কালোবাজার ছাড়া মিলছে না ডলার

রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন সোহেল আহমেদ। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকায় উন্নত চিকিৎসার জন্য যাবেন পাশর্^বর্তী দেশ ভারতে। এজন্য রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকে গিয়েছেন ডলার কিনতে। কিন্তু সেখানে ডলার পাননি। সেখান থেকে ব্যাংকের আরেকটি শাখায় যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। ওই শাখায় গিয়ে ডলার না পাওয়ার পর গেলেন রাজধানী পল্টনের দুটি মানি চেঞ্জার প্রতিষ্ঠানে। সেখানে ডলার না মিললেও একটি মানি চেঞ্জার থেকে দিলকুশার একটি ঠিকানা ধরিয়ে দেওয়া হয়, যেখানে গিয়ে তিনি ডলার পান ১১৯ টাকা ৫০ পয়সায়।

শুধু সোহেল নয়, একই পরিস্থিতির স্বীকার হয়েছেন শাকিব, রবিন ও আল আমিন। তারা প্রত্যেকেই ব্যাংক ও মানি চেঞ্জারে ডলার না পেয়ে বেশি দরে ডলার কিনেছেন কালোবাজারিদের কাছ থেকে।

সোহেল আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমি আগামীকাল চিকিৎসার জন্য ভারত যাব। এজন্য ডলারের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সোনালী ব্যাংকে গিয়ে পাইনি। পরে বাধ্য হয়ে কালোবাজারিদের কাছ থেকে ডলার কিনতে হয়েছে।

ডলার বিক্রির ক্ষেত্রেও নানা হয়রানিতে পড়ছেন গ্রাহকরা। পাসপোর্ট না থাকলে মানি চেঞ্জার প্রতিষ্ঠানে তা বিক্রি করা যাচ্ছে না। মিরপুরের বাসিন্দা নুরুল আমিন (ছদ্মনাম) জানান, সম্প্রতি তার বোন যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে এসেছিলেন। ফিরে যাওয়ার আগে কিছু ডলার রেখে গিয়েছিলেন তার নির্মাণাধীন বাড়ির অর্থায়নের জন্য। এখন সেই ডলার বিক্রি করতে ভয় পাচ্ছেন তিনি। মানি চেঞ্জার প্রতিষ্ঠানগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর অভিযানের কারণে তিনি সেসব প্রতিষ্ঠানে যাচ্ছেন না। মানি চেঞ্জারের লোকজনদের কাছে সেই ডলার তিনি বিক্রি করেছেন প্রতিষ্ঠানের বাইরে।

ডলার সংকট ও দাম বেড়ে যাওয়া রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে এভাবেই বিদেশি মুদ্রার লেনদেন এখন কালোবাজারে চলে গেছে। নির্ধারিত দরের চেয়ে বেশি দাম দিলে ডলার পাওয়া যাচ্ছে মানি চেঞ্জার প্রতিষ্ঠানের বাইরে। আবার কোনো গ্রাহক ডলার বিক্রি করতে চাইলে গ্রাহকের বাড়িতে টাকা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।  

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, রপ্তানিকারকের জন্য ডলারের রেট নির্ধারণ করা হয়েছে ১১০ টাকা, রেমিট্যান্সের জন্য ১১০ টাকা ৫০ পয়সা। আর বাংলাদেশ ব্যাংক অন্য বাণিজ্যিক ব্যাংকের কাছে প্রতি ডলার বিক্রি করছে ১০৯ টাকা ৫০ পয়সায়। এছাড়া খোলাবাজারে ১১১ টাকা থেকে ১১২ টাকা ৫০ পয়সায় ডলারের দর হওয়ার কথা। কিন্তু খোলাবাজারে ডলার ১১৮-২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর বেশিরভাগ ব্যাংক ও মানি চেঞ্জার প্রতিষ্ঠানে পাওয়া যাচ্ছে না ডলার।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মানি চেঞ্জারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের মহাসচিব শেখ হেলাল সিকদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক মানি চেঞ্জারগুলোর ডলারের দাম বেঁধে দিয়েছে। এ দামে কেউ ডলার পাচ্ছে না, তাই মানি চেঞ্জারগুলো এখন শূন্য হাতে বসে আছে। মানি চেঞ্জারগুলো ফাঁকা থাকলেও ট্রাভেল এজেন্সি ও ফুটপাতে ডলার বিক্রি হচ্ছে। কারণ, তাদের কারও কাছে হিসাব দিতে হয় না। ডলার এখন আগের মতো ফুটপাতে চলে যাচ্ছে।

ডলারের এই সংকট সমাধানে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে কোনো দাবি জানিয়েছেন কিনাÑ জানতে চাইলে তিনি বলেন, গত সপ্তাহে আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে চিঠি দিয়েছি। সেখানে আমরা ডলারের বেঁধে দেওয়া দরের ওপর যে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে তা প্রত্যাহার এবং ডলারের দরকে বাজারভিত্তিক করার দাবি জানিয়েছি।

সরেজমিনে গতকাল রাজধানীর মতিঝিলের একাধিক ব্যাংক ও মানি চেঞ্জারে গিয়েও ডলার পাওয়া যায়নি। তবে কয়েকটি মানি চেঞ্জারের পক্ষ থেকে বাইরে থেকে ডলার ক্রয়ের বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হয়। এমনকি একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের পক্ষ থেকেও দিলকুশার একটি ঠিকানা ধরিয়ে দেওয়া হয়। যেখানে গিয়ে ১১৯ টাকা ৫০ পয়সা দরে ডলার পাওয়া গেছে।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি মানি চেঞ্জার প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিভিন্ন প্রশাসনিক সংস্থার কঠোরতার কারণে আমরা বেশি দরে ডলার কিনছি না। আবার বিক্রিও করছি না। তবে এজেন্টের মাধ্যমে বাইরে থেকে ডলার বেচাকেনা করছি।

দেশে ডলারের অন্যতম বড় উৎস রেমিট্যান্স। তবে গত কয়েক মাস ধরেই দেশে রেমিট্যান্স কম আসছে। ব্যাংকের বেঁধে দেওয়া দরের চেয়ে হুন্ডিতে ভালো দর থাকায় প্রবাসীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশই হুন্ডিতে আয় পাঠাচ্ছেন। ফলে ডলারের সংকট আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে অনানুষ্ঠানিকভাবে বর্তমানের বেঁধে দেওয়া দরের চেয়ে বেশি মূল্যে প্রবাসী আয় সংগ্রহ করার সম্মতি দেওয়া হয়েছে। এতে চলতি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসী আয় কিছুটা বেড়েছে।  

এদিকে, দেশের মানি চেঞ্জারগুলোতে কী পরিমাণ ডলার ক্রয়-বিক্রয় হয় এর কোনো পরিসংখ্যান নেই বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে। যদিও এসব প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহির শর্তে অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। অবশ্য গতকাল গভর্নরের সঙ্গে সাক্ষাতের পর ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের সংগঠন এবিবির চেয়ারম্যান ও ব্র্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম আর এফ হোসেন সাংবাদিকদের জানান, কার্ব মার্কেটে বছরে ৩ থেকে ৪ কোটি ডলারের লেনদেন হয়। দেশের অর্থনীতির আকার সাপেক্ষে এর পরিমাণ খুবই কম।  

ফরেন এক্সচেঞ্জ ট্রানজেকশন গাইডলাইন অনুসারে, প্রত্যেক ব্যবসা-দিবসের শেষে একটি মানি এক্সচেঞ্জারের হাতে থাকা সর্বোচ্চ নগদ বৈদেশিক মুদ্রার পরিমাণ কিছুতেই ২৫ হাজার ডলার বা তার সমতুল্যের বেশি হতে পারবে না। যদি তাদের নগদ ডলারের পরিমাণ এই সীমার বেশি হয়, তবে দিন শেষে প্রতিষ্ঠানের নিজ নিজ ব্যাংকের ফরেন কারেন্সি (এফসি) অ্যাকাউন্টে জমা রাখতে হবে। সেই অ্যাকাউন্টের ব্যালেন্স কখনোই ৫০ হাজার ডলার বা সমতুল্যের বেশি হতে পারবে না। যদিও বেশিরভাগ মানি চেঞ্জারই এই আইন মানে না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. মেজবাউল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, মানি চেঞ্জারগুলোতে কী পরিমাণ ডলার বিক্রি হয় তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। কারণ মানি চেঞ্জারে অবৈধ ডলার লেনদেন হয়। বৈধভাবে যাদের ডলার প্রয়োজন তাদের তো মানি চেঞ্জারে যাওয়ার কথা নয়।

দেশের বাজারে ডলারের সংকটের মূল কারণ হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেঁধে দেওয়া দর ও এই দর বাস্তবায়নে কড়াকড়ি আরোপকেই দায়ী করছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, ডলারের বাজার যতদিন বেঁধে রাখার চেষ্টা করা হবে ততদিন সংকট বাড়তেই থাকবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ডলার সংকট নিরসনে হুন্ডিকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সেক্ষেত্রে অর্থ পাচার বন্ধ করার বিকল্প নেই। পাশাপাশি মুদ্রা বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করতে হবে। নিয়ন্ত্রণ করে মুদ্রার দর ধরে রাখার চেষ্টা করলে ডলার সংকট আরও বাড়বে।

প্রসঙ্গত, নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে ডলার কেনাবেচা করায় গত ৩০ আগস্ট সাত মানি চেঞ্জারের লাইসেন্স স্থগিত করে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই কারণে আরও ১০ মানি চেঞ্জারের কাছে ব্যাখ্যা তলব করে সংস্থাটি। পাশাপাশি গত সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত বিভিন্ন মানি ”েঞ্জারে অভিযান অব্যাহত রাখে বাংলাদেশ ব্যাংক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। এতে ডলার মানি চেঞ্জার থেকে কালোবাজারিতে চলে গেছে।

এছাড়া ডলারের দরে কারচুপির অভিযোগে ১০ ব্যাংকের ট্রেজারি প্রধানকে চলতি মাসের শুরুর দিকে জরিমানা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এদের সবাইকে ১ লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়। যদিও গত বৃহস্পতিবার ব্যাংকগুলোর ট্রেজারি প্রধানরা জরিমানা মওকুফ করতে বাংলাদেশ ব্যাংকে আবেদন করেছেন।