রাজধানী ঢাকার রাস্তায় চলাচলকারী গণপরিবহনগুলোতে ভাড়া নৈরাজ্যে ঠেকাতে গত বছর ই-টিকেটিং পদ্ধতি চালু করে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি। ১৩ নভেম্বর প্রথম দফায় ৩০টি কোম্পানির ১ হাজার ৬৪৩টি বাসে ই-টিকেটিং চালু করা হয়েছিল সমিতির পরিচালনায়। তবে বছর শেষ না হতেই বেশিরভাগ বাসে এই ই-টিকেটিং এখন বাক্সে বন্দি হয়ে আছে। আর এতে করে রাজধানীর সড়কে আগের মতোই চলছে ভাড়া নৈরাজ্য।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শুরুর দিকে ই-টিকেটিং নিয়ে যাত্রী থেকে শুরু করে বাসমালিকদেরও বেশ আগ্রহ ছিল। কিন্তু বছর না পেরোতেই মুখ থুবড়ে পড়েছে এ ব্যবস্থা। ভাড়া নৈরাজ্য ঠেকাতে ই-টিকেটিং চালু হলেও বন্ধ হয়ে গেছে বেশিরভাগ রুটে। যার সুযোগে কৌশলে পকেট কাটা হচ্ছে যাত্রীদের। অনেক বাসের টিকিটেই গন্তব্যস্থল ও দূরত্ব উল্লেখ না করে শুধু ভাড়ার পরিমাণ লেখা থাকছে। কিন্তু কত কিলোমিটার দূরত্বের জন্য এ ভাড়া তা উল্লেখ থাকছে না।
রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে সরেজমিনে দেখা যায়, যেসব বাসে ই-টিকিটিং পদ্ধতিতে যন্ত্রে ভাড়া নেওয়া হতো সেগুলো এখন পরিবহন শ্রমিকদের কাছে নেই। হাতেগোনা দুয়েকজনের কাছে
থাকলেও সেগুলো পকেটে রেখে নগদে ভাড়া নিতে দেখা যায়। আবার অনেক বাসের সামনের অংশে বাক্সে রেখে দেওয়া হয়েছে এ যন্ত্র।
কেরানীগঞ্জ-উত্তরা রুটের বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ পরিবহনের যাত্রী আনিস মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ই-টিকিটিং সিস্টেমে ভাড়া কাটলে সঠিক ভাড়া আসত যাতায়াতে। কিন্তু এই সিস্টেম এখন নেই বললেই চলে। কয়েক মাস আগেও দেখেছি এই বাসে ই-টিকিটিং সিস্টেমে ভাড়া কাটা হতো। এখন আগের মতোই নগদে ভাড়া কাটা হচ্ছে। যার ফলে আগের মতো বাড়তি টাকা দিয়ে সড়কে চলাচল করতে হচ্ছে।’
দেওয়ান পরিবহনের যাত্রী মো. মাসুদ বলেন, ‘ই-টিকিটিং সিস্টেমে স্বল্প দূরত্বের স্টপেজের ভাড়া দেওয়া যায় না। নির্ধারিত নামার জায়গার ভাড়ার থেকে বাড়তি জায়গার ভাড়াও দিতে হয়। এরকম নানা সমস্যার জন্য এত সুন্দর একটি সিস্টেম উপকারে এলো না। এর জন্য দায়ী নীতিনির্ধারকরাই।’
ই-টিকেটিং মেশিন কোথায় জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ পরিবহনের একটি বাসের চালকের সহকারী মো. রাহিম মিয়া প্রথমে বলেন, মেশিনে চার্জ নেই। পরে এ পদ্ধতিতে অনেক দিন ধরে ভাড়া নেওয়া হয় না বলে স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘ই-টিকেটিংয়ে ভাড়া কাটলে আমাদের লোকসানে পড়তে হয়। অনেক সময় ১৫ টাকার ভাড়া ১০ টাকা দিয়ে যাত্রীরা চলে যায়। তখন তাদের সঙ্গে ভাড়া নিয়ে ঝামেলা হয়। আর দিনশেষে আমাদের জরিমানা দিতে হয়।’
তবে শুধু ই-টিকেটিং ব্যবস্থা দিয়ে গণপরিবহনে নৈরাজ্য বন্ধ করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সড়কে চাঁদাবাজি বহাল রেখে ই-টিকেটিং ব্যবস্থা থেকে কোনো সুফল পাওয়া যাবে না। যার ফলে এখন সব জায়গায় প্রায় বন্ধের পথে এ সুন্দর একটি সিস্টেম। তাছাড়া গণপরিবহনে আরও অনেক সমস্যা আছে। সেগুলোর এখনো সুরাহা হয়নি। দিনের পর দিন এ সমস্যাগুলো সড়কে রয়েই গেছে। এতে করে আগের মতোই সড়কে বিশৃঙ্খলা দেখা যায়।’
বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ড. মো. হাদিউজ্জামানও মনে করেন, সড়কের বাদবাকি বিশৃঙ্খলার সমাধান না করে শুধু ই-টিকেটিং ব্যবস্থা রেখে কোনো সুফল মিলবে না। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ই-টিকেটিং নামে আছে, কিন্তু কাজে নেই। এর ফলে এটা টেকসই হচ্ছে না। তাছাড়া সড়কে ই-টিকেটিং সিস্টেম চালু করা হলেও যাত্রীরা কোন স্টপেজে নামবে, সেসব ব্যবস্থাপনা ভালো করে নেই। আবার কোনো কোনো জায়গায় যাত্রী ছাউনি থাকলেও তা মানসম্মত নয়। আর গণপরিবহনের কাঠামোগতও অনেক সমস্যা আছে। তাই এসব বিষয়ের দিকেও নজর দিতে হবে। তা না হলে শুধু ই-টিকেটিং ব্যবস্থা রেখে সড়কে ভাড়া নৈরাজ্য ঠেকানো সম্ভব নয়।’
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা চাই সড়কে ভাড়া নৈরাজ্য ঠেকাতে। যার জন্য ই-টিকেটিং সিস্টেম চালু করা। নতুন একটি সিস্টেম চালু করলে সঙ্গে সঙ্গে সমাধান পাওয়া যায় না। যেসব জায়গায় ই-টিকেটিং নিয়ে সমস্যা হচ্ছে ধাপে ধাপে সেই রুটগুলোর বাসের মালিকদের নিয়ে বসব। আশা করি সেসব জায়গায় সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে আগামীতে।