কদিন আগে নবীন একটি দৈনিকে, প্রবীণ সম্পাদক একটা আর্টিকেলে ভবিষ্যদ্বাণী করলেন। বললেন, সাত দিনের মধ্যে নাকি বাংলাদেশের ওপর দিয়ে একটা ভয়াবহ অর্থনৈতিক ঝড় বয়ে যেতে পারে। তার হিসাব অনুযায়ী, সাত দিনের মধ্যে কঠিন কোনো নিষেধাজ্ঞা আসবে। লেখাটি ছাপা হয়েছে অক্টোবরের সাত তারিখে।
এই লেখাটি নিয়ে এরই মধ্যে বিভিন্ন মহলে কথা হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন সাহেব তো অবজ্ঞাসূচক কিছু মন্তব্যও করেছেন। বলেছেন, ‘আপনাদের মাথা-মগজের মধ্যে গণ্ডগোল আছে।’ মন্তব্যটি করেছেন তিনি পুরো সাংবাদিক সমাজকে নিয়েই। কথা হচ্ছে, ওই লেখায় কি খুব ভুল কিছু আছে? তার লেখাটি মনোযোগ দিয়ে পড়লে সেখানে একটা ধান্দার বিষয় পরিষ্কার হয়ে যায়। একেবারে সাত দিনের সময়সীমা দিয়ে বলা কথাটি হয়তো বাড়াবাড়ি বলে মনে হয়। আবার লেখার শেষ দিকে সরকারি দলকে ‘নিরীহ কর্মসূচি’ থেকে বের হওয়ার যে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে তার মধ্যে এক ধরনের সংঘাতের উস্কানিও হয়তো আছে। এতকিছুর পরেও অর্থনৈতিক সংকটের যে আশঙ্কার কথা আছে, সেটা কি একেবারেই ভিত্তিহীন?
বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সম্পর্ক যে এখন মধুরতম নয়, এ কথা উপলব্ধি করতে বিশেষ কোনো জ্ঞানের দরকার পড়ে না। আমাদের দেশের রাজনৈতিক, মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এসব পরিস্থিতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই পশ্চিমা বিশ্ব ভিন্নমত প্রকাশ করে আসছিল। আমরা সেগুলোকে পাত্তা দিইনি। বরং আমাদের সরকারের পক্ষ থেকে সবসময়ই উল্টাটা দাবি করা হয়েছে। বলা হয়েছে, সকল প্যারামিটারেই আমাদের অবস্থা নাকি ভালো। মানবাধিকারের কথা যখন বলা হয়েছে, তখন আমাদের মন্ত্রীরা উল্টা তাদের দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি কত খারাপ সেটা উদাহরণ দিয়ে প্রমাণের চেষ্টা করেছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী তো বহুবার বলেছেন, আমরা গণতন্ত্রের জন্য রক্ত দিয়েছি, তাই আমাদের যেন কেউ গণতন্ত্র শেখাতে না আসে
বিভিন্ন মন্ত্রীর এমন সব কথায় যুক্তি বা সত্যতা কতটুকু আছে তা নিয়ে আলোচনা হতেই পারে। তবে আমাদের প্রতি যুক্তরাষ্ট্র বা পশ্চিমা দেশগুলোর মনোভাব কিন্তু সরকার সংশ্লিষ্টদের উচ্চারিত বক্তব্যের ওপর নির্ভর করবে না। বরং তারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যেসব পরামর্শ দিচ্ছে, সেগুলো মানা-না মানার ওপর নির্ভর করবে। বাস্তবে হয়েছেও তাই। মানবাধিকার প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র আমাদের র্যাবের ওপর স্যাংশন দিয়েছে। গণতন্ত্র, বাকস্বাধীনতা, রাজনৈতিক স্বাধীনতা, গণমাধ্যম ইত্যাদি প্রশ্নে বাংলাদেশের জন্য ঘোষণা করেছে বিশেষ ভিসানীতি।
মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের জন্য যুক্তরাষ্ট্র আমাদের সরকারকে যে পরামর্শগুলো দিচ্ছে, বাকি দুনিয়ার দেশগুলোর জন্যও যে তারা একই মনোভাব পোষণ করে, তা হয়তো নয়। সেসব আমরা চোখে আঙুল দিয়ে তাদের দেখিয়েও দিতে পারি। কিন্তু তাতে কি আমাদের এখানকার পরিস্থিতি কিছু পাল্টে যায়? আমাদের সম্পর্কে যে কথাগুলো তারা বলছে, সেগুলো কি মিথ্যা হয়ে যায়? সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যে মনোভাব তারা প্রকাশ করেছে, সেটা দেশের জনগণের চিন্তার সঙ্গে যদি মিলে যায়, তখন তাকে উড়িয়ে দেবেনই বা কীভাবে? সরকারের জন্য সমস্যাটা হয়েছে ওখানেই। সরকার প্রমাণের চেষ্টা করছে, যুক্তরাষ্ট্র ভালো না, তারা আমাদের সরকার পাল্টানোর চেষ্টা করছে, তাদের নিজেদের দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ভালো না, অথচ আমাদের মানবাধিকার নিয়ে কথা বলছে, তাদের গণতন্ত্র ও নির্বাচন নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কিন্তু সেসব সাধারণ মানুষের মধ্যে তেমন একটা প্রভাব ফেলছে না। বরং যখনই যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে স্যাংশন কিংবা ভিসানীতির মতো অপমানজনক কিছু ঘোষণা আসছে, মানুষ যেন উল্লসিত হচ্ছে। জনগণ মনে করছে, যুক্তরাষ্ট্র যত মন্দই হোক, তাদের কথা বা সিদ্ধান্তগুলো সাধারণ মানুষের চিন্তার পক্ষে তো যাচ্ছে!
ঠিক এই জায়গাটিতেই পিছিয়ে পড়েছে সরকার। এ কথা অস্বীকার করা যাবে না যে, পর পর তিন দফা ক্ষমতায় থাকার কারণে দেশের প্রশাসন, বিচারালয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সব সেক্টরে সরকার তার নিজের লোকদের বসাতে পেরেছে। ফলে দেশজুড়ে তৈরি হয়েছে এক ইস্পাত-কঠিন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। এর মধ্যে থেকে সরকারকে বিব্রত করতে পারে এমন কিছু করা তো দূরে থাক, ভিন্নমত প্রকাশও কঠিন হয়ে গেছে। এভাবে আরও একবার, এমনকি আগামীতে বারবার ক্ষমতায় আসা ও যথেচ্ছ কর্মকাণ্ড করার সব ব্যবস্থাই কিন্তু সরকার করে নিয়েছে। বলা বাহুল্য, সরকারের সেই পরিকল্পনায় জলজ্যান্ত ভিলেন হিসেবে এখন আবির্ভূত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা। তারা বলছে না, এভাবে চলবে না। তুমি যেটাকে গণতন্ত্র বলছ, নির্বাচন বলছ, সেটা নিয়ে আমাদের সন্দেহ রয়েছে। যে কথাটা বলতে চেয়েও জনগণ উচ্চারণের সাহস পাচ্ছিল না, সেটাই উচ্চারিত হচ্ছে এখন বিদেশি ওই শক্তিগুলোর কণ্ঠে।
প্রশ্ন হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের ওই প্রেসক্রিপশন সরকার কি মানবে? মানবে যে না, মানছে যে না সেটা এরই মধ্যে স্পষ্ট। তাহলে এর অন্তিম পরিণতিই বা কী? অনেকেই জিজ্ঞাসা করেন, নির্বাচন কি তাহলে হবেই? বিএনপি বলছে তারা সরকারের ফরম্যাটে নির্বাচনে যাবে না। বিএনপির সঙ্গে আরও অনেক দল আছে, তারাও যাবে না। বিপরীত দিকে সরকারও তার অনুগত বেশ কিছু দলকে একত্র করছে। নির্বাচনে যেতে আগ্রহী এমন অনেক দলের জন্ম দিচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচন কি সংঘাতপূর্ণ হয়ে যাবে না? তাহলে কি আমরা আর একটা ২০১৪ কিংবা ২০১৮ দেখতে পাবো? সে নির্বাচন কি সারা দুনিয়ার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে? এসব প্রশ্ন খুবই সংগত। আমার তো মনে হয়, রাজনীতি নিয়ে যাদের কিছুমাত্র চিন্তা আছে, তাদের মাথায় এই প্রশ্নগুলো ঘুরপাক খায় প্রতিনিয়তই। এমনকি যারা রাজনীতি নিয়ে ভাবেন না, আওয়ামী লীগ-বিএনপি কোনো দলই করেন না, তারাও এসব প্রশ্ন নিয়ে চিন্তিত। কারণ তারা জানেন, নির্বাচন ভালো না হলে তার প্রভাব আগামীতে অর্থনীতিতে দারুণ নেতিবাচকভাবেই পড়বে। আর সেটা রাজনীতি না করা মানুষের জীবনকেও বিপর্যস্ত করে তুলবে।
আমার তো এমনও মনে হয়, আগামী জানুয়ারিতে নির্বাচন হয়ে যাবে। আওয়ামী লীগ নির্বাচন করে ফেলবে। তাদের কর্মকাণ্ড দেখে এখন সেরকমই মনে হচ্ছে। তারা সবদিক যেন গুছিয়ে নিচ্ছে। আর বিপরীত দিকে বিএনপির যে দৃশ্যমান সাংগঠনিক শক্তি, মনে হয় না তারা সেই নির্বাচনকে প্রতিহত করতে পারবে। জনগণও নির্বাচন প্রতিহত করার জন্য রাস্তায় নামবে বলে মনে হয় না। তারা হয়তো ভোটই দিতে যাবে না। আর একটা ২০১৪ বা ২০১৮ বা উভয়ের ব্লেন্ডিং টাইপ নির্বাচন হয়তো আমাদের দেখতে হবে। কিন্তু সেটাই তো শেষ নয়, তারপর কী হবে? ক্ষমতায় বসাটাই চূড়ান্ত নয়। দেশটা তো চালাতে হবে। সেজন্য অর্থ লাগবে, বৈদেশিক মুদ্রা লাগবে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য লাগবে। সেটা কীভাবে হবে?
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সিংহভাগই যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপকে কেন্দ্র করে। ক্ষমতায় থাকা ও তার জন্য প্রয়োজনীয় নির্বাচন করতে গিয়ে আপনি এই দুই অঞ্চলকেই উপেক্ষা ও অবজ্ঞা করবেন, তারপরও আশা করবেন, তারা আপনার সঙ্গে আগের মতোই বাণিজ্যিক সম্পর্ক অব্যাহত রাখবে এটা হয় না। তারা আমাদের মতো রূঢ় ও অমার্জিত ভাষায় হয়তো কিছু বলবে না, কিন্তু ধীরে ধীরে চাপ বাড়াবে। এটাই স্বাভাবিক, এটাই অবধারিত। সেই চাপ আমাদের অর্থনীতি বহন করতে পারবে এমন কোনো দৃশ্যমান বিকল্প সরকারের কেউই এখন পর্যন্ত দেখাতে পারেনি।
কেউ কেউ হয়তো ভাবছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প হিসেবে আমরা চীন বা রাশিয়ার কোলে উঠে যাব। এসব হাস্যকর চিন্তা। আমাদের পোশাকশিল্পের জন্য চীন বা রাশিয়া বিকল্প বাজার হতে পারবে না। উল্টো চীন তো আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রকাশ্য বিরোধিতায় থাকলে, আমাদের দীর্ঘদিনের বন্ধু ভারতও যে আমাদের প্রতি খুব একটা সমর্থন দিতে চাইবে সেটাও মনে হয় না। তা ছাড়া তাদের জন্য চীনও একটা ফ্যাক্টর। চীনের সঙ্গে মাখামাখি ভারতের জন্য স্বস্তিকর নয় মোটেই। তাহলে বাংলাদেশ কাদের নিয়ে থাকবে? কাদের সঙ্গে বাণিজ্য করবে? এখন সবাই নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত, তাই হয়তো এই চিন্তাগুলো সামনে আসছে না। কিন্তু নির্বাচন যদি একবার গায়ের জোরে হলেও করে ফেলে আওয়ামী লীগ সরকার, নির্বাচনের পরদিন থেকেই অর্থনীতির এই চিন্তাগুলোই বড় হয়ে দেখা দেবে। সেই চ্যালেঞ্জ কীভাবে সরকার মোকাবিলা করবে? এই প্রশ্নের কোনো সহজ জবাব আছে বলে তো আমার মনে হয় না।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক
msdkml@gmail.com