এ বছর ৮৭ শতাংশ শিশুই বিপজ্জনক ডেন-২ আক্রান্ত

এ বছর ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশুদের ৮৭ শতাংশই বিপজ্জনক ডেন-২ ধরনের ডেঙ্গু দ্বারা আক্রান্ত। বাকি ১৩ শতাংশের শরীরে ডেন-৩ পাওয়া গেছে। এসব ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশুদের জিনোম সিকোয়েন্স করে দেখা গেছে, শনাক্ত হওয়া ডেন-২-এর জিনগত বৈশিষ্ট্য ২০১৮ সালের ডেন-২-এর জিনগত বৈশিষ্ট্যের কাছাকাছি এবং ডেন-৩-এর জিনগত বৈশিষ্ট্য ২০১৭ সালের ডেন-৩-এর জিনগত বৈশিষ্ট্যের কাছাকাছি।

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল শনিবার বেলা ১১টায় হাসপাতাল মিলনায়তনে এই গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেন হাসপাতালের পরিচালক ও গবেষণার প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. জাহাঙ্গীর আলম।

এ সময় পরিচালক জানান, ২০২৩ সালের জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ডেঙ্গু আক্রান্ত ১ হাজার ৩৯ জন ভর্তি শিশু রোগীর মধ্য থেকে ৭২২ শিশু রোগীকে রোগতাত্ত্বিক গবেষণার জন্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ডেঙ্গু ভাইরাসের সেরোটাইপ নির্ধারণে এবং অন্যান্য ভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্তকরণে ওই ৭২২ শিশু রোগী থেকে ১০৪ রোগীর রক্ত ও ন্যাজোফ্রানজিয়াল সোয়াব সংগ্রহ করে আইসিডিডিআর-বির পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা হয়। পরিচালক আরও জানান, ডেঙ্গু ভাইরাস সংক্রমণের উপসর্গ ছিল, কিন্তু ডেঙ্গু শনাক্তকরণ এনএস-১ অথবা আইজিএম পরীক্ষায় ডেঙ্গু ভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্তকরণ সম্ভব হয়নি এমন ৫০ জন ভর্তি রোগীর রক্ত ও ন্যাজোফ্রানজিয়াল সোয়াবও সংগ্রহ করে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইসিডিডিআর-বি) পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, এনএস-১ এবং আইজিএম নেগেটিভ ৫০টি নমুনার মধ্যে আরটি পিসিআর পরীক্ষার মাধ্যমে ১৭টি (৩৪ শতাংশ) ফলস নেগেটিভ পাওয়া যায় ও ডেঙ্গু নেগেটিভ রোগীর মধ্যে ১৯ শতাংশ রোগী এবং ডেঙ্গু পজিটিভ রোগীর মধ্যে ১২ শতাংশ রোগী অন্যান্য ভাইরাসের সংক্রমণে (ইনফ্লুয়েঞ্জা ও রেসপিরেটরি সিনসাইটাল ভাইরাস) আক্রান্ত ছিল।

অধ্যাপক ডা. মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, গবেষণার অংশ হিসেবে পূর্ণাঙ্গ সিকোয়েন্সিংয়ের কাজ চলমান। ফলাফল হাতে পেলে আরও বেশি তথ্য উপস্থাপন সম্ভব হবে।

ডেঙ্গুর ঊর্ধ্বমুখীর কারণ প্রতিরোধব্যবস্থা না থাকা : এ বছর ডেঙ্গুর ঊর্ধ্বমুখী প্রাদুর্ভাবের পেছনে প্রতিরোধমূলক যথাযথ পরিকল্পনা না থাকাকে দায়ী করেছেন শিশু হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। তারা বলেছেন, ডেঙ্গুর নতুন নতুন সেরোটাইপ (ধরন) আসছে। তাই এখন শুধু ডেঙ্গু রোধে সংক্রমণকালীন নয়, জানুয়ারি মাস থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে কাজ শুরু করতে হবে। ডেঙ্গুকালীন শিশুদের প্রতি বিশেষ নজর রাখতে হবে।

শিশুদের বিশেষ যত্নের পরামর্শ : অনুষ্ঠানে শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘এবার ডেঙ্গুতে বেশি মৃত্যুর কারণ হতে পারে ডেন-২। এটা একটা বিপজ্জনক ধরন। এবার শিশুদের মধ্যে দ্বিতীয়বার ডেঙ্গু আক্রান্ত পাওয়া যাচ্ছে, এটাও মারাত্মক। এ বছর আমরা এক বছরের নিচে প্রচুর ডেঙ্গু রোগী পেয়েছি। বাচ্চাদের মধ্যে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা আমরা দেখেছি। এজন্য শিশুদের নিয়ে আমাদের আলাদা করে ভাবতে হবে। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, মন্ত্রণালয়সহ সরকার সচেতন আছে। ডেঙ্গু পরীক্ষার ক্ষেত্রে এনএস-১ অ্যান্টিজেন করালে সেটা জ্বরের প্রথম দিন করলেই সবচেয়ে ভালো ফলাফল আসবে। তবে কোনোভাবেই অবহেলা করা কাম্য হবে না।’

এ সময় আইইডিসিআর পরিচালক অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরিন বলেন, ‘প্রতিবছরই ডেঙ্গুর নতুন নতুন সেরোটাইপ আসছে। শিশুদের মধ্যে যাদের অবস্থা খারাপ হচ্ছে, তারাও হয়তো দ্বিতীয় দফায় আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারে। তাই শিশুদের প্রতি আমাদের বিশেষ নজর দিতে হবে। শুধু ডেঙ্গু আক্রান্ত নয়, ডেঙ্গু উপসর্গ থাকলেও সেটাকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ ডেঙ্গুতে বাচ্চাদের অবস্থা দ্রুত খারাপ হয়ে যায়। কোনো বাচ্চার জ্বর এলে অপেক্ষা না করে চিকিৎসক দেখাতে হবে।’

আলোচনায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ : অধ্যাপক ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘ডেঙ্গু একটা সময় শুধু সিটি করপোরেশনে হতো, এবার ডেঙ্গু ৬৪ জেলায় ছড়িয়ে গেছে। এমনকি মৃতের হারও জেলাপর্যায়ে কম নয়। তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধে আমাদের কার্যকর পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ নিতে হবে।’

এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, সাধারণত জুন থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু সংক্রমণ অব্যাহত থাকে। তবে বিশেষত আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বর মাসে বেশি থাকে। এজন্য ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে জানুয়ারি মাস থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে। ২০১৯ সালে ডেঙ্গু প্রিভেনশনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একজন পরিদর্শনে এসেছিলেন, তিনি ১৯টি পরামর্শ দিয়েছিলেন, সেগুলো নিয়ে সরকারকে ভাবতে হবে।

এ ব্যাপারে অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরিন বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সিটি করপোরেশন, স্থানীয় প্রশাসন নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ করছে, তবে পাশাপাশি সাধারণ মানুষেরও কিছু দায়িত্ব আছে। তা না হলে কখনো ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।