জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের নতুন আবেদন ও ভুল সংশোধন করতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়ছে মানুষ। কয়েক মিনিটের এ কাজটির জন্য মাসের পর মাস ধরনা দিতে হচ্ছে স্থানীয় সিটি করপোরেশন, পৌরসভা কিংবা ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে। সার্ভার জটিলতায় সনদ তো পরের কথা, আবেদনটাই করতে পারছে না তারা। এমন জনভোগান্তির মধ্যেই গতকাল শুক্রবার পালিত হলো জাতীয় জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন দিবস।
রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে দিবসটি উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন করতে চাওয়া মানুষের ভোগান্তির কথা তুলে ধরেন স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধি ও মন্ত্রী-সচিবরা। তবে সার্ভার জটিলতার বিষয়টিই মানতে নারাজ সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর।
জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের কাজটি পারিচালিত হয় স্থানীয় সরকার বিভাগের রেজিস্ট্রার (নিবন্ধক) জেনারেলের কার্যালয় থেকে। এ কার্যালয়ের প্রধান হলেন রেজিস্ট্রার জেনারেল (অতিরিক্ত সচিব) মো. রাশেদুল হাসান। তবে তিনি সার্ভার ডাউন কিংবা সার্ভারের ত্রুটির বিষয়টি নাকচ করে দিয়েছেন।
গতকাল অনুষ্ঠিত ওই আলোচনা সভায় রেজিস্ট্রার জেনারেল বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করে বলার চেষ্টা করেছেন সার্ভার ঠিক আছে। তবে অনুষ্ঠানে উপস্থিত অন্য জনপ্রতিনিধি ও সরকারের সচিবরা সার্ভার ত্রুটির কারণে জনভোগান্তির কথা শুনিয়েছেন। মাঠপর্যায়ে কী হচ্ছে সেটি তুলে ধরেছেন।
আলোচনা সভায় স্বাগত বক্তব্যে মো. রাশেদুল হাসান বলেন, ‘আমাদের মাঠপর্যায়ে কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন লোকবলের অভাব রয়েছে।’ তার মতে, ‘সার্ভারে সমস্যা থাকলে মানুষ বছর বছর এত জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন করতে পারত না।’
তবে রাশেদুল হাসানের এ দাবির প্রতিফলন যে বাস্তবে নেই, সেটিই উঠে এসেছে পরবর্তী বক্তাদের বক্তব্যে। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিদিন বহু মানুষ আমাদের কাছে তাদের ভোগান্তির কথা জানাচ্ছেন। এখানে বললেন, সার্ভার নাকি ঠিকঠাক কাজ করছে। যেটা সত্য সেটা বলতে হবে। গালি খেতে হচ্ছে আমাদের। পাসওয়ার্ড দিয়ে ওয়েবসাইটে ঢোকার চেষ্টা করলেও হচ্ছে না।’
মেয়র বলেন, ‘আমরা কেন বদনাম নেব। আপনারা না পারলে আমাদের ক্ষমতা দিন, আমরা করব। সেটিও করবেন না, আমরা গালি খাব সেটি হবে না। যেটির ওপর সরকারের ইমেজ নির্ভর করছে, সেখানে এমন অব্যবস্থাপনা কেন থাকবে।’
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব (সমন্বয় ও সংস্কার) মো. মাহমুদুল হোসাইন খান বলেন, ‘নিবন্ধনের ওয়েবসাইটে সার্ভার সঠিকভাবে কাজ করছে না। তথ্য বলছে, জানুয়ারি থেকে মার্চে যে পরিমাণ জন্মনিবন্ধন হয়েছে, এপ্রিল-মে মাসে সে তুলনায় নিবন্ধনের হার কমে গেছে। মাঠপর্যায় থেকে বলা হচ্ছে, সার্ভার কাজ করছে না, এটি তো স্বীকার করতে হবে। এ সংশ্লিষ্ট সফটওয়্যার পুরনো হয়ে গেছে, সেটি আপডেট করতে হবে।’
তিনি জানান, রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের অধীনে একজন মাত্র প্রোগ্রামার কাজ করছেন। সহকারী প্রোগ্রামারের একটি পদ থাকলেও সেটি শূন্য রয়েছে। এসব পদে লোকবল নিয়োগের তাগিদও দেন তিনি। পাশাপাশি হাসপাতাল থেকে সরাসরি জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন চালু করার প্রয়োজনীয়তার কথাও জানান তিনি।
আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘সার্ভার ডাউনের বিষয়টি আমি শুনেছি। ওয়ার্কিং আওয়ারে কাজ করতে অসুবিধা হয়। আপনারা কিছুদিন একটু কষ্ট করে রাতে কাজ করুন। অফ টাইমে কাজ করলে অসুবিধা হবে না। শিগগিরই সভা করে এ সমস্যা নিরসনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এ সময় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব মো. সামসুল আরেফিন জানান, দেশের জনসংখ্যা ১৭ থেকে সাড়ে ১৭ কোটি, কিন্তু জন্মনিবন্ধন রয়েছে প্রায় ২০ কোটি। নিবন্ধনে ডুপ্লিকেশন আছে, যেটি তথ্যের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। জন্মনিবন্ধনের তথ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ, অনেকেই এ তথ্য হাতিয়ে নিতে চায়। অনেক পর্যায়ে অ্যাকসেস থাকায় এ তথ্য পরিকাঠামোর নিরাপত্তা দুর্বলতার মধ্যে আছে।
ইউনিসেফের চিফ অব চাইল্ড প্রটেকশন মিস নাটালি ম্যাককলি বলেন, ‘মা হিসেবে আমি জানি নিবন্ধনের জন্য স্থানীয় অফিসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকা কতটা কষ্টের। জন্মনিবন্ধন দেওয়া মানেই কিন্তু নাগরিকত্ব দেওয়া নয়, এখন রোহিঙ্গা শিশুদেরও জন্মনিবন্ধনের আওতায় আনা হবে বলে আমি আশা করি।’
অনুষ্ঠানের সভাপতি স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মুহাম্মদ ইব্রাহীম বলেন, ‘আলোচনায় ভোগান্তির কথা উঠে এসেছে। এ নিয়ে আগামী সোমবারে বৈঠকে বসা হবে। সেখানে সমাধান হবে বলে আশা করি।’