আতঙ্কের কিছু নেই

এটা সত্যি যে, বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে বেশ চাপের মধ্য দিয়ে চলছে। নিম্নমুখী রিজার্ভ, ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতি, ডলারের দাম এবং এদের মিথস্ক্রিয়ায় সামষ্টিক অর্থনৈতিক নির্দেশকে কিছুটা অস্থিরতা অবলোকনীয়। ২০০৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত যে ফুরফুরে মেজাজে অর্থনীতি সামনের দিকে ধাবিত হচ্ছিল রেকর্ড অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার, স্ফীত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, দ্রুত দারিদ্র্য হ্রাস, সহনীয় মূল্যস্ফীতি, ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নয়ন, সামাজিক নির্দেশকে অগ্রগতি ইত্যাদি ইতিবাচক দিক নিয়ে বিশ্বের দরবারে সদর্প বাংলাদেশ উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃতি পায়; কিছু কিছু ক্ষেত্রে ছাপিয়ে যায় পাকিস্তান, ভারত এমনকি শ্রীলঙ্কাকে। কিন্তু হঠাৎ ধেয়ে আসা করোনার কারণে যেমন সারা বিশ্বে, তেমনি বাংলাদেশের অর্থনীতির নৌকা ঝড়ো আবহাওয়ায় পড়ল। তবে সুপক্বতার কারণে সংকট উতরাতে সক্ষম হয়।

বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী দেশগুলোতে ধারণা হয়েছিল এই যে, করোনা-পরবর্তী পুনর্বাসন কর্মকাণ্ডে মনোযোগ দেওয়া হবে উত্তম কাজ। কিন্তু ওই যে কথায় বলে ম্যান প্রপজেস, গড ডিসপসেজ মানুষ চায় এক, হয় আর এক। এবারও বিনা পূর্বাভাসে সংগঠিত রাশিয়া -ইউক্রেন যুদ্ধ সব হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিল। খাদ্যসামগ্রী, বিশেষত গম এবং সার আমদানিতে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বহু দেশ পড়ল বিপাকে। একদিকে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, অন্যদিকে রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স প্রবাহে পতন, একদিকে হু হু করে বেড়ে ওঠা মূল্যস্ফীতির আগুনে জ্বালানি দিল অন্যদিকে দ্রুত পতন ঘটতে লাগল রিজার্ভের। এরই মধ্যে আইএমএফের সঙ্গে সংলাপ শেষে শর্তযুক্ত ঋণপ্রাপ্তি পরিস্থিতি খাদের কিনারে যেতে দেয়নি।

বাংলাদেশকে এখন দারুণ চিন্তায় ফেলেছে চলমান উঁচু হারে মূল্যস্ফীতি, ডলারের বিপরীতে টাকার মানে ধস এবং রিজার্ভের ক্ষয়। যারা বলছেন আমরা খুব ভালো আছি, সবকিছু ভালো চলছে তারা যেমন ঠিক নন তেমনি ভুল করছেন গেল গেল অর্থনীতি গেল, আর মাত্র কদিন, তার মধ্যেই সব শেষ এ জাতীয় যুক্তিতর্ক দিয়ে যারা আতঙ্ক ছড়াচ্ছেন তারা। বাংলাদেশের বর্তমান নাজুক অবস্থা নিয়ন্ত্রণে আনতে যে সমস্ত পদক্ষেপ নেওয়া দরকার সেদিকে নজর দেওয়া হবে সহি কাজ। যেমন ধরা যাক লাগামহীন মূল্যস্ফীতির প্রসঙ্গ।

প্রথম সমস্যা ছিল মনে করা যে কেবল রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিঘ্নিত সরবরাহ চেইন মূল্যস্ফীতির অন্যতম প্রধান কারণ। এবং নীতিনির্ধারক মহল এটাকে একমাত্র কারণ অর্থাৎ আমদানিকৃত মূল্যস্ফীতি ঠাওরিয়ে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছিলেন। সুতরাং হ্যান্ডস অফ আমরা কী করব? কিন্তু সেই যুক্তি ধোপে টেকেনি।  হাঁ, এ কথা ঠিক যে, ২০২২ সালের মার্চ-জুন সময়ে যুদ্ধ মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিয়েছে কিন্তু জুলাই থেকে বিশ্বব্যাপী পণ্যের দাম ছিল প্রায় ৩০ শতাংশ নিম্নমুখী কিন্তু বাংলাদেশের বেলায় ব্যত্যয় ঘটিয়ে দাম ঊর্ধ্বমুখী।

দ্বিতীয় সমস্যা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসনের অভাব। রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে বিশেষত ব্যবসায়ীদের চাপে সম্পূর্ণ ব্যাংকব্যবস্থা ধ্বংসের দ্বারে পৌঁছেছে। অথচ ইচ্ছা থাকলেও বাংলাদেশ ব্যাংক কিছুই করতে পারছে না। এই মুহূর্তে ব্যাংকের সুদের হার বৃদ্ধি করে চাহিদা সংকোচন করত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের আর কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু আমরা দেখছি এ ক্ষেত্রেও গড়িমসি। মূল্যস্ফীতি নামক বাজারের চলমান আগুন নেভাতে হলে, একটা মোক্ষম দাওয়াই হচ্ছে সামগ্রিক চাহিদা নিয়ন্ত্রণকল্পে সুদের হার বাড়িয়ে দেওয়া। বহু আগেই এই সুপারিশ করা হয়ে থাকলেও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর চাপের কাছে নতি স্বীকার করে সুদের হার বৃদ্ধিতে উশখুশ লক্ষণীয়। সুদের হার বৃদ্ধি নিয়ে ব্যবসায়ী মহলের উদ্বেগ উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ তারা মনে করেন, সুদের হার বাড়লে বিনিয়োগ হ্রাস পাবে, প্রবৃদ্ধি সংকুচিত হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। এর বিপরীতে যুক্তি হতে পারে দুরকম :

এক. সুদের হার যখন ছয়-নয় ছিল, তখন কি বিনিয়োগের বন্যায় বাংলাদেশ ভেসে গিয়েছিল? তখন কি লাখ লাখ কোটি টাকা ঋণখেলাপি হয়নি? আসলে, কম সুদের হার বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে এবং বেশি হার বিনিয়োগ সংকোচনে একটা শক্তিশালী প্রভাব রাখলেও সুদের হারই বিনিয়োগের একমাত্র নিয়ামক নয়। এবং এখানেই আসে ‘ব্যবসাবান্ধব নীতির’ পারঙ্গমতা এবং প্রয়োজনীয়তা।

দুই. ধরে নিলাম সুদের হার বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ কমে প্রবৃদ্ধির হার প্রান্তিক পড়ে গেল। ঠিক এই মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ কি বিনিয়োগ-বিলাস না উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে ভোক্তার গলার ফাঁস?

এই পদক্ষেপ খুব বেশি দিনের জন্য নয় কিন্তু। মূল্যস্ফীতির স্তর ৫-৬ শতাংশ (যা প্রবৃদ্ধি সহায়ক) নেমে আসা পর্যন্ত সংকোচনমূলক মুদ্রা সরবরাহে ঋণপ্রবাহের লাগাম টেনে ধরতে হবে। তারপর আবার সম্প্রসারণমূলক নীতি গ্রহণ করে এগিয়ে যাওয়া দরকার। সরকারকে মনে রাখতে হবে এত উঁচু মূল্যস্ফীতির জন্য সৃষ্ট জনদুর্ভোগ এবং জনঅসন্তোষ আসছে জাতীয় নির্বাচনে বড় দাগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির পেছনে চারটি কারণ শনাক্ত করেছে। যথা অভ্যন্তরীণ জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি পাওয়া, দুর্বল মুদ্রানীতি, টাকার অবমূল্যায়ন এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়ার কারণে আমদানি হ্রাস। স্বভাবতই বিশ্বব্যাংকের সুপারিশ হচ্ছে তাদের দেওয়া দাওয়াই অর্থাৎ সংস্কারের পথে হেঁটে বর্তমান অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যেমন মুদ্রার বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণ না করে বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া, মুদ্রানীতি আধুনিক করা এবং রাজস্ব খাতে সংস্কার।

বস্তুত, বিশ্বব্যাংকের সুপারিশের সঙ্গে দ্বিমত করার কোনো অবকাশ নেই। এটা ঠিক যে, বহুদিন ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদদের অনেকে এ ধরনের প্রস্তাব পেশ করে আসছিলেন। কিন্তু বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে? ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে এবং হচ্ছে। ভারত এবং শ্রীলঙ্কাসহ অনেক দেশ সংকোচন নীতি গ্রহণ করে মূল্যস্ফীতির হার সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে পেরেছে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক যেন সম্রাট নীরোর মতো বাঁশি বাজাচ্ছে যখন রোম পুড়ছে।

রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়ছে কিন্তু স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিলে পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব বলে আমরা মনে করি। এবং সেই পরিকল্পনার লক্ষ্য হবে রিজার্ভ যাতে ১৫ বিলিয়ন ডলারের নিচে না নামে। কী করা উচিত তা নিয়ে নীতিনির্ধারকদের চিন্তায় মগ্ন থাকা উচিত। কীভাবে বৈধপথে রেমিট্যান্স না এসে অবৈধপথে আসে এবং হুন্ডি আর সরকারি রেটের ব্যবধান কীভাবে কমিয়ে ডলারের অন্তরপ্রবাহ বৃদ্ধি করা যায় সেদিকে অনতিবিলম্বে নজর দেওয়া উচিত। আর একটু মধ্যমেয়াদে পাচারকারীদের অর্থ/সম্পদ ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা যায় কি না ভেবে দেখা উচিত, আন্ডার এবং ওভার ইনভয়েসিং রোধে কঠোর নজরদারি এবং নিবৃত্তিমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা প্রভৃতি পদক্ষেপ নিলে পরিস্থিতি নাগালের বাইরে যাবে না।

প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ এবং ‘সানেমের’ নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান যথার্থই বলেছেন, ‘দেশে একটি অসাধু চক্র আছে, যারা সরকারের সঠিক সিদ্ধান্তে নানাভাবে বাধা দিয়ে আসছে। এরকম অসাধু গ্রুপগুলোর বাইরে গিয়ে সংস্কার আনা জরুরি। আমাদের মনে রাখতে হবে শ্রীলঙ্কা একসময় উচ্চমধ্যম আয়ের দেশ ছিল, কিন্তু তাদের প্রতিনিয়ত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণে তারা নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে।’

আমরা যে অর্থনৈতিক টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। নির্বাচনের আগে, সচরাচর যেমনটি হয়ে থাকে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সাপেক্ষে এক কঠিন সময় দরজায় কড়া নাড়ছে। তবে সময়োচিত এবং যথাযথ পদক্ষেপে পরিস্থিতি পক্ষে আসতে পারে। আমরা চিন্তিত, কিন্তু আতঙ্কিত নই। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলতে হয়, ‘অর্থনীতিতে এখনই একটা ব্রেক কষতে হবে, যাতে এর চেয়ে খারাপ অবস্থায় আর না যায়।’ সবকিছুর মূলে আছে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আশা করি তার ঘাটতি হবে না অন্ধকার নয়, আমরা আলোর পথের যাত্রী।

লেখক: সাবেক উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

abdulbayes@yahoo.com