ধর্ষণের পরও শেষ হয়নি যন্ত্রণা

পুরো শরীর ব্যান্ডেজে মোড়ানো। ডান হাতের বুড়ো আঙুল ও তর্জনীর একটা অংশ কেটে ফেলতে হয়েছে, বাকিটুকুও দ্রুতই কেটে ফেলতে হবে। ইতিমধ্যে তিনবার অস্ত্রোপচার হয়েছে। ৩৩ দিন ধরে এইচডিওতে ভর্তি মেয়েটি মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগে ভর্তি ওই মেয়েটিকে ধর্ষণের পর আগুনে পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। প্রাণে বাঁচলেও শারীরিক আর মানসিক যন্ত্রণা পিছু ছাড়েনি। চিকিৎসকরা বলছেন, তাকে হাসপাতালে থাকতে হবে কমপক্ষে আরও আড়াই মাস।

এদিকে তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া নির্মম ঘটনায় জড়িতের শাস্তি হওয়ার তো লক্ষণ নেই-ই, উল্টো মেয়েটির শিয়রে দাঁড়ানো বাবাকে হুমকি-ধমকি দিচ্ছে অপরাধীরা।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ওই মেয়েটি গত ৩২ দিন ধরে বার্ন ইউনিটের এইচডিওতে ভর্তি রয়েছে। ডাক্তারদের প্রচেষ্টায় প্রাণে বাঁচানো গেলেও তাকে হাসপাতালে থাকতে হবে আরও দুই থেকে আড়াই মাস। চিকিৎসকরা বলছেন, শুরুতে ধারণা ছিল ডান হাত কেটে ফেলতে হতে পারে, তবে এ যাত্রায় তা রক্ষা পেয়েছে। এ পর্যন্ত তিনটি অপারেশন হয়েছে এবং আরও কমপক্ষে দুটো অপারেশনের প্রয়োজন হতে পারে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. বিধান সরকার জানান, মেয়েটি শুরু থেকে বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. মো. আশিকুর রহমানের তত্ত্বাবধানে রয়েছে।

গতকাল তার সর্বশেষ অবস্থা জানতে বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের ৩২১ নম্বর রুমে গিয়ে কথা হয় ডা. মো. আশিকুর রহমানের সঙ্গে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ৮ সেপ্টেম্বর যখন মেয়েটিকে নিয়ে আসা হয় তখন অবস্থা ছিল খুব খারাপ। তাকে বাঁচানো যাবে কি-না সেই দুশ্চিন্তায় ছিলাম। আমরা মেয়েটিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলাম এবং এখন সে সুস্থ আছে। তার শরীরের ২৪ ভাগ পুড়ে গেছে। তার বুক, ব্রেস্ট, পিঠ, হাত-পাসহ শরীরের বিভিন্ন অংশ মারাত্মকভাবে পুড়ে গেছে এবং গভীর ক্ষত তৈরি হয়েছে।

চিকিৎসক বলেন, তার জীবনের শঙ্কা কেটে গেছে, কিন্তু এমনভাবে পুড়ে গেছে যে, যেকোনো সময় ইনফেকশন হতে পারে। তার আরও দুটি অপারেশন প্রয়োজন। গতকাল রাতে একটা অপারেশনের কথা ছিল কিন্তু শেষ মুহূর্তে জ্বর চলে আসায় তা আর করা হয়নি। জ্বর আসা মানে ইনফেকশনের একটা শঙ্কা থেকেই যায়। আমরা তাকে আরও অবজার্ভ করব এবং আগামী মঙ্গলবার অপারেশন করব।

ডা. মো. আশিকুর রহমান বলেন, তার পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। হাসপাতাল থেকে তার টেস্ট ইনভেস্টিগেশন ফ্রি করে দেওয়া আছে আবার সমাজকল্যাণ থেকেও কিছু সহযোগিতা পাচ্ছেÑ যদিও তা পর্যাপ্ত নয়। তার সাহায্যে কেউ এগিয়ে এলে ভালো হয়।

এদিকে দ্বিতীয় তলার বার্ন এইচডিওতে গিয়ে দেখা যায়, ব্যান্ডেজে মোড়ানো মেয়েটির পাশে ভয় ও দুশ্চিন্তা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন বাবা মাসুদুর রহমান। তিনি বলেন, আমার  মেয়েটাকে ওরা পুড়িয়ে দিয়েছে বাবা। এখন আবার তাদের ভয়ে বাড়ি যেতে পারছি না। মামলা করার কারণে বিভিন্ন হুমকি দেওয়া হচ্ছে। ভয়ে আমার মা ও ছোট মেয়েকে শ্বশুরবাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছি। হাসপাতালে মেয়ের সঙ্গে আমাকে থাকতে হচ্ছে আবার চিকিৎসার খরচ নিয়ে চিন্তা করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আমার দুই চাচাতো ভাই নাইম ও রঞ্জু আমাদের সঙ্গে ঝামেলা করছে। তারা আওয়ামী লীগের রাজনীতি করে এই কারণে কেউ তাদের কিছু বলে না। তাদের সরাসরি সহযোগিতায় আমাদের গ্রামের সাইফুর এই সর্বনাশ করেছে। ঘটনার পর আশপাশের মানুষ সাইফুরকে ধরে পুলিশে দেয়।

জানা যায়, গত ৮ সেপ্টেম্বর (শুক্রবার) বগুড়ার শিবগঞ্জের আটমূল ইউনিয়নের ১৭ বছর বয়সী মেয়েটিকে প্রথমে ধর্ষণ করে একই গ্রামের যুবক সাইফুর। মেয়েটি স্থানীয় মাদ্রাসায় আলিমে পড়াশনা করত। সাইফুর মেয়েটির বাবা মাসুদুর রহমানের দুই চাচাতো ভাই রঞ্জু ও নাইমের সহযোগিতায় মেয়েটির ঘরে প্রবেশ করে। এ সময় মাসুদুর রহমান তার স্ত্রীকে নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে ছিলেন। তার বৃদ্ধ মা পাশের ঘরে নামাজ পড়ছিলেন যা আগে থেকেই জানতেন নাইম ও রঞ্জু। সেদিন প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছিল এ সুযোগে সবার অগোচরে মেয়েটিকে একা পেয়ে সাইফুর ধর্ষণ করে এবং এক পর্যায়ে সে অজ্ঞান হয়ে পড়লে হত্যার উদ্দেশ্যে চটের বস্তা ও কাপড় দিয়ে তার শরীরে আগুন ধরিয়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।

আগুনের আঁচে মেয়েটির জ্ঞান ফিরলে সে আগুন শরীরে নিয়ে দৌড়ে তার আরেক চাচা কামরুজ্জামানের বাড়িতে যায়। সেখানে সাইফুরের নাম উল্লেখ করে ঘটনার কথা জানায়। এরপর কামরুজ্জামান ও প্রতিবেশীরা মিলে মেয়েটিকে বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন এরপর সেখান থেকে সেদিনই ঢাকায় নিয়ে আসেন।

এদিকে ঘটনার পর এলাকাবাসী সাইফুরকে ধরে পুলিশে দেন। পরদিন মেয়েটির বাবা বাদী হয়ে বগুড়ার শিবগঞ্জ থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ধর্ষণসহ শরীরে দাহ্য পদার্থ ব্যবহার করে হত্যা চেষ্টার অভিযোগে মামলা করেন। মামলায় সাইফুর ছাড়াও আসামি করা হয় রঞ্জু ও নাইমকে। এই মামলায় সাক্ষী হওয়ার কারণে বাড়ি থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন কামরুজ্জান। তিনি ফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, সাক্ষী হওয়ার কারণে আমাকে বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছে তাই বাড়ি থেকে পালিয়ে আছি। ঘটনার সঙ্গে জড়িতরা খুব শক্তিশালী। তারা সরকারি দলের রাজনীতি করে। পুলিশও তাদের গ্রেপ্তার করছে না। ফলে উল্টো আমরা পালিয়ে বেড়াচ্ছি।

এদিকে মেয়েটির বাবা মাসুদুর রহমান অভিযোগ করে বলেন, পুলিশ আসামিদের কাছ থেকে টাকা নিয়েছে তাই আসামিদের ধরছে না। আমার মেয়ে যে মাদ্রাসায় পড়ত সেই মাদ্রাসার সভাপতি মিজানুর রহমান আটমূল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। তার সঙ্গে রাজনীতি করে অভিযুক্ত ৩ আসামি।

এ বিষয়ে মাদ্রাসার সভাপতি ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান ফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ধর্ষণের শিকার মেয়েটি খুবই ভালো মেয়ে। কিন্তু তার বাবা অন্য কারও প্ররোচনায় দুজন নিরীহ মানুষকে আসামি দেওয়ায় এলাকার সবাই তাদের ওপর বিরক্ত।

শিবগঞ্জ থানা পুলিশের পরিদর্শক জিল্লুর রহমান জানান, মামলার তদন্ত চলছে। প্রধান আসামি সাইফুর পুলিশের হেফাজতে রয়েছে। ইতিমধ্যে সাইফুর ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে, যদিও তদন্ত চলমান থাকায় জবানবন্দিতে কী বলেছে তা জানাতে চাননি তিনি।

বাকি ২ আসামিকে গ্রেপ্তার না করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এজাহারে যে দুজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে তারা ঘটনার সঙ্গে জড়িত কি-না সে বিষয়ে পুলিশ নিশ্চিত নয় তাই অভিযান চালানো হচ্ছে না। তা ছাড়া তারা বর্তমানে এলাকায়ও নেই।

বগুড়া-২ আসনের এমপি শরিফুল ইসলাম জিন্নাহ বলেন, ঘটনাটি আমি শুনেছি, কিন্তু ভুক্তভোগীর পরিবারের কেউ আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেনি কিংবা তারা কেউ আমার রাজনীতিও করে না।