেজা ও তার স্ত্রী রোকেয়া খাতুনের নামে শুরু থেকে এখন পর্যন্ত যত হিসাব চালু করা হয়েছে তার রেকর্ডপত্র চাওয়া হয়েছে।
দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ঢাকা রিজেন্সি হোটেলের অর্থ লোপাটের নানা চিত্র। জানা গেছে, হোটেলটির মালিকানার ৫১ শতাংশ শেয়ার রয়েছে তিন বাংলাদেশি মুসলেহ উদ্দিন আহম্মেদ, কবির রেজা ও আরিফ মোতাহারের নামে। বাকি ৪৯ শতাংশ শেয়ার রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ১১৭ জনের নামে। হোটেলটিতে মোট ১০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের কথা ছিল। এর মধ্যে যুক্তরাজ্য প্রবাসীরা তাদের ৪৯ কোটি টাকা দিয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশি তিন পরিচালকের ৫১ কোটি টাকা বিনিয়োগের কোনো তথ্য নেই। উল্টো তারা তিনজন মিলেমিশে হোটেলের সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে থাকেন।
দুদকের অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১১ সালে ঢাকা রিজেন্সি হোটেল নির্মাণ করার জন্য কক্সবাজারে ২৪ শতাংশ জমি কেনেন তিন পরিচালক। জমি কেনার জন্য হোটেলের তহবিল থেকে নেওয়া হয় ৮ কোটি টাকা। সেই জমিটির রেজিস্ট্রি মূল্য দেখানো হয় দেড় কোটি টাকা। আর জমি রেজিস্ট্রি করা হয় বাংলাদেশি তিন পরিচালক মুসলেহ উদ্দিন আহম্মেদ, কবির রেজা ও আরিফ মোতাহারের নামে। বিষয়টি জানাজানির পর ২০১৫ সালে সেই জমি ১৩ কোটি টাকায় রিজেন্সি হোটেলের কাছে তারা বিক্রি করেন। ৮ কোটি টাকা নিয়ে জমি রেজিস্ট্রি করে দেওয়া হয়। বাকি ৫ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। হোটেলের তহবিল থেকে টাকা নিয়ে কম দামে জমি কিনে সেই জমি বেশি দামে হোটেলের কাছে আবার বিক্রি করা হয়।
দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, হোটেলটির বাংলাদেশি তিন পরিচালক প্রতি মাসে ২১ লাখ ৮৮ হাজার ৭৪৯ টাকা করে বেতন নেন। এর মধ্যে সাবেক চেয়ারম্যান মুসলেহ উদ্দিন আহম্মেদ ৭ লাখ ৩৩ হাজার ৩৩৩, কবির রেজা ৭ লাখ ২৮ হাজার ৩৩৩ এবং নাজমা আরিফ ৭ লাখ ২৭ হাজার ৮৩ টাকা। তারা বেতন-ভাতাসহ ১০ মাসে নেন ২ কোটি ২৬ লাখ ৭ হাজার ৪৯০ টাকা।