বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্য ও জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে দেশের বাজারেও। এরই মধ্যে আবার ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়ায় বাজারে পণ্যের দাম লাগামহীন। যার প্রভাব পড়েছে দেশের সর্বত্র। বাদ যায়নি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) প্রায় সব হলেই খাবারের দাম বেড়েছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, দাম বাড়লেও মান বাড়েনি খাবারের। তারা পাচ্ছেন না প্রয়োজনীয় পুষ্টি। নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা শিক্ষার্থীরা বাড়ি থেকে পাওয়া স্বল্প টাকায় প্রতিদিনকার খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। এ ছাড়া তাদের পরিবারের ওপরও বাড়ছে আর্থিক চাপ। এমন পরিস্থিতিতে খরচ বাঁচাতে অনেকে কমাচ্ছেন খাবারের পরিমাণ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বেশিরভাগ হলে খাবারের দাম বেড়েছে। যেখানে বাড়েনি, সেখানে অন্য উপায় অবলম্বন করা হয়েছে। যেমন মাছ ও মাংসের টুকরোর আকার ছোট হয়ে গেছে। কমে গেছে সবজি-ভর্তার পরিমাণ। কয়েকটি হল ঘুরে দেখা যায়, মুরগির মাংস যেখানে ৩৫-৪০ টাকায় পাওয়া যেত, সেখানে এখন তা ৫০-৬০ টাকা করা হয়েছে। ৩০-৩৫ টাকার মাছের টুকরো এখন নেওয়া হচ্ছে ৪৫-৫০। গরুর মাংস ৪৫-৫০ থেকে বেড়ে হয়েছে ৬৫-৭০ টাকা। ডিম-ভাত পাওয়া যেত ২৫-৩০ টাকায়, এখন সেটি ৩৫-৪০ টাকা। ৫ টাকার সবজি হয়ে গেছে ১০ টাকা। ক্যান্টিনের চেয়ে কিছুটা ভালোমানের খাবারের আশায় অনেক শিক্ষার্থী ক্যাম্পাস ও হলের খাবারের দোকানগুলোতে খান। সেখানেও আগের চেয়ে খাবারের দাম বেড়েছে। এ ছাড়া নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দামও বেড়েছে কয়েকগুণ।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, আগে ১০০ টাকা দিয়ে তিনবেলার খাবার খাওয়া যেত। এখন তিনবেলার খাবার খেতে ১৫০ টাকা লাগে। আগে যেখানে তিন হাজার টাকায় মাস চলত, সেখানে এখন অন্তত দেড়, দুই হাজার টাকা বেশি লাগছে। অনেক সময় মাসের অর্ধেকে এসেই খরচের টাকা ফুরিয়ে যাচ্ছে। তারা বলছেন, হল প্রশাসন যদি কিছুটা ভর্তুকি দেয় আর কর্র্তৃপক্ষ যদি ক্যান্টিনগুলো মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করে, তাহলে কম খরচের মধ্যেই মোটামুটি একটা মানের খাবার পাওয়া যাবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় একাত্তর হলের শিক্ষার্থী আরেফিন মোস্তফা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাড়ি থেকে টাকা নিয়ে চলার মতো পরিস্থিতি নেই। টিউশনিও পাওয়া যায় না। অল্প কিছু টাকা বৃত্তি পাই, সেটা দিয়ে চলতে খুবই হিমশিম খেতে হয়। সকাল আর বিকেলের নাশতা বাদ দিয়েছি। তাছাড়া মাছ-মাংসও কম খেতে হচ্ছে।’
শামসুন নাহার হলের শিক্ষার্থী তামান্না আক্তার বলেন, ‘হলে ডাইনিং ক্যান্টিনে দফায় দফায় দাম বৃদ্ধি করলেও খাবারের মানের কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। তিনবেলা খাবার খেতে আগের চেয়ে দেড়গুণ টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে। বিপরীতে খাবারের মান কমে গেছে। পরিমাণ যতটুকু দেয় এতে একজন মানুষের দৈনিক যে ন্যূনতম ক্যালরি প্রয়োজন, সেটাও পূরণ হয় না।’
এদিকে প্রয়োজনের অর্ধেক ক্যালরিও পান না দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা। বিভিন্ন হলের খাবারের মান নিয়ে পরিচালিত এক গবেষণায় জানা গেছে, বয়স ও পরিশ্রম অনুপাতে একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর প্রতিদিনের খাবারে গড়ে ২ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার কিলোক্যালরি থাকা উচিত। সেখানে ঢাবির বিভিন্ন হলের ক্যান্টিন ও মেসে খাবার গ্রহণ করা শিক্ষার্থীরা পাচ্ছেন সর্বোচ্চ ১ হাজার ৪৪৯ কিলোক্যালরি। হলগুলোর ক্যান্টিন ও ক্যাফেটারিয়ার ডাল যেন ‘হলুদ পানি’। ভাত হয় মোটা চালের, সেটিও বাজারের সবচেয়ে নিম্নমানের। পচা ও নিম্নমানের খাবার পরিবেশন করার অভিযোগ বেশ পুরনো। নিম্নমানের খাবার খেয়ে শিক্ষার্থীদের অসুস্থ হওয়ার ঘটনাও কম নয়।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, এ খাবারটা শুধু বেঁচে থাকার জন্যই খেতে হচ্ছে। এ খাবার শারীরিক কিংবা মানসিক বিকাশের জন্য মোটেও উপযোগী নয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘খাবার এবং পুষ্টির বিষয়টি অনেকটা আপেক্ষিক। আপনি খাবারের পেছনে কত টাকা খরচ করছেন সেটি বিবেচ্য বিষয়। কম টাকায় তো শিক্ষার্থীরা পর্যাপ্ত পুষ্টি পাবে না। সে ক্ষেত্রে যদি সম্ভব হয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ ভর্তুকি দিয়ে শিক্ষার্থীদের পুষ্টির দিকে নজর দিতে পারে। এ ছাড়া সবাই সচেতন হলে খাবারের দাম এবং মান নিজেদের আয়ত্তে আনা সম্ভব হবে।’
ভর্তুকি দিয়ে শিক্ষার্থীদের ন্যায্যমূল্যের খাবার পরিবেশনের দাবি জানিয়েছেন ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতারা। ঢাবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক তানভীর হাসান সৈকত বলেন, ‘আমাদের হলগুলোতে যে খাবার দেওয়া হয় সেটা আসলে মানসম্মত নয় এবং যেরকম পুষ্টিকর উপাদান থাকা প্রয়োজন সেটা নেই। যার কারণে শিক্ষার্থীরা নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। আমরা মনে করি আমাদের শিক্ষার জন্য এটা বড় বাধা। প্রশাসনের কাছে দাবি জানাচ্ছি, দ্রুত সময়ের মধ্যে যেন ভর্তুকি দিয়ে খাবারের গুণগত মান নিশ্চিত করা হয়। অন্যথায় আমরা আন্দোলনে নামতে বাধ্য হব।’
ঢাবি ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন সময় দাম কমাতে ও মান বাড়াতে প্রয়োজনে ভর্তুকির জন্য বিশ্ববিদ্যালয়কে বলেছি। কিন্তু তারা কোনো উদ্যোগ নেয়নি। শিক্ষার্থীরা যেন ন্যায্যমূল্যে খাবার পায় সে ব্যবস্থা থাকতে হবে। ভর্তুকি প্রদান করে কিংবা সরকারের পক্ষ থেকে সহযোগিতার মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান করা যাবে বলে আমি মনে করি।’
ক্যান্টিন মালিকরা বলছেন, বর্তমান দামে এর চেয়ে ভালোমানের খাবার দেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে তাদের নিজেদেরও সমস্যা হচ্ছে। খাবারের দাম বৃদ্ধি করা কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ভর্তুকি চালু করার দাবি তাদের। শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের ক্যান্টিন মালিক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর বলেন, ‘এ দামে খাবার পরিবেশন করতে আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। কর্র্তৃপক্ষ যদি ভর্তুকি দেয় তাহলে হয়তো আরও ভালো সার্ভিস দিতে পারব আমরা।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কবি জসীমউদ্দীন হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. শাহিন খান বলেন, ‘ভর্তুকি না দিলেও অনেক কিছুতেই বিশ্ববিদ্যালয় তাদের (ক্যান্টিন মালিক) ছাড় দেয়। তাদেরও শিক্ষার্থীদের ছাড় দেওয়া উচিত। দাম সহনশীল রেখে ভালোমানের খাবার পরিবেশন করা উচিত। আমরা সবসময় তদারকি করছি। পুষ্টির বিষয়টিও আমরা লক্ষ রাখার চেষ্টা করছি।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভোস্ট স্ট্যান্ডিং কমিটির আহ্বায়ক ও বিজয় একাত্তর হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক আবদুল বাছিরের দাবি তারা শিক্ষার্থীদের খাবার ও পুষ্টির বিষয়গুলো সবসময় পর্যালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের বেঁধে দেওয়া দামের বাইরে কেউ দাম রাখলে ব্যবস্থা নেব। তবে পুষ্টির বিষয়ে আমরা এখনো শিক্ষার্থীদের কাক্সিক্ষত মানে পৌঁছতে পারিনি এটা বাস্তব।’
সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় তো সরকারি বাজেটে চলে। যে বাস্তবতা সেটি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। আমরা যতটুকু পারি বাড়তি সহযোগিতা দেওয়ার চেষ্টা করি। সবাইকে দায়িত্বশীল ও সহানুভূতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি রাখতে হবে। কেউ যেন বাড়তি দাম না নেয়, শিক্ষার্থীদের ওপর যেন চাপ না পড়ে। শিক্ষার্থীদের পুষ্টির বিষয়টিও আমাদের গুরুত্ব সহকারে দেখতে হবে।’