দেশে উন্নত চিকিৎসার কারণে অনিরাময়যোগ্য অন্ধত্ব ও ক্ষীণদৃষ্টি মানুষের সংখ্যা কমেছে। কিন্তু নানা ধরনের দৃষ্টিজনিত ত্রুটি এখনো বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবেই রয়ে গেছে। এর মধ্যে অপরিণত ও স্বল্প ওজনের শিশুদের চোখের সমস্যা নতুন করে উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ডায়াবেটিসজনিত চোখের সমস্যা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
সর্বশেষ ২০২১-২২ সালের জাতীয় জরিপ অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে জনসংখ্যার দশমিক ৬৯ শতাংশ মানুষ অন্ধত্বের শিকার। অথচ এই জরিপের আগে দেশে অন্ধত্বের সংখ্যা ছিল ১ দশমিক ৪৫ শতাংশ। একইভাবে বর্তমানে ক্ষীণদৃষ্টি সম্পন্ন মানুষের সংখ্যা ৩ শতাংশ। কিন্তু দৃষ্টিজনিত বাকি সমস্যাগুলো এখনো বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা।
এ ব্যাপারে সরকারের ন্যাশনাল আই কেয়ার কর্মসূচির লাইন ডিরেক্টর ও জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. গোলাম মোস্তফা বলেন, মানবদেহের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ চোখ। কিন্তু এ বিষয়ে সাধারণ মানুষ উদাসীন। মানুষ কেন অন্ধত্ব বা দৃষ্টি প্রতিবন্ধকতার শিকার হচ্ছে সে সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকলে এবং চোখের যতেœর বিষয়ে নিজের কর্মস্থলে করণীয় সম্পর্কে জানা থাকলে বাংলাদেশে অন্ধত্বের হার অনেক কমতে পারে।
এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, দেশের মানুষের চক্ষুরোগ কমানোর জন্য ন্যাশনাল আই কেয়ার এ পর্যন্ত উপজেলা হাসপাতালগুলোতে ২০০টি কমিউনিটি আই কেয়ার সেন্টার স্থাপন করে চক্ষুসেবার উদ্যোগ নিয়েছে। এ ছাড়া চক্ষুসেবার কাজে নিয়োজিত দশটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠান জনগণের দোরগোড়ায় চক্ষুসেবা পৌঁছে দিচ্ছে।
জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের রেটিনা বিভাগের অধ্যাপক ও বাংলাদেশ চক্ষু চিকিৎসক সমিতির মহাসচিব ডা. দীপক কুমার নাগ দেশ রূপান্তরকে বলেন, অন্ধত্ব ও ক্ষীণদৃষ্টি দৃষ্টিজনিত সমস্যা না। কারণ এই দুটি ক্ষেত্রে চোখ আর ভালো হয় না, স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরে না। কিন্তু দৃষ্টিজনিত সমস্যার সমাধান হয়। চশমা, চিকিৎসা বা অন্য কোনো মাধ্যমে তাদের চোখ ভালো হয়ে যায়।
এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক জানান, একসময় অন্ধত্বের হার ছিল ১ দশমিক ৪৫ শতাংশ। কিন্তু সর্বশেষ জরিপে সেটা কমে দশমিক ৬৯ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থাৎ এখন ১০০ জনে ১ জনেরও কম বা ১ হাজার জনে ৭ জন অন্ধত্বের শিকার। সে হিসেবে বর্তমানে দেশে জনসংখ্যার ১২ লাখ মানুষ অন্ধ। অন্যদিকে, ৩ শতাংশ বা ৫১ লাখ মানুষ ক্ষীণদৃষ্টির শিকার।
অবশ্য দৃষ্টিজনিত অন্য সমস্যা রয়েই গেছে বলে জানান এই চিকিৎসক। তার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দৃষ্টিজনিত মূল সমস্যা ছানি, গ্লুকোমা ও রেটিনার সমস্যা। চশমাজনিত দৃষ্টির সমস্যা এখন প্রায় ১০ শতাংশ বা ১ কোটি ৭০ লাখ মানুষের। চোখের ছানি সমস্যায় ভুগছেন ৪-৫ শতাংশ বা ৮৫ লাখ মানুষ ও চোখের গ্লুকোমাজনিত সমস্যার শিকার ১-২ শতাংশ বা ৩৪ লাখ মানুষ।
দেশে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ডায়াবেটিসজনিত দৃষ্টি সমস্যা বলে জানান অধ্যাপক ডা. দীপক কুমার নাগ। তিনি বলেন, ডায়াবেটিসজনিত চোখে সমস্যা এখন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। প্রতি ১০০ জন ডায়াবেটিস রোগীর মধ্যে ২০ জনেরই ডায়াবেটিসজনিত চোখের সমস্যা থাকে। যাদের ২০ বছরের বেশি ডায়াবেটিস তাদের ৬০-৬৫ শতাংশেরই রেটিনা সমস্যা থাকে। ২০ বছর ধরে ডায়াবেটিসে ভুগছে এমন রোগীদের মধ্যে যারা ইনসুলিন ব্যবহার করে, তাদের শতভাগই দৃষ্টি সমস্যায় ভোগে।
এখন চোখের রেটিনার সমস্যাও বাড়ছে বলে জানান এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। তিনি বলেন, আগে অপরিণত ও স্বল্প ওজনের শিশুরা বাঁচত না। এখন উন্নত চিকিৎসার কারণে বাঁচছে। কিন্তু তাদের চোখ ঠিকমতো ডেভেলপ হচ্ছে না। তাদের দৃষ্টিজনিত সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
বাংলাদেশে দৃষ্টি সমস্যার কোনো কোনো ক্ষেত্রে কমেছে, আবার নতুন সমস্যা আসছে বলে জানিয়েছেন চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎকরা। তারা জানান, দেশে ছানি অপারেশন অনেক বেড়েছে। সেজন্য ছানিজনিত অন্ধত্ব কমছে। গ্লুকোমা ও রেটিনাজনিত সমস্যা কমছে। আবার জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত সমস্যার কারণে ড্রাই আই বা চোখের শুষ্কতা বাড়ছে। কর্নিয়ার সমস্যা বাড়ছে।
আজ বিশ্ব দৃষ্টি দিবস : প্রতিবছর অক্টোবর মাসের দ্বিতীয় বৃহস্পতিবার বিশ্ব দৃষ্টি দিবস পালন করা হয়। এ দিবসের মূল লক্ষ্য হলো অন্ধত্ব, দৃষ্টি প্রতিবন্ধকতা এবং চোখের যত্নের বিষয়ে বিশ্ব জনগোষ্ঠীকে সচেতন করে তোলা। এ বছরের প্রতিপাদ্য বিষয় ‘চোখকে ভালোবাসুন, কর্মস্থলেও’।
অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি পালনে নানা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। রাজধানীতে বেলা ১১টায় জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল থেকে একটি সচেতনতামূলক শোভাযাত্রা বের হবে ও দুপুর ১২টায় হাসপাতাল মিলনায়তনে সেমিনার অনুষ্ঠিত হবে।
দিবসটি উপলক্ষে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও ন্যাশনাল আই কেয়ারের পাশাপাশি চক্ষুসেবায় নিয়োজিত সংস্থা আন্ধেরি হিলফি, ব্র্যাক, সিবিএম গ্লোবাল, ফ্রেড হোলোস ফাউন্ডেশন, হার্ট টু হার্ট ফাউন্ডেশন, হেলেন কেলার ইন্টারন্যাশনাল, অরবিস ইন্টারন্যাশনাল, সাইট সেভারস, ভিশন স্প্রিং এবং এসিলর লাকসোটিকা জাতীয় ও জেলাপর্যায়ে বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মসূচি ও বিশেষ চক্ষুসেবার আয়োজন করেছে।